পল্টুর দাবি, ছাত্র হিসেবে সে একেবারে এ-প্লাস ক্যাটাগরির। এসএসসি পরীক্ষার সময় জ্বর থাকায় রেজাল্টটা একটু খারাপ হয়েছে—বি গ্রেড। তার দৃঢ় বিশ্বাস, জ্বর না এলে গোল্ডেন এ-প্লাস ঠেকানোর সাধ্য কারও ছিল না।
কলেজে ভর্তি হয়েই সে হিসাব কষে ফেলল। তার মতো মেধাবী ছাত্রের এই সিলেবাস শেষ করতে বড়জোর ছয় মাস লাগবে। বাকি সময়টা ফ্রি ফায়ার, পাবজি, টিকটক, ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে বিনিয়োগ করবে। চেষ্টা চালাবে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হওয়ার। আজকাল অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের আয় দেখে বড় বড় চাকরিজীবীরাও দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। দিন চলতে লাগল গেমস খেলে, রিলস আর টিকটক বানিয়ে। ঘুমাতে যায় ভোর পাঁচটায়, ওঠে দুপুর বারোটায়। খেতে বসলেও মোবাইল, বাথরুমে গেলেও মোবাইল। একদিন তো টিকটকে এতটাই ডুবে ছিল যে, মাংসের টুকরোর বদলে ভুল করে মোবাইলটাই কামড়ে দিয়েছিল।
দেখতে দেখতে পরীক্ষার আর ছয় মাস বাকি। হঠাৎ এক রাতে বইগুলোর কথা মনে পড়ল। ধুলো ঝেড়ে বই খুলে দু-একটা পৃষ্ঠা উল্টেই তার মনে হলো, এই চিকন চিকন বইয়ের জন্য ছয় মাস সময় দেওয়া নিছক অপচয়। তিন মাসই যথেষ্ট। ফেসবুকে প্রতিদিন যত বিশাল বিশাল পোস্ট পড়তে হয়, তার সঙ্গে তুলনা করলে এই বইয়ের পাতাগুলো তো একেবারে ছেলেখেলা!
অতএব আবারও ফিরে গেল সেই রিলস, টিকটক আর ফ্রি ফায়ারের রাজ্যে।
শেষমেশ পরীক্ষার তিন মাস আগে সত্যি সত্যিই পড়তে বসল। কিন্তু পল্টুর হাইপোথিসিস ভুল প্রমাণিত হলো। প্রতিটি বইয়ের মাত্র একটি করে অধ্যায় শেষ করতেই দুই মাস কেটে গেল। হাতে বাকি মাত্র এক মাস। হিসাব করে দেখল, এই গতিতে পুরো সিলেবাস শেষ করতে লাগবে অন্তত দুই বছর। পরীক্ষা শেষ হয়ে রেজাল্টও বের হয়ে যাবে, তবু বই শেষ হবে না!
এই শর্টকাটের যুগে পুরো বই পড়ে সময় নষ্ট করবে কেন? পুরো ভিডিও না দেখে যেমন শর্টস দেখে কাজ চলে, তেমনি পুরো বইও নিশ্চয় শর্টকাটে শেষ করা যায়। খোঁজাখুঁজি করে সে এমন এক কোচিং সেন্টার পেল, যারা শতভাগ কমনেরও বেশি নিশ্চয়তা দেয়। বিজ্ঞাপনের নিচে একটা ফোন নম্বর দেওয়া ছিল, পল্টু সঙ্গে সঙ্গে কল দিল।
“স্যার, সত্যিই ১২০% কমন পড়বে?” পল্টু জিজ্ঞেস করল, গলায় সন্দেহ আর আশার মিশ্রণ।
ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় উত্তর এল, “বাবা, আমাদের সাজেশন না মিললে টাকা ফেরত। গত পাঁচ বছরে একবারও ফেরত দিতে হয়নি।”
পল্টুর সব সন্দেহ এক নিমিষে উবে গেল। প্রতি বিষয়ে মাত্র দশটি প্রশ্ন! তাদের ভাষায়—‘একশতে একশো বিশ শতাংশ কমন!’ এমন আত্মবিশ্বাস দেখে পল্টুর মনে হলো, প্রশ্নপত্রটা বুঝি তারাই ছাপায়। বোর্ড শুধু সিল মেরে দেয়!
পল্টুর হিসাব আরও সহজ হয়ে গেল। প্রতি বিষয়ে মাত্র দশটি প্রশ্ন! অর্থাৎ পরীক্ষার আগের রাতের পড়াই যথেষ্ট। আবারও ফিরে গেল তার সেই প্রিয় ভার্চুয়াল জগতে।
দেখতে দেখতেই পরীক্ষা চলে এল।
প্রথম পরীক্ষার আগের রাতে ঝাড়া দশটা প্রশ্ন মুখস্থ করে ফেলল। পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখে—সব কমন! মনে হলো, এবার একশতে একশো বিশ নম্বর না পেলে অন্যায় হবে।
দ্বিতীয় পরীক্ষাতেও একই কৌশল। তবে এবার দশটির মধ্যে আটটি কমন। তবুও আশি নম্বর তো নিশ্চিত! এ-প্লাস আর কে আটকায়!
তৃতীয় পরীক্ষা এল। কিন্তু এবার আগের টেকনিক একেবারেই কাজ করল না। দশটির একটিও কমন নেই। পল্টুর বারবার মনে হতে লাগল, তাকে ভুল প্রশ্ন দেওয়া হয়েছে। সে পরীক্ষার নাম, বিষয়, সন—সব মিলিয়ে দেখল। না, সবই ঠিক আছে। তিন ঘণ্টা বসে থাকতে হবে—তাও আবার মোবাইল ছাড়া! মোবাইল থাকলে তিরিশ ঘণ্টাও চোখের পলকে কেটে যেত। আর একেবারে সাদা খাতা জমা দিতেও কেমন বাধো বাধো লাগে। হাজার হলেও সে তো খারাপ ছাত্র নয়। তাই উত্তরবুল বানিয়ে প্রশ্নটাই সুন্দর করে লিখতে শুরু করল। একবার লিখল, দু'বার লিখল, তিনবার লিখল... শেষ পর্যন্ত সাতবার পুরো প্রশ্নপত্রই নকল করে ফেলল। আটমবার লেখা শুরু করতে গিয়েই ঘণ্টা বেজে গেল।
পরীক্ষা শেষে বাসায় ফিরেই সে বুঝল, কিছু একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। এভাবে চললে নিশ্চিত ফেল। সব বন্ধুদের ফোন করল। আশ্চর্যের বিষয়, সবারই প্রায় একই অবস্থা।
পল্টু বসে বসে ভাবল—দোষটা কি আসলেই তার? সে তো কোচিং সেন্টারের কথামতোই চলেছে, তাদের সাজেশনই মুখস্থ করেছে। ভুল যদি কেউ করে থাকে, তবে সেটা নিশ্চয় প্রশ্নপ্রণেতা! এই গভীর গবেষণার পর সে সিদ্ধান্তে পৌঁছাল—শিক্ষাব্যবস্থাতাই গলদে ভরা।
অগত্যা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে পরীক্ষা বাতিলসহ নানা দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিল। কোচিং সেন্টারের স্যারও নীরবে তাদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানালেন। রাতের মধ্যেই ঢাকা শহর ছাত্রে ছাত্রে ভরে গেল। রাস্তা অবরোধ হলো, গাড়ি ভাঙচুর হলো, সাংবাদিকরা দৌড়াদৌড়ি শুরু করলেন। ছাত্রদের দাবির তালিকাও ক্রমেই বড় হতে লাগল। এমনকি কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনি কেন আন্দোলনে এসেছেন?” তারা উত্তর দিল, “সবাই এসেছে, তাই আমিও এসেছি!” মাঝরাতেই সরকার সব দাবি মেনে নিল। অন্যান্য ছাত্রদের মতো পল্টুও বিজয়ীর বেশে বাসায় ফিরে এল।
বাসায় ফিরেই হঠাৎ তার মনে পড়ল—আরে! কাল তো আবার পরীক্ষা! খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে সেই দশটি প্রশ্নই মুখস্থ করল।
পরীক্ষার হলে গিয়ে আবারও সব কমন দেখে তার বুক আনন্দে ভরে গেল। কিন্তু আসল বিপদ শুরু হলো উত্তর লিখতে গিয়ে। এক নম্বর প্রশ্নের উত্তর লিখতে গেলে দুই, তিন আর চার নম্বরের উত্তর মাথায় এসে ভিড় করছে। দুই নম্বর লিখতে গেলে সব উত্তর একসঙ্গে জট পাকিয়ে যাচ্ছে। শত চেষ্টা করেও, কোনো উত্তরই ঠিকমতো মনে করতে পারল না। মাথাটা রিবুট করার আশায় সে পাঁচ মিনিট চোখ বন্ধ করে বসে থাকল। তারপর মাথা ঝাঁকাল, কপালে দু-একটা টোকাও দিল। মনে মনে ভাবল, “হয়তো ক্যাশ মেমোরি ক্লিয়ার করলে উত্তরগুলো বের হবে।” কিন্তু মাথা থেকে আন্দোলনের স্লোগানগুলো অটোপ্লে মোডের মতো বের হতে লাগল।
এক দুই তিন,
ঘাড় ঘুরিয়ে লিখতে দিন।
চার পাঁচ ছয়,
প্রশ্ন কেন কঠিন হয়?
সাত আট নয়,
এই শিক্ষামন্ত্রী আর নয়।
লেখক : সামছুল আলম


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









