আরাফাত তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা-মায়ের কাছে সে চোখের মণি, কলিজার টুকরা, হৃদয়ের ধন—সব মিলিয়ে পরিবারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। সমস্যা শুধু একটাই।
আরাফাত পড়াশোনা করতে একদমই পছন্দ করে না। বই দেখলেই তার মাথার ভেতর যেন অ্যালার্ম বাজতে থাকে—"সাবধান! সামনে পড়াশোনা! দ্রুত পালাও!"
পড়ার টেবিলে বসে সে সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে। তারপর তার চোখ চলে যায় জানালার দিকে। জানালার বাইরে একটা কাক বসে থাকলেও আরাফাতের মনে হয়, কাকটা তার চেয়ে অনেক সুখী। সে মনে মনে ভাবে, "আহা! কাকের কোনো বাংলা দ্বিতীয় পত্র নেই, গণিত নেই, ইংরেজি গ্রামার নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে 'কা কা' করলেই জীবন শেষ। কী সুন্দর জীবন!"
মাঝে মাঝে সে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবে, পৃথিবীতে এত পাখি থাকতে পারে, এত প্রজাপতি থাকতে পারে, এত গাছপালা থাকতে পারে—তাহলে মানুষকে কেন বই পড়তে হবে? স্কুলে যাওয়াও তার কাছে এক ধরনের সামাজিক নির্যাতন।
প্রতিদিন সকালে মা বলেন, আরাফাত, ওঠ বাবা। স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
আরাফাত চোখ বন্ধ রেখেই বলে, মা, আজকে শরীরটা খুব খারাপ।
মা কপালে হাত দিয়ে দেখেন।
—জ্বর তো নেই!
—জ্বর নেই বলেই তো শরীরটা খারাপ। জ্বর থাকলে অন্তত একটা কারণ থাকত!
মা কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
—তুই আবার দার্শনিক হইস না। ওঠ।
আরাফাত অনিচ্ছায় উঠে পড়ে। তারপর শুরু হয় ইউনিফর্ম পরার নাটক। কখনো মোজা খুঁজে পাওয়া যায় না, কখনো জুতা পাওয়া যায় না, কখনো স্কুলের ব্যাগ কোথায় রেখেছে সে নিজেই জানে না।
একদিন তো সে স্কুলের ব্যাগ খুঁজতে গিয়ে নিজের স্কুলের জুতার ভেতর থেকে একটা কলম বের করেছিল। সে কিছুক্ষণ কলমটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিল,
—এই কলমটা এখানে কীভাবে গেল?
মা পাশ থেকে বলেছিলেন, তুইই রেখেছিস।
আরাফাত খুব গম্ভীরভাবে বলেছিল,
—আমার নিজের ব্যাপারেই এত নিশ্চিতভাবে কথা বলো না মা। আমি নিজেকেই সব সময় বুঝতে পারি না।
তবে আরাফাতের একটা গুণ ছিল। সে তার ফাঁকিবাজি খুব সুন্দরভাবে লুকিয়ে রাখতে পারত।
ক্লাসে সে এমন ভাব করত, যেন পড়াশোনার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ। শিক্ষক কিছু জিজ্ঞেস করলে সে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকত। কখনো মাথা নাড়ত। কখনো খাতায় দ্রুত কিছু লিখত। ফলে শিক্ষকরা ভাবতেন, "ছেলেটা একটু চুপচাপ, তবে মনোযোগী।" বাবা-মাও ভাবতেন, "আমাদের ছেলে নিশ্চয়ই ভালোই পড়াশোনা করছে।" অথচ বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
আরাফাতের খাতায় গণিতের অঙ্কের বদলে অনেক সময় লেখা থাকত—"আমি যদি পাখি হতাম..." তার নিচে একটা পাখির ছবি। আরেক পাতায়—"স্কুল যদি একদিন বন্ধ থাকে..." তার নিচে ছুটির দিনের সম্ভাব্য কর্মসূচি। আর সবচেয়ে শেষ পাতায় লেখা—"একদিন আমি বনে চলে যাব।" এই শেষ কথাটাই ছিল তার জীবনের বড় স্বপ্ন। সে স্বাধীন হতে চায়।বোহেমিয়ানের মতো জীবন কাটাতে চায়। তার কোনো স্কুল থাকবে না, কোনো হোমওয়ার্ক থাকবে না, কোনো পরীক্ষার খাতা থাকবে না।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে সে জঙ্গলের মধ্যে হাঁটবে। পাখিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে। দুপুরে গাছের নিচে বসে বাতাস খাবে। সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখবে। কিন্তু একটা সমস্যা ছিল। তার বয়স তখনও এমন নয় যে ইচ্ছা করলেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বনে চলে যাবে। আর বাবা-মায়ের ভয় তো আছেই।
একবার সে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
—বাবা, মানুষ কি নিজের ইচ্ছামতো জীবন কাটাতে পারে?
বাবা বলেছিলেন,
—অবশ্যই পারে। তবে তার আগে নিজের দায়িত্বটা বুঝতে হয়।
আরাফাত মনে মনে বলেছিল, "এই কথাটাই তো বিপদ!"
অনেক দিন ধরেই আরাফাতের মাথায় একটা পরিকল্পনা ঘুরছিল। স্কুলে যাওয়ার পথে কোনো এক নির্জন জায়গায় সে তার বইয়ের ব্যাগটা ফেলে দেবে।তারপর বাসায় ফিরে বলবে,—বাবা, ব্যাগটা হারিয়ে গেছে। বাবা বলবেন, —কোথায়
হারিয়েছিস? সে বলবে,—জানি না। বাবা বলবেন,—খুঁজে দেখেছিস?সে বলবে,—অনেক খুঁজেছি।
ব্যস। বই শেষ। পড়াশোনা শেষ।
কিন্তু পরিকল্পনার শেষ ধাপে এসে আরাফাতের বুক কেঁপে উঠত। "বাবা যদি নতুন বই কিনে দেয়?" মা যদি বলে "কাল থেকেই নতুন ব্যাগে পড়াশোনা কর?"
এই চিন্তায় তার বিপ্লবী মন মুহূর্তে শান্ত হয়ে যেত। সে ভাবত, "না, বিপ্লব পরে হবে। আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করি।
এক রাতে আরাফাতের কোনোভাবেই ঘুম আসছিল না। ঘড়িতে অনেক রাত। বাবা-মা গভীর ঘুমে। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে ঘরের মেঝেতে পড়েছে। ঘরটা আবছা আলোয় অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল।
আরাফাত বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, "কীভাবে পড়াশোনাকে আমার জীবন থেকে চিরতরে বিদায় করা যায়?"ঠিক তখনই-খসখস।
আরাফাত চোখ মেলে তাকাল। ঘরের এক কোণে একটা কালো ছায়া! সে একটু নড়েচড়ে বসল।
আবছা আলোয় বুঝতে পারল—একজন লোক ঘরে ঢুকেছে! লোকটা একটা বড় বস্তা নিয়ে এসেছে। সে চুপিচুপি ঘরের জিনিসপত্র বস্তায় ঢোকাচ্ছে।আরাফাতের চোখ কপালে। ওমা! চোর! প্রথমে তার মনে হলো, "চিৎকার করি!" কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখ গেল পড়ার টেবিলের দিকে। টেবিলের ওপর সুন্দর করে সাজানো তার সব বই। বাংলা বই। ইংরেজি বই
গণিত বই। বিজ্ঞান বই। খাতা। গাইড।
আরাফাতের বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ উঠল। সে মনে মনে বলল, "আরে! চোর তো দেখি আমার মুক্তির দূত!" চোর তখন আলমারি থেকে কিছু জিনিস বের করে বস্তায় ঢুকাচ্ছে। আরাফাত অপেক্ষা করছে। চোর একটা ঘড়ি নিল। একটা দামি কলম নিল। কিছু কাপড় নিল। তারপরও বইয়ের দিকে তাকাল না। আরাফাত বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলল, "লোকটা এত জিনিস চুরি করছে, অথচ আসল জিনিসটাই দেখছে না!" চোর এবার একটা বাক্স খুলল। আরাফাত মনে মনে বলল, "ভাই, বইয়ের দিকে একটু তাকান।" চোর তাকাল না। আরাফাত এবার ধীরে ধীরে উঠে বসল। চোর আবার অন্যদিকে গেল। আরাফাত মনে মনে বলল, "এ লোকের চুরির কোনো রুচিই নেই!"
শেষ পর্যন্ত চোর যখন বস্তা কাঁধে নিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আরাফাত আর থাকতে পারল না। সে বিছানা থেকে নামল। ধীরে ধীরে চোরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চোর ঘুরে তাকায়— হায় আল্লাহ! তার বুক শুকিয়ে গেল। সে ভাবল "শেষ! ধরা পড়ে গেছি!"
চোরের হাত থেকে প্রায় বস্তাই পড়ে যাচ্ছিল। সে ফিসফিস করে বলল, —কে তুমি? আরাফাত খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, —আমি আরাফাত। চোর অবাক।
—তুমি... এই বাড়ির ছেলে?
—হ্যাঁ।
চোর ভাবল, এখনই ছেলেটা চিৎকার করবে। কিন্তু আরাফাত চিৎকার করল না। বরং বলল,
—আপনি একটা কাজ করবেন?
চোরের গলা শুকিয়ে গেল।
—কী কাজ?
আরাফাত পড়ার টেবিলের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,
—ওগুলোও নিয়ে যান।
চোর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—কী?
—বইগুলো।
—কোন বই?
—ওই যে সবগুলো বই!
চোর অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল।
—তুমি আমাকে বই চুরি করতে বলছ?
—জি।
চোর ভাবল, ছেলেটা হয়তো ঘুমের মধ্যে কথা বলছে।
সে বলল,
—তুমি ঠিক আছ তো?
আরাফাত বলল, একদম ঠিক আছি। আপনি বইগুলো নিয়ে গেলে আমার অনেক উপকার হবে।
চোর বলল, বই নিয়ে আমি কী করব?
আরাফাত বলল, সেটা আপনার ব্যাপার। বিক্রি করবেন, কাগজের দোকানে দেবেন, নাকি নিজের ছেলে-মেয়েকে পড়াবেন—যা খুশি করবেন।
চোর মাথায় হাত দিল।
—তোমার পড়াশোনা ভালো লাগে না?
আরাফাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ভালো লাগে না মানে? বই দেখলেই আমার মনে হয় আমি কেন জন্মালাম!
চোর এবার সত্যিই বিভ্রান্ত। সে জীবনে অনেক ধরনের বাড়িতে চুরি করেছে। কেউ তাকে দেখে চিৎকার করেছে। কেউ দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ তাকে ধরতে দৌড়েছে। কেউ ভয়ে কাঁদতে শুরু করেছে। কিন্তু এমন মানুষ সে জীবনে
দেখেনি, যে চোরকে দেখে বলছে—
"ভাই, বইগুলোও নিয়ে যান।"
চোর বলল, তুমি কি আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছ?
আরাফাত বলল, না ভাই! বরং আপনাকে সাহায্য করছি।
—কীভাবে?
—আপনার বস্তা তো এখনো অর্ধেক খালি। ওগুলো দিয়ে ভরে নিন।
চোর বলল, আমার বস্তা বইয়ের জন্য না।
আরাফাত বলল, আজ থেকে ব্যবহার বদলে ফেলেন।
চোর চুপ।
আরাফাত এবার নিজেই টেবিলের কাছে গেল।একটার পর একটা বই তুলে বস্তায় ঢুকাতে লাগল।
—এইটা বাংলা। এইটা ইংরেজি। এইটা গণিত।
চোর বলল, আরে আস্তে! বস্তা ছিঁড়ে যাবে!
আরাফাত বলল, ছিঁড়লে নতুন বস্তা কিনে নেবেন। কিন্তু বইগুলো নিতে হবে।
চোর এবার বস্তা ধরে বলল, ভাই, তুমি নিশ্চিত?
—শতভাগ।
—পরে কিন্তু আমাকে দোষ দিও না।
—দোষ দেব কেন? বরং আপনাকে ধন্যবাদ দেব।
আরাফাত শেষ বইটাও বস্তায় ঢুকিয়ে দিল। তারপর খাতা। পেনসিল বক্স। জ্যামিতি বক্স। এমনকি তার পুরোনো স্কুলের রুটিনটাও বস্তায় ঢুকিয়ে দিল।
চোর বলল, রুটিনটাও কেন?
আরাফাত বলল, ওটা দেখলেই আমার স্কুলের কথা মনে পড়ে। নিয়ে যান।
চোর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বস্তা কাঁধে তুলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। যাওয়ার সময় আরাফাত পেছন থেকে বলল,
—ভাই!
চোর থেমে গেল।
—আবার কী?
—একটা কথা বলি?
—বলো।
—আমার স্কুলের ড্রেসটাও নিয়ে যাবেন?
চোর এবার দুই হাত তুলে বলল, না ভাই! আমি চোর, কাপড়ের ব্যবসায়ী না!
আরাফাত বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। আমার বইগুলো নিয়েছেন, এটাই অনেক বেশি এবং ধন্যবাদ।
চোর চলে যাবার পর আরাফাত স্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে গেল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









