এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আমাদের এলাকার স্কুলটির অবস্থা এমন হলো, যেন ফলাফল নয়—ভূমিকম্প হয়েছে।
গত বছর যেখানে বেশির ভাগ ছাত্র পাস করেছিল, এবার সেখানে ফেল করেছে অর্ধেকেরও বেশি। যারা পাস করেছে, তাদের ফলও এমন যে মার্কশিট হাতে নিয়ে আনন্দ করার আগে দুবার চোখ কচলাতে হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে হেডমাস্টার সাহেব জরুরি অভিভাবক সভা ডাকলেন। নির্ধারিত সময়ে অভিভাবকেরা মিলনায়তনে হাজির হলেন। সবার মুখ গম্ভীর। কারও ছেলে ফেল করেছে, কারও মেয়ে। কেউ আবার ফলাফল দেখে এতটাই হতাশ যে, সন্তানকে বকবেন, নাকি স্কুলকে—সেটাই বুঝতে পারছেন না।
সামনের সারিতে এক বাবা চুপচাপ বসে আছেন। হাত দুটো কোলে গুটানো। তিনি শুধু শুনছেন।
কিছুক্ষণ পর হেড স্যার মঞ্চে উঠলেন। গোলগাল চেহারা, নাকের ডগায় মোটা চশমা, কপালে ঘাম। রুমাল দিয়ে কপাল মুছে চশমাটা ঠিক করে গলা খাঁকারি দিলেন।
—সম্মানিত অভিভাবকবৃন্দ, এবারের ফলাফলে আপনারা নিশ্চয়ই হতাশ।
পেছন থেকে একজন বললেন,
—শুধু আমরা, স্যার?
হেড স্যার শুনেও না শোনার ভান করলেন।
—শুরুতেই একটা কথা পরিষ্কার করে দিই—এই খারাপ ফলাফলের জন্য স্কুলের কোনো দোষ নেই।
মিলনায়তনে গুঞ্জন উঠল।
হেড স্যার হাত তুলে সবাইকে থামালেন।
—আগে আমার কথাটা শুনুন। যুক্তি আছে।
তিনি ফাইল খুলে দু-এক পাতা উল্টালেন।
—প্রথমত, ছাত্রদের পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ আপনারা বাড়িতে তৈরি করতে পারেননি।
একজন বাবা বললেন, স্যার, আমরা তো নিয়মিত স্কুলে পাঠিয়েছি।
—স্কুলে পাঠালেই কি দায়িত্ব শেষ?
—না, তবে...
—ফিরে এসে কী করেছে, সেটা দেখেছেন?
বাবা একটু থেমে বললেন,
—পড়েছে।
—কী পড়েছে?
এবার বাবা চুপ।
হেড স্যার মাথা নাড়লেন।
—এই তো! কী পড়ছে, বুঝছে কি না—এসবও দেখতে হবে। শুধু স্কুলে পাঠিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়।
একজন মা বললেন, আমরা তো ভেবেছি, স্কুলে পড়ানো হয়।
—অবশ্যই হয়। আমরা নিয়মিত পড়িয়েছি।
হেড স্যার গর্বের সঙ্গে বললেন, কিন্তু ছাত্ররা ক্লাসে চুপ করে বসে থেকেছে।
এক মা অবাক হয়ে বললেন,
—চুপ থাকলে তো ভালোই, স্যার!
—না, না! চুপ থাকলেই ভালো নয়। না বুঝলে প্রশ্ন করতে হবে।
—প্রশ্ন করেনি কেন?
হেড স্যার এক মুহূর্তও দেরি না করে বললেন,
—সেটা আপনাদের দেখতে হবে।
মিলনায়তনে আবার গুঞ্জন উঠল।
একজন বাবা বললেন,
—আমরা তো শিক্ষকদের ওপর ভরসা করেছি।
হেড স্যার চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।
—এই ভরসাটাই ভুল। ছাত্র চুপ থাকলে শিক্ষক ধরে নেন, সে বুঝেছে।
একটু থেমে তিনি যোগ করলেন,
—মৌনতা সম্মতির লক্ষণ।
সামনের সারির বাবা পাশের জনের দিকে একবার তাকালেন। তারপর আবার চুপ করে গেলেন।
হেড স্যার এবার খাতার প্রসঙ্গে এলেন।
—আরেকটি সমস্যা হলো, অনেক ছাত্রের হাতের লেখা অত্যন্ত খারাপ। শিক্ষক উত্তর বুঝবেন, নাকি লেখা উদ্ধার করবেন?
একজন বাবা বললেন,
—এটার দায়ও আমাদের?
—অবশ্যই।
হেড স্যার এমনভাবে বললেন, যেন বিষয়টি নিয়ে কোনো বিতর্কই হতে পারে না।
—ছোটবেলায় ভালো কলম দেননি। ভালো কলমে লিখলে হাতের লেখাও ভালো হতো।
কয়েকজন অভিভাবক মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন।
হেড স্যার থামলেন না।
—অনেকে আবার পরীক্ষার প্রশ্নই ঠিকমতো বুঝতে পারেনি।
একজন মা বললেন,
—এটাও আমাদের দোষ?
—অবশ্যই।
—কীভাবে?
—ছোটবেলা থেকে পত্রিকা পড়ার অভ্যাস করাননি। পত্রিকা পড়লে ভাষাজ্ঞান বাড়ত। ভাষাজ্ঞান বাড়লে প্রশ্নও বুঝত।
একজন বাবা অবাক হয়ে বললেন,
—পত্রিকা পড়লেই—
হেড স্যার হাত তুলে থামিয়ে দিলেন।
—অভ্যাসটাই আসল। অভ্যাস তৈরি করবেন আপনারা। স্কুল তো আর ঘরে ঘরে গিয়ে পত্রিকা পড়াবে না!
সামনের সারির বাবা মাথা নিচু করে হাসি চাপলেন।
হেড স্যার এবার মোবাইল প্রসঙ্গে এলেন।
—আরেকটা বড় সমস্যা হলো মোবাইল। ছাত্ররা ফেসবুক, ইউটিউব, গেমে ডুবে থাকে। মোবাইল কে দিয়েছে?
মিলনায়তনে নীরবতা নেমে এল।
হেড স্যার বিজয়ীর ভঙ্গিতে বললেন,
—অভিভাবকেরাই তো দিয়েছেন!
একজন বাবা বললেন,
—আপনারাই তো বলেছিলেন, ছেলেমেয়েদের আপডেট রাখতে হবে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে স্মার্টফোন লাগবে।
—স্মার্টফোন দিয়েছেন, ঠিক আছে। কিন্তু সেটা দিয়ে কী করছে, দেখেছেন?
কেউ কিছু বলল না।
হেড স্যার আঙুল গুনতে গুনতে বললেন,
—রাত জেগে মোবাইল চালায়—দোষ অভিভাবকদের। বই না খুলে মোবাইল দেখে—দোষ অভিভাবকদের। পড়াশোনায় মন নেই—দোষ অভিভাবকদের।
সামনের সারির বাবার চোয়াল এবার শক্ত হয়ে গেল।
তিনি আস্তে করে বললেন,
—তাহলে আমরা কী করলে ঠিক হতো?
হেড স্যার চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,
—আরও সচেতন হতে হতো।
—আর স্কুল?
হেড স্যার নির্বিকারভাবে বললেন,
—স্কুল তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে।
এবার সেই চুপচাপ বাবা উঠে দাঁড়ালেন।
—স্যার, একটা কথা বলব?
—অবশ্যই বলুন।
বাবা চারদিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন,
—আপনার কথা থেকে যতটুকু বুঝলাম, ছাত্র চুপ থাকলেও দোষ আমাদের। না পড়লেও দোষ আমাদের। হাতের লেখা খারাপ হলেও দোষ আমাদের। প্রশ্ন বুঝতে না পারলেও দোষ আমাদের। মোবাইল চালালেও দোষ আমাদের। এমনকি ফল খারাপ হলেও দোষ আমাদের।
হেড স্যার সন্তুষ্টভাবে মাথা নাড়লেন।
—ঠিক বুঝেছেন।
বাবা মুচকি হাসলেন।
—তাহলে আগামী বছর থেকে ছেলেমেয়েদের আর স্কুলে পাঠাব না।
হেড স্যারের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—সে কী! কেন?
—দোষ যদি আমাদেরই হয়, তাহলে স্কুলে পাঠিয়ে লাভ কী?
তিনি একটু থেমে বললেন,
—বাড়িতেই পড়াব। পরীক্ষা নেব। খাতা দেখব। নম্বর কম পেলে নিজেরাই নিজেদের বকব। ফেল করলে নিজেদেরই দায়ী করব।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো মিলনায়তনে হাসির রোল পড়ে গেল।
হেড স্যার চশমা খুলে কপাল মুছলেন। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন।
বাবা হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে দিলেন।
—তবে একটা কথা আছে।
হেড স্যার সতর্ক হয়ে তাকালেন।
—কী কথা?
বাবা মুচকি হেসে বললেন,
—আগামী বছর বাড়িতে পড়িয়েও যদি ফেল করে, আপনাদের কাছে কোনো অভিযোগ করব না।
হেড স্যারের মুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল।
—এই তো! এটাই হওয়া উচিত। দায়িত্ব নিজের হাতে নিলে—
—তবে একটা সমস্যা থাকবে।
—কী সমস্যা?
—তখনও তো আপনি বলবেন, স্কুলে না পাঠিয়ে ভুল করেছি!
স্বস্তি মুহূর্তেই উধাও। মিলনায়তনে এবার হাসির সঙ্গে হাততালিও শুরু হলো। হেড স্যার চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে চুপ করে বসে রইলেন। কেউ আর কোনো প্রশ্ন করল না। কারণ হেড স্যার তো আগেই বলে দিয়েছেন—মৌনতা সম্মতির লক্ষণ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









