একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ সমাজের পূর্বশর্ত হলো নারীর অবাধ ও নিরাপদ বিচরণ। অথচ আক্ষেপের বিষয়, আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় গণপরিবহন থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, সাইবারজগৎ—এমনকি নিজের চেনা গৃহকোণেও নারীরা আজ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। শঙ্কা আর ভয়ের এই অন্ধকার চাদর সরিয়ে কীভাবে একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলা যায়? নারী সুরক্ষার এই বহুমাত্রিক সংকট এবং তা থেকে উত্তরণের সুচিন্তিত উপায় নিয়ে কয়েকজন সচেতন শিক্ষার্থীর গভীর উদ্বেগ ও ভাবনাগুলো এক সুতোয় গেঁথেছেন শিক্ষার্থী আমানুর রহমান।
নিরাপদ নারী, সমৃদ্ধ জাতি
যে নারী সন্তান লালন করেন, পরিবার গড়ে তোলেন এবং জাতির মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়ান, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। নারী কেবল সমাজের অর্ধেক অংশ নন, তিনি সভ্যতার ভিত্তি। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে আজকের পোশাকশিল্প পর্যন্ত এ দেশের প্রতিটি অর্জনে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। তবুও প্রতিদিন রাস্তাঘাটে, কর্মক্ষেত্রে, গণপরিবহনে, এমনকি গৃহের ভেতরেও বহু নারী সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এই অনিরাপদ পরিবেশ তাঁদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও মানসিক বিকাশের পথ সংকুচিত করে দিচ্ছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো’ (সূরা আন-নিসা: ১৯)। নারী নিরাপদ থাকলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—তিনটি স্তরেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। তাই নারীর নিরাপত্তা কেবল ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নয়; এটি জাতীয় অগ্রগতির মৌলিক পূর্বশর্ত। আইনের কার্যকর প্রয়োগ, পারিবারিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমেই কেবল নারীর জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গড়া সম্ভব। — মো. মাজহারুল ইসলাম, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া
সমাজের চোখে বন্দি নারীর নিরাপত্তা
নিরাপত্তা মানেই স্বাধীন ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরার জন্মগত অধিকার। অথচ বর্তমান সমাজে নারীদের সেই ন্যূনতম নিরাপত্তাটুকুও অবশিষ্ট নেই। ঘরের বাইরে পা বাড়ালেই তাদের মুখোমুখি হতে হয় হায়েনাদের লোলুপ দৃষ্টির। জীবন-জীবিকা বা স্বপ্নের তাগিদে কর্মক্ষেত্রে পা রাখা নারীরা প্রতিনিয়ত কটূক্তি ও নানা নোংরা প্রস্তাবের শিকার হন। তা প্রত্যাখ্যান করলে তাদের জীবনকে নরকতুল্য করে তোলা হয়। শালীন পোশাক পরা সত্ত্বেও অশালীন মন্তব্য থেকে রেহাই মেলে না। একা পথ চলতে গিয়ে অনেক নারীই শিকার হচ্ছেন ভয়াবহ নিপীড়ন ও ধর্ষণের। দিন কিংবা রাত—কোনো সময়ই তাঁদের জন্য নিরাপদ নয়; একা পথ চলা যেন প্রবল এক আতঙ্কের নাম।
কাগজে-কলমে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও, বাস্তবতার চিত্রটি আজও ভিন্ন। নারীদের নিরাপত্তা যেন আজ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির শিকলে বন্দি। সমাজে নারীদের কেবল ‘ভোগের বস্তু’ না ভেবে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গণ্য করার মানসিকতা তৈরি না হলে এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। — রেশমী আকতার, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম।
নারীর নিরাপদ গন্তব্য
গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে ধর্ষণের মতো ঘটনা আজ নিত্যদিনের বাস্তবতা, যা সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও লজ্জাজনক। শিশু থেকে বৃদ্ধা—সবাই প্রতিনিয়ত এই নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন। নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে দ্রুত কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
সমাধান হিসেবে নারীদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কমাতে ও অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করতে গণপরিবহনে সিসিটিভি ক্যামেরার মতো আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা প্রয়োজন। তবে শুধু প্রযুক্তি বা আইন যথেষ্ট নয়; আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তনও অপরিহার্য। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গণপরিবহন নারীদের এগিয়ে চলার পথে বাধা না হয়ে সহায়ক হয়ে উঠবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। — ফাহিমা আক্তার, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, ঢাকা
অন্তর্জালে নারী নিরাপত্তা
সমাজে নারীর নিরাপত্তা হলো জাতীয় অগ্রগতি ও সভ্যতার অন্যতম প্রধান সূচক। তবে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। সাইবার বুলিং, ব্ল্যাকমেইল, ভুয়া প্রোফাইল তৈরি ও ট্রলিংয়ের মতো অপরাধ প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অনলাইনে হয়রানির শিকার হওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৬০ শতাংশই ১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণী।
‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’-এর তথ্যমতে, মাত্র কয়েক মাসে প্রায় ২,৬৯৪টি অভিযোগ এসেছে; যার ৩১ শতাংশ ট্রলিং, ১৭ শতাংশ হ্যাকিং এবং ১৫ শতাংশ অন্যের পরিচয় ব্যবহার (ইম্পার্সনেশন) সংক্রান্ত। এই উদ্বেগজনক অনলাইন সহিংসতা রোধে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। নারীদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করতে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। — তানজিলা আক্তার, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম
নারী কার কাছে নিরাপদ
রাস্তা, গণপরিবহন, এমনকি নিজের ঘরেও নারী আজ নিরাপদ নন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, এ দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যের হাতেই সহিংসতার শিকার হন। অন্যদিকে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ধর্ষণের বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে; অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও রহস্যজনকভাবে দ্রুত জামিনে ছাড়া পেয়ে যায়। উল্টো বিচার চাইতে গেলে ভুক্তভোগীকেই পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। তাহলে সহিংসতার শিকার হলে বা হেনস্তার মুখে পড়লে নারী কার কাছে অভিযোগ জানাবেন? কার কাছে তিনি প্রকৃত নিরাপত্তা ও সুবিচার চাইবেন? রাষ্ট্র ও বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির কাছে আমার একটাই প্রশ্ন—এই স্বাধীন দেশে নারী আসলে কার কাছে নিরাপদ? — শ্যামা মেহজাবিন, নিউ গভর্মেন্ট ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী
নিরাপদ হোক নারীজীবন
‘নারী’ শব্দটিতে জড়িয়ে আছে মায়া, মমতা ও ভালোবাসার এক অদ্ভুত প্রশান্তি। একটি পরিবারের সমৃদ্ধির প্রতীক নারী; জীবনের বিভিন্ন ধাপে কন্যা, মা কিংবা স্ত্রী হিসেবে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু বর্তমান সমাজচিত্রের দিকে তাকালে শুধু নারী নির্যাতন আর ধর্ষণের খবরই চোখে পড়ে।
দেশে পর্যাপ্ত আইন থাকলেও সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগের অভাব রয়েছে। অর্থের আধিপত্য এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ন্যায়বিচার পদে পদে থমকে যাচ্ছে। ফলে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা নারীরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হতে সাহস পান না; আবার অনেকেই নিজের আইনি অধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্ত অবগত নন। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। আইন যেন কেবল সংবিধানের লিখিত দলিলেই সীমাবদ্ধ না থাকে। বাস্তব জীবনে আইনের সঠিক, স্বচ্ছ ও সুচারু প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল নারীদের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। — অস্তি বড়ুয়া, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









