একদিন বিজ্ঞানীদের হাতে এল ছোট্ট একটি পাখির পালক। দেখতে একেবারেই সাধারণ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা জানতেন, এই ছোট্ট পালকের ভেতর লুকিয়ে থাকতে পারে অনেক পুরোনো গল্প।
কেমন গল্প?
বাতাসে একসময় কতটা দূষণ ছিল, মাটিতে কী ধরনের বিষাক্ত পদার্থ জমেছিল, এমনকি দূরের কোনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত পরিবেশে কী প্রভাব ফেলেছিল—এসবের কিছু চিহ্নও নাকি পাওয়া যেতে পারে একটি পালকে!
পাখিটির নাম হামিংবার্ড।
মেক্সিকোর একদল গবেষক এই ছোট্ট পাখির পালক পরীক্ষা করে প্রায় ৮০ বছরের পরিবেশের ইতিহাস জানার চেষ্টা করেছেন। তাদের হাতে ছিল ১৯৩২ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখা হামিংবার্ডের নমুনা।
অর্থাৎ, প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো এক ‘প্রাকৃতিক নথি’ যেন তাদের সামনে!
পালকের ভেতর কীভাবে গল্প জমে?
হামিংবার্ড দেখতে ছোট হলেও তার জীবন বেশ চমকপ্রদ। ফুলের সামনে তারা এমনভাবে উড়তে পারে যে মনে হয় বাতাসে স্থির হয়ে আছে। এ জন্য তাদের খুব দ্রুত ডানা ঝাপটাতে হয়।
তবে তাদের পালক শুধু উড়তে সাহায্য করে না, পরিবেশের গল্পও ধরে রাখতে পারে।
হামিংবার্ড জীবনে কয়েকবার পালক বদলায়। নতুন পালক যখন শরীরে গজায়, তখন সেখানে রক্তের মাধ্যমে পুষ্টি পৌঁছায়। শরীরে থাকা কিছু রাসায়নিক পদার্থও সেই সময় পালকে জমা হতে পারে। পরিবেশে যদি সিসা, পারদ বা আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতু থাকে, সেগুলোর কিছু অংশও পালকে জমা হতে পারে।
পালক পুরোপুরি গজিয়ে গেলে সেখানে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পালকে জমে থাকা এসব রাসায়নিক চিহ্ন অনেকটা সময় ধরে থেকে যেতে পারে।
পালক তৈরি হয় কেরাটিন নামের শক্ত প্রোটিন দিয়ে। এই কেরাটিন ভারী ধাতুর মতো কিছু পদার্থ ধরে রাখতে পারে। তাই অনেক বছর আগে সংরক্ষণ করা একটি পাখির পালকও বিজ্ঞানীদের বলতে পারে—সেই সময় পরিবেশে কী ঘটছিল।

পুরোনো পাখিরা যেন পুরোনো সময়ের বাক্স
ধরো, তোমার কাছে ৫০ বছর আগের একটি ডায়েরি আছে। সেটি পড়লে তুমি জানতে পারবে সেই সময়ের মানুষের জীবন কেমন ছিল। বিজ্ঞানীদের কাছে পুরোনো পাখির নমুনাও অনেকটা তেমন। মেক্সিকোর বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সংগ্রহশালায় বহু বছর ধরে পাখির নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা সেসব সংগ্রহশালা থেকে ১৯৩২ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সংরক্ষিত হামিংবার্ডের পালক পরীক্ষা করেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব মেক্সিকোর কাম্পেচে, ইউকাতান, চিয়াপাস ও কুইন্তানা রু অঞ্চলের নমুনাও এই গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রতিটি পুরোনো পাখি যেন তার সময়ের একটি ছোট্ট বাক্স। তার শরীরে জমে থাকা কিছু রাসায়নিক চিহ্ন বিজ্ঞানীদের অতীতের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
পালকে ধরা পড়ল দূষণের পরিবর্তন
গবেষকেরা মূলত সিসা, পারদ ও আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতুর মাত্রা পরীক্ষা করেছেন। পরীক্ষার ফলাফলে একটি মজার বিষয় দেখা যায়—সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হামিংবার্ডের পালকে সিসার পরিমাণ কমেছে। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো পেট্রোলে সিসার ব্যবহার ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, মানুষের নেওয়া একটি পরিবেশগত সিদ্ধান্তের প্রভাবও পাখির পালকে ধরা পড়েছে!
ভাবো তো, বিজ্ঞানীরা যেন পালক দেখে বলছেন—‘এই সময়ের পর পরিবেশে সিসা কমতে শুরু করেছে।’
আগ্নেয়গিরির ছাপও আছে!
গল্পটা এখানেই শেষ নয়। ১৯৮২ সালে মেক্সিকোর চিচোনাল আগ্নেয়গিরিতে বড় ধরনের অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল। সেই অগ্ন্যুৎপাতের সময় ছাই, সালফারজাত গ্যাসসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। বাতাস এসব উপাদান অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। পরে বৃষ্টির সঙ্গে সেগুলো মাটিতে, গাছের পাতায় কিংবা ফুলে জমতে পারে।
হামিংবার্ড ফুলের মধু পান করে এবং ছোট ছোট পোকাও খায়। ফলে পরিবেশে থাকা কিছু পদার্থ তাদের শরীরেও ঢুকতে পারে। গবেষকেরা ১৯৮২ সালের ওই অগ্ন্যুৎপাতের সময়ের কাছাকাছি কিছু নমুনায় ভারী ধাতুর মাত্রা বেড়ে যাওয়ার চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন। অর্থাৎ, একটি পাখির পালকের মধ্যেও দূরের আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ছাপ পাওয়া যেতে পারে!
দূষণ কোনো সীমানা মানে না
এখান থেকে বিজ্ঞানীরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে পারেন। ধরো, একটি বন খুব সুন্দর ও নিরাপদ জায়গা। সেখানে কোনো কারখানা নেই। তবু সেই বনের বাতাস যদি দূরের কোনো দূষিত এলাকার বাতাসের সঙ্গে মিশে যায়, তাহলে দূষণের কিছু উপাদান সেখানেও পৌঁছাতে পারে। আবার কোনো আগ্নেয়গিরি থেকে বের হওয়া ছাই ও গ্যাসও বাতাসের সঙ্গে অনেক দূরে চলে যেতে পারে। তাই প্রকৃতির কাছে মানুষের আঁকা সীমানা সবসময় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। দূষিত বাতাস এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে পারে।
হামিংবার্ডের জন্য কি বিপদ আছে?
এই গবেষণায় পালকে ভারী ধাতুর উপস্থিতি দেখা হয়েছে। এসব ধাতুর কারণে হামিংবার্ডের শরীরে ঠিক কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, তা এই গবেষণায় পরীক্ষা করা হয়নি।
তবে অন্য পাখিদের নিয়ে করা গবেষণা থেকে বিজ্ঞানীরা জানেন, দীর্ঘদিন ভারী ধাতুর সংস্পর্শে থাকলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রজননব্যবস্থায় সমস্যা হতে পারে। স্নায়ু ও শ্বাসতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি পাখির ডানার গঠনেও পরিবর্তন ঘটতে পারে। আর হামিংবার্ডের জন্য ডানা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তো বোঝাই যায়। ফুলের সামনে বাতাসে স্থির থাকা থেকে শুরু করে দ্রুত উড়ে এক ফুল থেকে আরেক ফুলে যাওয়া—সবকিছুর জন্য তাদের ডানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ছোট্ট পাখি, বড় দায়িত্ব
হামিংবার্ড শুধু সুন্দর একটি পাখি নয়। প্রকৃতির জন্যও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়ানোর সময় পরাগরেণু এক ফুল থেকে অন্য ফুলে নিয়ে যায়। এভাবে অনেক উদ্ভিদের প্রজননে সাহায্য করে।
জীববিজ্ঞানী মারিয়া দেল কোরো আরিমেন্দির মতে, আমেরিকায় প্রায় ৭ হাজার উদ্ভিদপ্রজাতি তাদের প্রজননে হামিংবার্ডের ওপর নির্ভর করে। তাই হামিংবার্ডের ক্ষতি হলে শুধু একটি পাখিরই ক্ষতি হবে না। এর প্রভাব পড়তে পারে অনেক উদ্ভিদ এবং পুরো পরিবেশব্যবস্থার ওপর।
একটি পালক, একটি পুরোনো গল্প
একটি ছোট্ট পালক আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। পরিবেশের ইতিহাস শুধু বই, ছবি কিংবা মানুষের লেখা নথিতে থাকে না। কখনো কখনো সেই ইতিহাস লুকিয়ে থাকে একটি পাখির শরীরেও।
একটি পুরোনো পালক বিজ্ঞানীদের জানাতে পারে—কয়েক দশক আগে পরিবেশে কী ধরনের দূষণ ছিল, কখন দূষণ বেড়েছিল, আবার কখন তা কমতে শুরু করেছিল। এমনকি কোনো দূরের আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ছাপও সেখানে পাওয়া যেতে পারে।
তাই বিজ্ঞানীদের কাছে পুরোনো বৈজ্ঞানিক সংগ্রহশালায় রাখা পাখিগুলো শুধু মৃত প্রাণীর নমুনা নয়। তারা যেন অতীতের পরিবেশের ছোট ছোট নথি। হামিংবার্ডের পালক যেন সময়ের পাতায় লেখা অদৃশ্য কালি।
আর বিজ্ঞানীরা সেই অদৃশ্য লেখা পড়ার চেষ্টা করছেন—যাতে আমরা বুঝতে পারি, বছরের পর বছর মানুষের কর্মকাণ্ডে পৃথিবীর বাতাস, মাটি ও প্রকৃতি কীভাবে বদলে গেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









