ইতিহাসের আদালতে বিচারকের আসনটা সাধারণত শাসকদের জন্যই বরাদ্দ থাকে। আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ায় সেই মানুষ, যে নিজের প্রাপ্যটুকু চায়। যে কৃষক ফসলের ন্যায্য ভাগ দাবি করে, সে হয়ে যায় বিদ্রোহী। যে নারী অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়ায় না, সে হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। আর যে মানুষ শোষণের নিয়ম মানতে অস্বীকার করে, রাষ্ট্র তার নামের পাশে লিখে দেয়—অপরাধী। ইলা মিত্রের জীবন এই অভিধানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ইতিহাস।
তিনি জানতেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে শাস্তি আসতে পারে। তবু তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। কারণ তার কাছে রাজনীতি ছিল না ক্ষমতার দরজায় পৌঁছানোর সিঁড়ি। ছিল সেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের হাতে অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সংগ্রাম।
১৯২৫ সালে জন্ম নেওয়া ইলা মিত্রের রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় এক অন্য বাংলা। সেই বাংলায় কৃষক জমি চাষ করতেন, বীজ বুনতেন, ফসল ফলাতেন। কিন্তু ফসলের বড় অংশ চলে যেত জমিদার ও জোতদারের গোলায়। মাটির সঙ্গে কৃষকের সম্পর্ক ছিল শরীরের সম্পর্কের মতো—ঘাম, ক্ষুধা, পরিশ্রম আর বেঁচে থাকার সম্পর্ক। অথচ সেই মাটির ওপর তার অধিকার ছিল সামান্য। যে মানুষ খাদ্য উৎপাদন করতেন, তার নিজের থালায় খাবার থাকবে কি না, তা নির্ধারণ করত অন্য কেউ। ইলা মিত্র এই ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেননি। প্রকৃতি যেমন মানুষের মধ্যে জমির অধিকার ভাগ করে দেয় না, তেমনি শোষণও কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম নয়। তা মানুষের তৈরি। আর মানুষই চাইলে সেই নিয়ম বদলাতে পারে।
তেভাগা আন্দোলনের দাবি ছিল সরল, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর রাজনৈতিক বিস্ফোরণ— বর্গাচাষি যে ফসল ফলাবেন, তার দুই-তৃতীয়াংশ তার প্রাপ্য। কথাটা ফসলের ভাগ নিয়ে হলেও, আসলে তা ছিল ক্ষমতার ভাগ নিয়ে। কে উৎপাদন করবে, কে ভোগ করবে, আর কে ঠিক করবে অন্যের শ্রমের মূল্য—এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল তেভাগা। কৃষকেরা আর দয়ার পাত্র হয়ে থাকতে চাননি। তারা নিজেদের শ্রমের ন্যায্য হিস্যা চেয়েছিলেন। তাদের দাবি ছিল, যে হাত মাটিতে বীজ পোঁতে, সেই হাতেরও অধিকার আছে ফসলের ওপর। ইলা মিত্র এই দাবির মধ্যে দেখেছিলেন নতুন সমাজের সম্ভাবনা। এমন এক সমাজ, যেখানে মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হবে না জন্ম, সম্পদ কিংবা ক্ষমতাবানের অনুগ্রহে।
নাচোলের সাঁওতাল কৃষকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক এই রাজনীতিকে আরও গভীর করেছিল। তিনি তাদের জীবনকে দূর থেকে দেখেননি। তাদের ক্ষুধা, জমি, শ্রম, অপমান ও প্রতিরোধের সঙ্গে নিজের জীবনকে যুক্ত করেছিলেন। সাঁওতাল কৃষকেরা তার কাছে করুণা পাওয়ার মানুষ ছিলেন না। তারা ছিলেন সেই সমাজের নির্মাতা, যে সমাজ তাদেরই প্রান্তে ঠেলে রেখেছিল। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। দরিদ্র মানুষের জন্য সহানুভূতি দেখানো সহজ; যে ব্যবস্থা মানুষকে দরিদ্র করে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন। প্রথমটি মানুষের বিবেককে সাময়িক স্বস্তি দেয়। দ্বিতীয়টি ক্ষমতার স্বার্থে আঘাত করে। ইলা মিত্র দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন। তিনি শুধু নিপীড়িত মানুষের হয়ে কথা বলেননি, তাদের নিজেদের অধিকারের জন্য সংগঠিত হওয়ার সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন।
তারপর রাষ্ট্র এল। রাষ্ট্রেরও নিজস্ব ভাষা আছে। সে নিজের হিংসাকে বলে আইনশৃঙ্খলা, আর মানুষের প্রতিরোধকে বলে অশান্তি। ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কৃষক হয়ে ওঠে অপরাধী; ক্ষমতা রক্ষার নামে চালানো নির্যাতন হয়ে ওঠে শাসনের প্রয়োজন। নাচোলের কৃষক আন্দোলন দমনের সময় এই ভাষার নির্মম চেহারা প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৫০ সালে গ্রেপ্তারের পর ইলা মিত্রের ওপর চালানো হয় ভয়াবহ নির্যাতন। তার শরীরকে ভেঙে দিয়ে তার বিশ্বাসকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তার নারীশরীরের ওপর নির্যাতন ছিল নিছক নিষ্ঠুরতা নয়; এর মধ্যে ছিল ভয় দেখানোর রাজনীতি। যেন তার যন্ত্রণা দেখে অন্য নারীরা বুঝতে পারেন, সীমা কোথায় টানা হয়েছে; কৃষকেরা বুঝতে পারেন, অধিকার চাইলে কী মূল্য দিতে হয়। কিন্তু একটি শরীরকে নির্যাতন করা যায়, তার ক্ষতকে অস্বীকার করা যায়, এমনকি সেই ক্ষতের ইতিহাসও চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা যায়। তাতে নির্যাতন ন্যায় হয়ে যায় না। বরং প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে ওঠে— যে রাষ্ট্র নিজের ন্যায়বিচারের দাবি করে, সে কেন একজন বন্দী নারীকে নির্যাতন করে? যে শাসনব্যবস্থা নিজের বৈধতার কথা বলে, সে কেন কৃষকের ন্যায্য দাবি শুনতে ভয় পায়?
ইলা মিত্রের শরীরের ওপর চালানো নির্যাতন তাই কেবল অতীতের একটি ভয়াবহ ঘটনা নয়। তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরিত্র সম্পর্কে একটি প্রশ্ন, যার উত্তর আমাদের বর্তমানেও খুঁজতে হয়। কারণ ক্ষমতা বদলাতে পারে, শাসকের নাম বদলাতে পারে, আইনের ভাষা বদলাতে পারে; কিন্তু মানুষের প্রতিবাদকে দমন করার প্রবণতা থেকে যেতে পারে। কারাগার, নির্যাতন ও দীর্ঘ শারীরিক অসুস্থতা তার জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। মুক্তির পর তিনি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। বামপন্থী রাজনীতি ও মানুষের অধিকারের প্রশ্নে তার অবস্থান অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিও তিনি সমর্থন জানিয়েছিলেন। তার জীবনে পরাজয় ছিল, যন্ত্রণা ছিল, ছিল অসমাপ্তির বোধও। কিন্তু দমন-পীড়ন তার রাজনৈতিক বিশ্বাসকে মুছে দিতে পারেনি।
বিপ্লবের কথা বললে আমরা প্রায়ই পতাকা, মিছিল, স্লোগান কিংবা ক্ষমতা বদলের ছবি দেখি। কিন্তু বিপ্লবের আরও কঠিন একটি অর্থ আছে। তা হলো, মানুষের জীবন যেভাবে সাজানো হয়েছে, সেই বিন্যাসকে প্রশ্ন করা। কেন একজন মানুষ জমির মালিক আর আরেকজন ভূমিহীন? কেন একজনের শ্রমে সম্পদ তৈরি হয়, অথচ সেই সম্পদের ওপর অধিকার থাকে অন্যের? কেন কারও কণ্ঠস্বরকে গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য করা হয়, আর কারও প্রতিবাদকে অপরাধ বলে দমন করা হয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না বদলালে শুধু শাসকের মুখ বদলায়, সমাজের ভিত বদলায় না। পুরোনো বৈষম্য নতুন ভাষা শেখে, পুরোনো শোষণ নতুন পোশাক পরে ফিরে আসে। বিপ্লবের নামে গড়ে ওঠা ব্যবস্থাও যদি মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সেই বিপ্লবের হিসাব আবার নতুন করে নিতে হবে। ইলা মিত্রের জীবন আমাদের এই অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।
আজকের পৃথিবীতে তার রাজনৈতিক চেতনা আরও জরুরি। সম্পদ ও ক্ষমতা অল্প কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে; কৃষক, শ্রমিক, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উন্নয়নের বড় বড় হিসাবের আড়ালে চাপা পড়ে যায় একটি সাধারণ প্রশ্ন—এই উন্নয়নে কার জীবন বদলেছে, আর কাকে পেছনে ফেলে রাখা হয়েছে? বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে হলে দারিদ্র্যকে নয়, দারিদ্র্য তৈরির ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে হবে। অধিকার কোনো দয়া নয়, বৈষম্য কোনো নিয়তি নয়। শ্রমের মর্যাদা, সম্পদের ন্যায়সংগত বণ্টন, রাষ্ট্রের জবাবদিহি এবং শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ ছাড়া সমতার প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত স্লোগানেই আটকে থাকবে।

ইলা মিত্রকে স্মরণ করার অর্থ তাই শুধু অতীতের এক সাহসী নারীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়। তার ছবি টাঙিয়ে, তার নাম উচ্চারণ করে, তার নির্যাতনের কথা বলে যদি আমরা আজকের কৃষক, শ্রমিক, নারী কিংবা আদিবাসী মানুষের সংগ্রাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই, তবে সেই স্মরণ ক্ষমতার জন্য নিরাপদ, কিন্তু ইতিহাসের কাছে অর্থহীন।
ইলা মিত্রকে স্মরণ করতে হলে দেখতে হবে, আজও কে নিজের জমির অধিকার চাইছেন, কে ন্যায্য মজুরির দাবিতে কাজ হারাচ্ছেন, কে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলে অপমানিত হচ্ছেন। দেখতে হবে, কার শ্রমে সমাজের সম্পদ তৈরি হচ্ছে আর সেই সম্পদের দরজা কার জন্য বন্ধ থাকছে। কারণ ইতিহাসের বিদ্রোহীরা আমাদের হয়ে চিরকাল লড়াই করতে পারেন না। তাদের অসমাপ্ত সংগ্রামের দায় বর্তমানের মানুষেরই।
ইলা মিত্র কোনো নিষ্কলুষ প্রতিমা নন, যাকে দূরে রেখে ফুল দেওয়া যায়। তিনি একটি প্রশ্ন, যা আমাদের স্বস্তি নষ্ট করে। যে সমাজে মানুষের শ্রমের ফল অন্য কেউ আত্মসাৎ করে, সেখানে ন্যায়বিচার কোথায়? যে রাষ্ট্র মানুষের প্রতিবাদকে অপরাধ বানায়, সেখানে স্বাধীনতা কার? যে উন্নয়ন কাউকে বিপুল সম্পদের মালিক করে আর কাউকে বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা থেকেও বঞ্চিত রাখে, তাকে অগ্রগতি বলা যায় কি?
এই প্রশ্নের উত্তর স্মৃতিস্তম্ভে লেখা থাকে না। তা খুঁজতে হয় মানুষের জীবনে, সংগ্রামে, সংগঠনে এবং সমাজ বদলের কাজে। বৈষম্যহীন সমাজ কোনো দয়ালু শাসকের উপহার নয়। তা গড়ে তুলতে হয় সেই মানুষদের সম্মিলিত শক্তিতে, যাদের শ্রমে পৃথিবী চলে, অথচ যাদের কথাই সবচেয়ে কম শোনা হয়।
ইলা মিত্রের উত্তরাধিকার এইখানে—তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, মুক্তি কারও দান নয়; মুক্তি অর্জন করতে হয়। আর ইতিহাস শুধু শাসকেরা লেখেন না। কখনো কখনো তা লেখা হয় কৃষকের দাবিতে উঁচু হওয়া মুঠিতে, নির্যাতিত মানুষের ক্ষতে, আর মাথা নত করতে অস্বীকার করা এক নারীর অবিচলতায়।
ইলা মিত্র সেই ইতিহাসের নাম। তার জীবন বলে, অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়াই সবচেয়ে বড় পরাজয়। আর সেই পরাজয় অস্বীকার করে, মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদার জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়াই বিপ্লবী রাজনীতির সবচেয়ে জরুরি অঙ্গীকার।
পরিচিতি
ইলা মিত্র ছিলেন উপমহাদেশের কৃষক আন্দোলনের এক সাহসী নেত্রী, যার জীবন শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছে। ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার জন্মনাম ছিল ইলা সেন। অল্প বয়স থেকেই খেলাধুলা ও সমাজসেবায় আগ্রহী ইলা পরবর্তী সময়ে বামপন্থী রাজনীতিতে যুক্ত হন। কমিউনিস্ট নেতা রমেন মিত্রকে বিয়ে করার পর তিনি ইলা মিত্র নামে পরিচিত হন।
বাংলার তেভাগা আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত, বর্তমান বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের নাচোলে সাঁওতাল কৃষকদের সংগঠিত করতে তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য ভাগ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি নিজেকে যুক্ত করেন। ১৯৫০ সালে গ্রেপ্তারের পর তাকে নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অসুস্থ অবস্থায় মুক্তি পাওয়ার পর তিনি কলকাতায় ফিরে যান। পরবর্তী সময়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় থাকেন।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিও তার সমর্থন ছিল। ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর কলকাতায় তার মৃত্যু হয়। ইলা মিত্রের জীবন শুধু এক বিপ্লবীর জীবনী নয়; এটি শোষণের বিরুদ্ধে মানুষের মাথা তুলে দাঁড়ানোর ইতিহাস। তার সংগ্রাম আজও মনে করিয়ে দেয়, মুক্তি কারও দান নয়—অধিকার আদায় করে নিতে হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









