দিনাজপুরের উত্তর প্রান্তে বীরগঞ্জ উপজেলার এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে এক নিঃশব্দ ইতিহাস পুরোনো উপ-কারাগার ভবন। এক সময় যেখানে লোহার ফটকের শব্দে কেঁপে উঠত বাতাস, যেখানে বন্দিদের পায়ের শব্দ আর কারারক্ষীদের হুকুম ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী, আজ সেখানে ঝোপঝাড় আর নীরবতা। স্থানীয়দের মুখে মুখে জায়গাটির নতুন নাম ‘ভূতের বাড়ি’।
১৯৮০ এর দশকে নির্মিত এই মিনি সাব-জেলটির ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ১০০ জন বন্দি। ১৯৯১ সালে উপজেলা আদালতগুলো জেলা শহরে স্থানান্তরিত হলে দেশের অন্যান্য উপ-কারাগারের মতো এটিও অচল হয়ে পড়ে। তারপর কেটে গেছে তিন দশকের বেশি সময়। তদারকির অভাব, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি আর সময়ের নির্মমতায় দরজা-জানালাগুলো ভেঙে গেছে, ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে, দেয়ালে জন্মেছে শ্যাওলা।
এক সময় এই জেলখানার ভেতরে ছিল আলাদা আলাদা ওয়ার্ড আমদানি সেল, মেঘনা, হাসনাহেনা, চম্পাকলি, নীলনদ, পদ্মা, সুরমা, রূপসা নামের মধ্যেই যেন এক অদ্ভুত সৌন্দর্য। বন্দিদের প্রথমে রাখা হতো ‘আমদানি সেল’ এ যেটি ছিল টিনের ছাউনিযুক্ত লম্বা এক কক্ষ। আলো বাতাস কম ঢুকত, দিনেও থাকত আধো অন্ধকার। পাশেই তিনতলা ‘মেঘনা’ ভবন, সাধারণ বন্দিদের ওয়ার্ড। হাসপাতাল ওয়ার্ড ছিল তুলনামূলক আরামদায়ক এমনটাই জানালেন প্রবীণ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।
দিনের বেলায়ও ভবনটিতে প্রবেশ করলে এক ধরনের ভৌতিক অনুভূতি কাজ করে। ভাঙা সিঁড়ি, মরিচা ধরা লোহার গেট, ফাঁকা কক্ষ সব মিলিয়ে যেন এক থমথমে পরিবেশ। আর সন্ধ্যা নামলেই সেখানে জড়ো হয় কিছু বখাটে ও নেশাগ্রস্ত তরুণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনিক নজরদারি না থাকায় ভবনটি এখন অনিয়ন্ত্রিত আড্ডা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন (৫৮) বলেন, এই জেলখানাটা এক সময় ছিল আমাদের এলাকার পরিচয়। এখন দেখলে কষ্ট লাগে। ছেলেমেয়েরা ভয় পায় পাশ দিয়ে হাঁটতে। আমরা চাই সরকার এটা সংস্কার করে ভালো কিছুর জন্য ব্যবহার করুক।
আরেক বাসিন্দা মজনু মিয়া (৬৮) বলেন, রাতে এখানে অচেনা লোকজন আসে। নিরাপত্তার ভয় আছে। এত বড় জায়গা পড়ে আছে এখানে যদি পার্ক বা কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হতো, আমাদের সন্তানদের উপকার হতো।”
জানা যায়, ২০০৪ সালের ২২ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ভবনটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একসময় চিন্তা ছিল এটি শিশু অপরাধী সংশোধনাগার হিসেবে রূপান্তরের। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন হয়নি।
প্রদর্শনী: 'সংগ্রামী জীবনগাঁথা' নামে শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার আলোকচিত্র নিয়ে কারাগারের ভেতরে প্রথম প্রদর্শনী শুরু হয়।
জেলহত্যা দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ জেল ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জার্নি যৌথভাবে এর আয়োজন করে।
ইতিহাস বলছে, দিনাজপুর অঞ্চলে কারাগারের সূচনা ঔপনিবেশিক আমলে। বৃহত্তর দিনাজপুর কারাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৫৪ সালে। তারও আগে ১৭৮৮ সালে সুবেদার ইব্রাহিম খাঁ একটি দুর্গ নির্মাণ করেন, যা পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে জেলখানায় রূপান্তরিত হয়। সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যের ক্ষুদ্র অংশ যেন বীরগঞ্জের এই উপ-কারাগার।
দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের সংসদ সদস্য মো. মনজুরুল ইসলাম বলেন, বীরগঞ্জের এই পরিত্যক্ত উপ-কারাগার ভবন আমাদের সম্পদ। এটি অবহেলায় পড়ে থাকতে পারে না। আমি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে এটি সংস্কার করে আধুনিক পার্ক, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ব্যায়ামাগার, কনভেনশন সেন্টার ও একটি সমৃদ্ধ জাদুঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাই এখানে একটি ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনী গড়ে উঠুক, যেখানে নতুন প্রজন্ম আমাদের অতীত সম্পর্কে জানতে পারবে। পাশাপাশি থাকবে বিনোদন ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ১৮০ শতাংশ জমির ওপর গড়ে উঠতে পারে একটি বহুমুখী কমপ্লেক্স। থাকবে শিশুদের জন্য খেলার পার্ক, যুবকদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আধুনিক জিমনেশিয়াম, সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য কনভেনশন হল এবং একটি জাদুঘর যেখানে তুলে ধরা হবে কারা ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র।
স্থানীয় তরুণদের আশা, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থানও বাড়বে। ছোট ব্যবসা, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে প্রাণ ফিরবে এলাকায়।
আজ যে ভবনকে অনেকে ‘ভূতের বাড়ি’ বলে এড়িয়ে চলেন, সেটিই হয়তো অদূর ভবিষ্যতে হয়ে উঠবে বিনোদন ও জ্ঞানের কেন্দ্র। সময়ের অবহেলায় জীর্ণ দেয়ালগুলো অপেক্ষা করছে নতুন রঙের, নতুন প্রাণের স্পর্শের।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









