ভোরের নরম আলো, ছোট্ট রান্নাঘরে ব্যস্ততা, ওভেনে ঢুকছে একের পর এক কেক। কিছুক্ষণ পরই সেই কেক হয়ে উঠছে কারও জন্মদিনের আনন্দ, কারও ভালোবাসার উপহার, আবার কারও স্বপ্নপূরণের গল্প। সৈয়দপুরে এমন অসংখ্য রান্নাঘর এখন রূপ নিয়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার কারখানায়, যেখানে নারীরা নিজেদের হাতে গড়ে তুলছেন নতুন এক সম্ভাবনার দিগন্ত।একসময় যাদের পরিচয় ছিল শুধুই একজন মেয়ে, আজ তারা হয়ে উঠছেন সফল উদ্যোক্তা।
এভাবে সৈয়দপুরে হোমমেড কেক তৈরি ও হোমডিলেভরির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন প্রায় ২৫জনেরও বেশি নারীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে পুঁজি করে ঘরে বসেই গড়ে তুলছেন নিজস্ব ব্যবসা, দিচ্ছেন পরিবারে আর্থিক সহায়তা, আবার অনেকেই হয়ে উঠছেন অন্য নারীদের অনুপ্রেরণা। তাদেরই একজন শিক্ষার্থী লুবনা।
সৈয়দপুর শহরের বাশবাড়ি এলাকার মেয়ে লুবনা অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। অনলাইন কোর্সে কেক বানানো শিখে শুরু করেন তার যাত্রা। আজ তিনি গোটা সৈয়দপুর একজন সফল হোমমেড কেক উদ্যোক্তা। তাঁর তৈরি কেকের মধ্যে ফুটিয়ে তোলা হয় নানা চিত্র, ফুটে ওঠে প্রকৃতি কিংবা পছন্দের থিম। ‘লুবনা কেক হেভেন’ নামে ফেসবুক পেজ খুলে প্রতিদিনই ভালো অর্ডার পান, এমনকি অনেক সময় অতিরিক্ত চাহিদার কারণে অর্ডার বাতিলও করতে হয় তাঁকে।
৫০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যে কেক বিক্রি করেন তিনি। শিক্ষার্থীদের জন্য কম বাজেটের কেকও রাখেন মেনুতে। নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারেও নিয়মিত সহায়তা করছেন তিনি।
সফলতার বিষয়ে জানতে চাইলে লুবনা বলেন, রেস্তোরাঁ কিংবা দোকানের কেকের চাইতে বাসার তৈরি (হোমমেইড) কেককেই একটু বেশি প্রাধান্য দেয় স্বাস্থ্যসচেতন মানুষরা। ঘরে তৈরি নিজেদের পছন্দের ডিজাইন অনুযায়ী কেক কেনায় আগ্রহ বেড়েছে। আমার একটাই ইচ্ছে ছিল, মানুষকে স্বাস্থ্যকর কেক বানিয়ে খাওয়ানো। বর্তমানে আমি ২৫ ধরনের যেকোন ডিজাইনের কাস্টমাইজ কেক বাসায় তৈরি করে হোম ডিলেভরি দিচ্ছি। এক্ষেত্রে আমার পরিবার আমাকে সার্বিক সহযোগিতা করে।
তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র ফেসবুকে প্রচারের মাধ্যমে হোমমেড কেক বিক্রি করে আমার মোটামুটি উপার্জনও হচ্ছে। আমার স্বপ্ন পড়াশোনা শেষ করে একটি কেকের রেস্টুরেন্ট খোলার। আমার বানানো কেক ছড়িয়ে পড়ুক দেশের আনাচে-কানাচে। জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী, বিভিন্ন দিবস এবং বর্ষপূর্তির কেক সরবরাহ করছি ক্রেতাদের পছন্দমত ডিজাইনে।
অন্যদিকে সাহেবপাড়ার তাসমিম কলি মিম একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থী। বড় আপুর কাছ থেকে শেখা কেক বানানোর দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিন বছর ধরে হোমমেড কেক তৈরির কাজ করছেন তিনি। ‘মিমস প্রেটি বেকিং’ নামে ফেসবুকে গত এক বছর ধরে ব্যবসায়িকভাবে কেক বিক্রি শুরু করেন। প্রতিদিন গড়ে ৩-৪টি, কখনো ৫টিরও বেশি কেক তৈরি করেন।
মিম জানান, মাসে খরচ বাদ দিয়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হয়। ভ্যানিলা কেক ৪৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম কেক ৫৫০ টাকায় বিক্রি করেন। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজড কেক তৈরি করেন এবং হোম ডেলিভারির পাশাপাশি পিকআপ সুবিধাও দেন। তিনি আরও বলেন, শুধু সৈয়দপুর নয় আশপাশের শহর থেকেও অর্ডার আসছে আমাদের কাছে। নিজের পায়ে দাড়াতে পেরে খুব ভালো লাগচে বলে জানান তিনি।
সফল আরেক নারী উদ্যোক্তা টেক এন্ড টেস্ট এর নওশিন তারান্নুম জানান, বাজারের কেকের তুলনায় হোমমেড কেক অনেকবেশি স্বাস্থ্যসম্মত। আমরা যখন বাসায় কেক তৈরি করে তখন মানসম্মত উপাদান ব্যবহার সচেতন থাকি। আপনার পছন্দমত সাইজ এবং ডিজাইনের কেক বানিয়ে নিতে পারবেন আমাদের কাছ থেকে। একটি কেক শুধুমাত্র কেকই নয় এতে মিশে থাকে আমাদের আবেগ ও ভালোবাসা। সেসব ভালোবাসার কেক যত্ন নিয়ে গ্রাহকের কাছ পৌঁছে দিলেই তৃপ্তি পায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সৈয়দপুরের মত ছোট শহরে বর্তমানে অন্তত ২৫টিরও বেশি হোমমেড কেক পেজ সক্রিয় রয়েছে যারা হোমমেড কেক তৈরি করে ডিলেভরি দিচ্ছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য লুবনা কেক হ্যাভেন, মিমস প্রেটি বেকিং, টেক এন্ড টেস্ট, সুইট ক্রেভিং, ড্যাম ডিলিশাস, কুকিং স্পেশালিস্ট, প্রেটি ব্যাক, কেক জার্নি, মাহি কেক হাউজ, সামা বেক হাউস, দ্যা কেক হাব, কেক ক্রেভিং, কেক এন্ড ব্যাক, সৈয়দপুর কেক হাউজ, সুইট ট্রেটস সৈয়দপুর, ইউনিক কেক স্পেশালিস্ট, আলি কুকবুক, কেক স্টোরি, আনিকা বেকড, হোমমেড কেক সুইট, জাফিরা এন্ড জায়েম কেক কর্নার এবং পারফেক্ট কেক কর্ণার।
সৈয়দপুরের এসব হোমমেড নারীদের তৈরি কেকগুলোতে ফুটে ওঠে কারো ভালোবাসার মানুষের প্রতিচ্ছবি, খেলাপ্রিয় কারো পছন্দের খেলার চিত্র, পছন্দের কারো পেশার প্রতিচ্ছবিও উঠে আসে সেসব কেকের উপরে। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অর্ডার নিয়ে হোম ডেলিভারির মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন এসব উদ্যোক্তারা। অল্প পুঁজিতে শুরু করা এই উদ্যোগ এখন সৈয়দপুরে অনেক নারীর জন্য স্থায়ী আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









