পোষা বিড়াল থেকে কি মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে বার্ড ফ্লু? ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। H5N1(এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা) আক্রান্ত বিড়াল থেকে মানুষের সংক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে। তবে সাধারণ মানুষের ঝুঁকি এখনো কম। উদ্বেগের বিষয়, ভাইরাসটি পাখির গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীতেও ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
বার্ড ফ্লু বা হাইলি প্যাথোজেনিক এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা মূলত পাখির রোগ। তবে বর্তমানে এর প্রধান উদ্বেগের কারণ এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের বিস্তার। ২০২১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। পাখির পাশাপাশি বহু স্তন্যপায়ী প্রাণীতেও সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বার্ড ফ্লু নিয়ে উদ্বেগের প্রধান কারণ তিনটি। প্রথমত, পরিযায়ী পাখি হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ভাইরাসটি এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, মানুষের শরীরে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রমণ কখনো গুরুতর, এমনকি প্রাণঘাতীও হতে পারে। তৃতীয়ত, ভাইরাসটি এখন একাধিক স্তন্যপায়ী প্রাণীতে ছড়াচ্ছে।
বর্তমানে গরু, বিড়াল, কুকুর, শিয়াল, সিলসহ বিভিন্ন প্রাণীতে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্ত হয়েছে। প্রতিটি নতুন প্রাণীতে সংক্রমণ ভাইরাসটির অভিযোজন ও পরিবর্তনের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিড়াল কীভাবে আক্রান্ত হয়?

বিড়াল সাধারণত আক্রান্ত পাখির সংস্পর্শে এসে বা সেই পাখি খেয়ে বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হতে পারে। বাইরে ঘোরাফেরা করা বা শিকারি স্বভাবের বিড়ালের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এ ছাড়া আক্রান্ত প্রাণীর কাঁচা মাংস, কাঁচা পোষা প্রাণীর খাবার বা অপরিশোধিত দুধ থেকেও সংক্রমণ হতে পারে।
বিড়াল থেকে মানুষে সংক্রমণ কতটা সম্ভব?
আক্রান্ত বিড়াল থেকে মানুষের শরীরে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ছড়ানোর প্রমাণ রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পোষা বিড়ালের কাছাকাছি থাকলেই মানুষ বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হবে। ঝুঁকি মূলত তৈরি হয় যখন একটি বিড়াল নিজেই সংক্রমিত থাকে এবং মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসে। আক্রান্ত প্রাণীর লালা, শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণ বা অন্যান্য শরীরবৃত্তীয় তরলের সংস্পর্শে এলে সংক্রমণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
আক্রান্ত বিড়ালের লক্ষণ
বিড়ালের মধ্যে বার্ড ফ্লুর লক্ষণ হিসেবে জ্বর, দুর্বলতা, খাবারে অনীহা, চোখ ও নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া, শ্বাসকষ্ট এবং স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। ভারসাম্য হারানো, কাঁপুনি, খিঁচুনি, চলাফেরায় সমন্বয়হীনতা ও অন্ধত্বের মতো গুরুতর উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
কোনো বিড়ালের এমন উপসর্গ দেখা দিলে বিশেষ করে সে যদি বাইরে ঘোরাফেরা করে, পাখি শিকার করে বা কাঁচা প্রাণিজ খাবার খেয়ে থাকে, তাহলে দ্রুত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কাঁচা খাবার নিয়ে সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা পোষা প্রাণীকে কাঁচা মাংস বা কাঁচা প্রাণিজ খাবার না দেওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ এতে শুধু এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়, সালমোনেলা, ই-কোলাই ও লিস্টেরিয়ার মতো জীবাণুর ঝুঁকিও থাকে।
মানুষের ক্ষেত্রেও কাঁচা বা অপরিশোধিত দুধ এবং অপর্যাপ্ত রান্না করা মাংস এড়িয়ে চলা নিরাপদ। ডিম ও মাংস ভালোভাবে রান্না করে খাওয়া উচিত।
কুকুরও কি আক্রান্ত হতে পারে?
হ্যাঁ। কুকুরও এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জাতে আক্রান্ত হতে পারে। তাদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, দুর্বলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে কুকুর থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই।
মানুষের সংক্রমণের প্রধান উৎস কী?

মানুষের ক্ষেত্রে আক্রান্ত পাখি, গবাদিপশু বা অন্যান্য প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শই বড় ঝুঁকি। বিশেষ করে হাঁস-মুরগির খামার, দুগ্ধখামার, পশু চিকিৎসা বা আক্রান্ত প্রাণী পরিচর্যার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেশি।
বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের CDC-সমর্থিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের পোলট্রিতে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান এবং সংক্রমিত মুরগি জবাই ও পালক ছাড়ানোর সময় বাতাসে ভাইরাসযুক্ত কণা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বার্ড ফ্লু কি পরবর্তীতে মহামারি ঘটাবে?
এখনই এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ধারাবাহিকভাবে মানুষে-মানুষে সংক্রমণের প্রমাণ মেলেনি। তবে ভাইরাসটি বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীতে ছড়িয়ে পড়ায় সতর্ক রয়েছেন বিজ্ঞানীরা।।
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তন ও পুনর্বিন্যাসের ক্ষমতা রয়েছে। ভবিষ্যতে যদি এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা মানুষের মধ্যে সহজে ছড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করে, তখন বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞদের মূল পরামর্শ হলো—আতঙ্ক নয়, নজরদারি ও সতর্কতা বাড়ানো।
কীভাবে নিরাপদ থাকবেন?
পোষা বিড়ালকে সম্ভব হলে ঘরের ভেতরে রাখা, বন্য বা মৃত পাখির সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা এবং কাঁচা মাংস, কাঁচা দুধ বা কাঁচা প্রাণিজ খাবার না দেওয়া। অসুস্থ বা মৃত পাখি খালি হাতে ধরবেন না। আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে হাত ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন এবং প্রয়োজন হলে সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, বিড়ালকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই, বরং বিড়ালকে বার্ড ফ্লু থেকে সুরক্ষিত রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর কোনো পোষা প্রাণীর মধ্যে অস্বাভাবিক অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত, কিন্তু সতর্কতা ও সঠিক তথ্যই এই ঝুঁকি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সূত্র: ইউসি হেল্থ টুডে


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









