আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইউরোপের দুই দেশ ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল ক্রমেই ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে। স্পেনে রাজধানী মাদ্রিদের উপকণ্ঠে আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় সরকার জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে একাধিক বড় দাবানলের কারণে হাজারো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) উভয় দেশে অগ্নিনির্বাপণ বিমান ও হেলিকপ্টার পাঠিয়েছে।
দাবানল শুধু ফ্রান্স ও স্পেনেই সীমাবদ্ধ নেই। উত্তর ইউরোপের দেশ নরওয়েতেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে একাধিক দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দেশটির বিভিন্ন বনাঞ্চলে আগুন দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে দমকল বাহিনী ও জরুরি সেবাকর্মীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপজুড়ে চলমান তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দাবানলের ঝুঁকি উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতেও ক্রমশ বাড়ছে।
মাদ্রিদের কাছে ভয়াবহ পরিস্থিতি
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের কাছে জ্বলতে থাকা দুটি দাবানল শুক্রবার একীভূত হওয়ার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, এগুলো পাশের আভিলা প্রদেশের আরেকটি দাবানলের সঙ্গে মিলিত হয়ে আরও বড় অগ্নিকাণ্ডে পরিণত হতে পারে।
ইতোমধ্যে প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৬৮ লাখ মানুষের আবাসস্থল মাদ্রিদ মহানগর এলাকায় উদ্বেগ বাড়ছে। আঞ্চলিক জরুরি ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান জানিয়েছেন, দাবানল এখন এমন পর্যায়ে রয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে আনা দমকল বাহিনীর সক্ষমতার বাইরে।
শনিবার প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ মাদ্রিদের সেনিসিয়েন্তোস গ্রামের অগ্নিনির্বাপণ নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
এদিকে, দাবানল শুধু ফ্রান্স ও স্পেনেই সীমাবদ্ধ নেই। উত্তর ইউরোপের দেশ নরওয়েতেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে একাধিক দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দেশটির বিভিন্ন বনাঞ্চলে আগুন দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে দমকল বাহিনী ও জরুরি সেবাকর্মীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপজুড়ে চলমান তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দাবানলের ঝুঁকি উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতেও ক্রমশ বাড়ছে।
দাবানলের ঝুঁকি এখনও ‘চরম’
স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা এএমেট জানিয়েছে, দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দাবানলের ঝুঁকি এখনও ‘অত্যন্ত উচ্চ’ পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলে ঝুঁকি ‘চরম’ পর্যায়ে রয়েছে। তবে পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের অনেক এলাকায় আগের কয়েক দিনের তুলনায় ঝুঁকি কিছুটা কমেছে।
ফ্রান্সে ৯৮ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে ছাই
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গিরোন্দ অঞ্চলে লেজ-ক্যাপ-ফেরে ও ল্য পোর্জের মধ্যবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়া বিশাল দাবানলকে স্থানীয় প্রশাসন ‘এক্সএক্সএল’ অগ্নিকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেছে। পুরো ক্যাপ ফেরে উপদ্বীপ এবং বোর্দোর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে লঁদ অঞ্চলের বিসকারোস এলাকার কাছেও আরেকটি বড় দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে দেশটিতে প্রায় ৯৮ হাজার হেক্টর জমি আগুনে পুড়ে গেছে। এর মধ্যে গিরোন্দ অঞ্চলেই প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন
দাবানলের ধোঁয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে। বোর্দোর কাছাকাছি লা লঁদ-দ্য-ফ্রঁসাক এলাকায় অবস্থানরত এক পরিবার জানিয়েছে, ঘন ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে গেছে, বাতাসে পোড়া গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে এবং সেই ধোঁয়া ঘর ও কাপড়েও ঢুকে পড়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কায় তারা নির্ধারিত সময়ের আগেই ওয়েলসে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অন্যদিকে লেজ-ক্যাপ-ফেরে এলাকায় ছুটি কাটাতে যাওয়া জেসিকা রাউডেন জানান, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পরিবেশ, বন্ধ দোকানপাট এবং যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তাদের পরিবারকে একাধিকবার আশ্রয় পরিবর্তন করতে হয়েছে। পাঁচ বছরের ছেলে কাশিতে আক্রান্ত হওয়ায় তারা দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যান।
পর্যটকদের ভ্রমণ বাতিল না করার আহ্বান
ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ববিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এলেওনোর ক্যারোই বলেছেন, চলতি গ্রীষ্মে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়েছে, যা ২০২২ সালের ভয়াবহ দাবানলের চেয়েও গুরুতর। তবে তিনি পর্যটকদের ভ্রমণ বাতিল না করে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, প্যারিসসহ দেশের অনেক অঞ্চল এখনও দাবানলের প্রভাবমুক্ত রয়েছে।
ইইউর সহায়তা
ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লায়েন জানিয়েছেন, ইইউর আরই (এসসিইইউ) বহর থেকে ফ্রান্সে পাঁচটি অগ্নিনির্বাপণ বিমান ও দুটি হেলিকপ্টার এবং স্পেনে চারটি বিমান পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ক্রোয়েশিয়া, পর্তুগাল, চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়াও অতিরিক্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও বিমান সহায়তা দিয়েছে।
কেন বাড়ছে দাবানল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাই মাস ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে দাবানলের স্বাভাবিক মৌসুম হলেও এ বছরের অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপ্তি ও তীব্রতা অস্বাভাবিক। ইউরোপ বিশ্বের দ্রুততম উষ্ণায়নশীল মহাদেশ হওয়ায় তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা এবং শক্তিশালী বাতাস বনাঞ্চলকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এর সঙ্গে মানবসৃষ্ট আগুন, বজ্রপাত, জমে থাকা শুকনো উদ্ভিদ এবং দুর্বল বন ব্যবস্থাপনাও দাবানলের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপজুড়ে বনাঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং দক্ষিণ ইউরোপ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
এটি দৈনিক পত্রিকার আন্তর্জাতিক পাতার উপযোগী ইনভার্টেড পিরামিড কাঠামো অনুসরণ করে সাজানো হয়েছে, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শুরুতে এবং প্রেক্ষাপট শেষে রাখা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









