জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপে ৭.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কুমামোতো শহরের একটি বড় শপিং সেন্টারের অংশ ধসে পড়ে বহু মানুষ আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় দমকল বিভাগ। ভূমিকম্পের পর বিস্ফোরণ, ভবন ধস, সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং একাধিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। উদ্ধারকর্মীরা রাতভর ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষ শক্তিশালী আফটারশকের আশঙ্কায় বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে কিউশু দ্বীপের অভ্যন্তরে ১০ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। কম্পনের পর কুমামোতোর অ্যিয়ন মল-এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এবং ভবনের দ্বিতীয় তলা ধসে পড়ে। দমকল বিভাগ জানিয়েছে, ভবনের ভেতরে বহু মানুষ আটকা পড়েছেন। জাপানের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকের বরাতে জানা গেছে, মলের ২০ থেকে ৩০ জন কর্মচারীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে থাকতে পারেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভূমিকম্পের পর ধোঁয়া ও বিস্ফোরণ দেখা যায়। তবে মলের কর্মীরা দ্রুত ক্রেতাদের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, অ্যালার্ম বাজতে থাকলেও মানুষ তুলনামূলক শান্তভাবে ভবন থেকে বেরিয়ে আসছেন। একজনকে শিশুকে কোলে নিয়ে বের হতে এবং আরেকজনকে একটি শিশুকে জড়িয়ে ধরে নিরাপদ স্থানে যেতে দেখা যায়। ভবনের ভেতরে ঝুলে পড়া তাক, ভাঙা টাইলস এবং বিভিন্ন দোকানের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সামগ্রীও ভিডিওতে ধরা পড়েছে।
মলের দক্ষিণ পাশের গাড়ি পার্কের ভিডিওতে দেখা গেছে, ভবনের বাইরের দেয়ালের বড় অংশ ভেঙে গেছে, ছাউনি ছিটকে সড়কে পড়ে রয়েছে এবং চারদিকে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে। ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারকর্মীদের তৎপরতাও দেখা যায়।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানান, আহতের খবর পাওয়া গেছে এবং মানবজীবন রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ৩ হাজার ৬০০ সদস্যের আত্মরক্ষা বাহিনী (সেলফ-ডিফেন্স ফোর্স) মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং আটকে পড়াদের উদ্ধারে রাতভর অভিযান চলবে।
এদিকে কুমামোতো প্রিফেকচারের ইয়াতসুশিরো শহরের নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ কারখানায় একটি চিমনি ধসে কয়েকজন নিখোঁজ হওয়ার খবর দিয়েছে পুলিশ। ঘটনাস্থলে উদ্ধার ও তদন্ত কার্যক্রম চলছে।
ভূমিকম্পে ১৭শ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক কুমামোতো দুর্গের প্রাচীরের একটি অংশও ধসে পড়েছে। ২০১৬ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পেও দুর্গটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, মূল ভূমিকম্পের পর এখন পর্যন্ত ৬১টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে, যার তীব্রতা ছিল জাপানের ভূকম্পন মাত্রা অনুযায়ী ১ থেকে ৬-এর মধ্যে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, আগামী দিনগুলোতে আরও শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে ‘দ্বিতীয় দিনের বড় আফটারশক’-এর ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে নাগরিকদের রেডিও ও টেলিভিশনের নির্দেশনা অনুসরণ এবং প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর এক লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়। উপকূলে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। হাজারো বাড়িতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ভূমিকম্পে উপকেন্দ্র থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের সেন্দাই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো ক্ষতি বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যা দেখা যায়নি এবং কেন্দ্রটি স্বাভাবিকভাবে চালু রয়েছে।
এদিকে টোকিওর হানেদা বিমানবন্দরে ভূমিকম্পের প্রভাবে ৪০টির বেশি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বিলম্বিত বা বাতিল হয়েছে। যাত্রীদের ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের সঙ্গে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।



সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









