জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিউশু অঞ্চলে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩০ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নিহতদের মধ্যে দুর্যোগকবলিত হয়ে যারা মৃত্যু বরণ করেছে সেসব ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাপান আবহাওয়া সংস্থা (জেএমএ) এ দুর্যোগের নাম দিয়েছে ‘২০২৬ কুমামোতো ভূমিকম্প’।
কুমামোতো প্রিফেকচারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইয়াতসুশিরো শহরের নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজের একটি কারখানা ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে অন্তত আটজনের মৃত্যু হয়। ধ্বংসস্তূপ থেকে দুইজন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনো একজন নিখোঁজ রয়েছেন।
এ ছাড়া কাশিমা শহরের একটি শপিং সেন্টারে বিস্ফোরণের ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। সেখানে আরও একজনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
২৫৯টি আফটারশক
জাপান আবহাওয়া সংস্থা (জেএমএ) জানিয়েছে, মঙ্গলবারের ভূমিকম্পটি দেশটির ০ থেকে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প তীব্রতা স্কেলে সর্বোচ্চ ৭ মাত্রা রেকর্ড করেছে। সংস্থাটি এ দুর্যোগের নাম দিয়েছে ‘২০২৬ কুমামোতো ভূমিকম্প’।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত কুমামোতো ও আশপাশের এলাকায় মোট ২৫৯টি পরাঘাত (আফটারশক) রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটির তীব্রতা ছিল নিম্ন-৫ এবং ১৪টির তীব্রতা ছিল ৪।
জেএমএ সতর্ক করে বলেছে, আগামী কয়েক দিন এবং অন্তত এক সপ্তাহ পর্যন্ত আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। তাই বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পানি ও বিদ্যুৎ–সংকটে দুর্ভোগ
ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ইয়াতসুশিরো শহরে বিশুদ্ধ পানির জন্য সকাল থেকেই মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
সত্তরের কোঠায় এক নারী বলেন, মুখ ধোয়া বা গোসল করার মতো পানিও নেই। এতে দৈনন্দিন জীবন কঠিন হয়ে পড়েছে।
চল্লিশোর্ধ্ব এক বাসিন্দা বলেন, পানীয় জল, কাপড় ধোয়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহারের মতো পানির অভাব রয়েছে। পাশাপাশি খাদ্যসংকটও দেখা দিয়েছে।

বিদেশিদের জন্য বিশেষ সহায়তা
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশি নাগরিকদের জন্য ২৪ ঘণ্টার বহুভাষিক টেলিফোন অনুবাদসেবা চালু করেছে কুমামোতো প্রিফেকচার সরকার। চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সময় ভাষাগত সহায়তার জন্য এই সেবা ব্যবহার করা যাবে।
সেবাটি ২২টি ভাষায় পাওয়া যাবে। এটি বিনা মূল্যে ব্যবহার করা গেলেও আগে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনের পর ব্যবহারকারীদের একটি নির্দিষ্ট ফোন নম্বর দেওয়া হবে।
আশ্রয়কেন্দ্রের তথ্য অনলাইনে
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কুমামোতো ও নাগাসাকি প্রিফেকচারে একাধিক আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। দুটি প্রিফেকচারই নিজ নিজ দুর্যোগ–তথ্য পোর্টালে আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থান ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করেছে।
কুমামোতোর পোর্টালে ১১টি এবং নাগাসাকির পোর্টালে ১৪টি ভাষায় তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মানচিত্রে নির্দিষ্ট স্থানে ক্লিক করলে নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রের বিস্তারিত তথ্য দেখা যাবে।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত
ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে উদ্ধারকারী দল কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরাঘাতের ঝুঁকি এখনো কাটেনি। তাই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয় বাইরে চলাচল এড়িয়ে নিরাপদ স্থানে অবস্থান এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তীব্র তাপপ্রবাহ অব্যাহত: ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস
এদিকে জাপানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। দেশটির আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারও পূর্ব থেকে পশ্চিম জাপানের বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। কোথাও কোথাও সর্বোচ্চ ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে গেছে।
জাপান আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, একটি শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সক্রিয় থাকায় এই তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, কোফু ও ৎসুয়ামা শহরে সর্বোচ্চ ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কিয়োটো, হিরোশিমা, তাকামাতসু ও মিয়াজাকি শহরে ৩৮ ডিগ্রি এবং চিবা ও নাগোয়া শহরে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা উঠতে পারে। এছাড়া রাজধানী টোকিও ও ওসাকা শহরে তাপমাত্রা প্রায় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশটির ৪৭টি প্রিফেকচারের মধ্যে ৩১টিতে হিটস্ট্রোক সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পূর্বাঞ্চলের কান্টো অঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিমের ওকিনাওয়া পর্যন্ত এই সতর্কতা কার্যকর রয়েছে।
এদিকে, সম্প্রতি ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত কুমামোতো প্রিফেকচারেও তীব্র গরম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কুমামোতো ও হিতোয়োশি শহরে প্রায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ভূমিকম্পের কারণে অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি, ফলে বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং উদ্ধার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তাই এসব ব্যক্তির প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া এবং নিয়মিত বিরতি দিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভূমিকম্প-পরবর্তী সংকট একসঙ্গে মোকাবিলা করতে গিয়ে জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









