আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করেছে, গাজা যুদ্ধ চলার সময়ও ভারত ইসরাইলে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জামের অংশ রপ্তানি করে চলেছে। সংস্থাটির দাবি, এই রপ্তানির মাধ্যমে ভারত ইসরাইলের সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে ভারত সরকার এখনো এই অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি। প্রতিবেদনে সরকারি ও বেসরকারি কয়েকটি ভারতীয় প্রতিরক্ষা সংস্থার নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টির প্রতিবেদন কী বলছে
‘মেড ইন ইন্ডিয়া: দ্য সাপ্লাই অব ওয়েপন্স অ্যান্ড অ্যামুনিশন টু ইসরাইলে’ শিরোনামে প্রকাশিত ৪২ পাতার প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ভারত থেকে ইসরায়েলে ২,৫৯৬টি অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর তথ্য তারা পেয়েছে।
সংস্থাটির দাবি, এসব চালানের মধ্যে ছিল সামরিক অস্ত্রের ছোট অংশ, গোলাবারুদের উপাদান, ড্রোনের অংশ এবং সামরিক যানবাহনের যন্ত্রাংশ। অ্যামনেস্টির হিসাব অনুযায়ী, ভারত থেকে কমপক্ষে ৩ লাখ ৯০ হাজারের বেশি ছোট অস্ত্রের অংশ, প্রায় ৫ লাখ ৬৫ হাজার বিস্ফোরক অস্ত্রের উপাদান এবং প্রায় ৩০০টি সামরিক যানবাহনের অংশ ইসরায়েলে পাঠানো হয়েছে।
অ্যামনেস্টির অভিযোগ, আন্তর্জাতিক মহলে যখন ইসরাইলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা চলছিল, তখনও এই অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত ছিল।
নয়টি ভারতীয় সংস্থার নাম উল্লেখ
প্রতিবেদনে নয়টি ভারতীয় সংস্থার কথা বলা হয়েছে, যারা ইসরাইলে অস্ত্র, গোলাবারুদ বা সামরিক প্রযুক্তির উপাদান সরবরাহ করেছে বলে অ্যামনেস্টি দাবি করেছে।
এর মধ্যে তিনটি সংস্থা ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো—
মিউনিশনস ইন্ডিয়া লিমিটেড (MIL)
অ্যাডভান্সড উইপনস অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট ইন্ডিয়া লিমিটেড (AWEIL)
ইন্ডিয়া অপটেল লিমিটেড (IOL)
অ্যামনেস্টির দাবি, মিউনিশনস ইন্ডিয়া লিমিটেড ইসরাইলের এলবিট সিস্টেমসকে ১৫৫ মিমি কামানের গোলা সরবরাহ করেছে। অন্যদিকে অ্যাডভান্সড উইপনস অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট ইন্ডিয়া লিমিটেড ৮১ মিমি মর্টার লঞ্চার পাঠিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইন্ডিয়া অপটেল লিমিটেড ইসরাইলের একটি প্রতিরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানে সেন্সরসহ কিছু প্রযুক্তিগত উপাদান সরবরাহ করেছে বলেও দাবি করেছে অ্যামনেস্টি। সংস্থাটির মতে, এই তিনটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ায় তাদের কার্যক্রমের দায় ভারতের ওপরও বর্তায়।
বেসরকারি সংস্থার রপ্তানির কথাও উল্লেখ
অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, শুধু সরকারি সংস্থাই নয়, কয়েকটি বেসরকারি ভারতীয় কোম্পানিও ইসরাইলের প্রতিরক্ষা শিল্পে পণ্য সরবরাহ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিএলআর সিস্টেমস প্রাইভেট লিমিটেড ইসরাইলি অস্ত্র নির্মাতা সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে এবং মেশিনগানের বিভিন্ন অংশ সরবরাহ করেছে।
ইন্দো-এমআইএম প্রাইভেট লিমিটেড স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পাঠিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া কল্যাণী স্ট্র্যাটেজিক সিস্টেমস লিমিটেড কামানের গোলার অংশ সরবরাহ করেছে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
অ্যামনেস্টি আরো বলেছে, কিছু ভারতীয় সংস্থা ইসরাইলের এলবিট সিস্টেমস ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রসঙ্গ
অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো—অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা।
সংস্থাটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আদালত (আইসিজে) আগেই সতর্ক করেছে যে কোনো দেশকে এমন অস্ত্র সরবরাহ করা উচিত নয়, যা যুদ্ধাপরাধ বা মানবাধিকার লঙ্ঘনে ব্যবহৃত হতে পারে।
প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের (আইসিজে)-এর বিভিন্ন নির্দেশের উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যামনেস্টির মতে, গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের পরও ভারতকে অস্ত্র রপ্তানির ঝুঁকি সম্পর্কে জানা উচিত ছিল।
সংস্থাটি আরো , কয়েকটি দেশ ইসরাইয়েলে অস্ত্র রপ্তানি সীমিত বা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাপান, জার্মানি, কানাডা, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোর পদক্ষেপের উদাহরণও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

ভারতের অস্ত্র রপ্তানি নীতি
ভারতে প্রতিরক্ষা পণ্য রপ্তানি কঠোর সরকারি অনুমোদনের মাধ্যমে হয়। অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি রপ্তানির আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করে।
অ্যামনেস্টির দাবি, এই প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক আইন বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
তবে ভারত সরকার এখনো অ্যামনেস্টির অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিস্তারিত জবাব দেয়নি।
ভারত-ইসরাইল প্রতিরক্ষা সম্পর্ক
ভারত ও ইসরাইলের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গত কয়েক দশকে অনেক বেড়েছে। ১৯৯২ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে সামরিক প্রযুক্তি ও অস্ত্র কেনাবেচা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে ইসরাইল ভারতের অন্যতম বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। রাশিয়া ও ফ্রান্সের পর ইসরাইয়েল ভারতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদার।
২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঐতিহাসিক ইসরায়েল সফরের পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ভারত প্রথম দিকে ইসরাইলের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছিল। তবে পরে ভারত গাজায় সাধারণ মানুষের সুরক্ষা এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।
গাজা সংকটে ভারতের অবস্থান
ভারত একদিকে ইসরাইলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের মানবিক সহায়তার কথাও বলে আসছে।
জাতিসংঘে ভারত কয়েকটি প্রস্তাবে ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তা ও শান্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ভারত জানিয়েছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এবং ইসরাইয়েলের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সমর্থক।
অন্যদিকে, অ্যামনেস্টির মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করছে, অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি ভারতের আন্তর্জাতিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত।
বিতর্ক বাড়ছে
অ্যামনেস্টির এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ভারতের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনটি ভারতকে ইসরাইলে সব ধরনের অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
তবে ভারত-ইসরাইল প্রতিরক্ষা সম্পর্কের গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় রয়েছে।
গাজা যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অস্ত্র সরবরাহ, কূটনৈতিক অবস্থান এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। ভারতের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা ও বিবিসি


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









