মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর জায়গায় নতুন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’ পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে লিংকনে থাকা নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি এবং জাহাজের জীবনযাত্রার পরিবেশ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ‘জর্জ ওয়াশিংট’-এর মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রা মূলত আগে থেকেই নির্ধারিত ক্যারিয়ার রোটেশনের অংশ। ফলে লিংকনে তৈরি হওয়া সমস্যার কারণেই জরুরি ভিত্তিতে নতুন জাহাজ পাঠানো হচ্ছে—এমনটা মার্কিন প্রশাসন বলছে না। তবে রোটেশনের সময়টি এমন এক পর্যায়ে এসেছে, যখন লিংকনের দীর্ঘ মিশন ও নাবিকদের পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২৫০ দিনেরও বেশি সমুদ্রে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন
‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ২০২৫ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে। পরে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। ইরান যুদ্ধকে ঘিরে মার্কিন সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত হওয়ায় জাহাজটির মোতায়েনের মেয়াদও বাড়তে থাকে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, লিংকন ‘২৫০ দিনেরও বেশি সময় মোতায়েন রয়েছে এবং ২০০ দিনের বেশি সময় কোনো বন্দর সফর করেনি’।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার পর জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, সরবরাহ পুনরায় পূরণ এবং নাবিকদের বিশ্রামের জন্য নিয়মিত বন্দর সফরের প্রয়োজন হয়। কিন্তু লিংকনের দীর্ঘ টানা মোতায়েন সেই সুযোগকে অত্যন্ত সীমিত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ এসেছে নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে। মার্কিন সামরিক সংবাদমাধ্যম ও পরিবারের সদস্যদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিংকনে কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অন্তত একটি ঘটনায় একজন নাবিক পানিতে পড়ে যাওয়ার পর তাকে উদ্ধার করা হয়।
নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিশ্চিতভাবে বাড়ি ফেরার সময়সূচি এবং দীর্ঘদিন বন্দরে না যাওয়ার কারণে ক্রুদের মধ্যে ক্লান্তি ও মানসিক চাপ বেড়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। মার্কিন নৌবাহিনীও বলেছে, নাবিকদের মানসিক সুস্থতা পর্যবেক্ষণে নেতৃত্ব নিয়মিত মূল্যায়ন করছে।
খাবার, পানি ও স্যানিটেশন নিয়েও অভিযোগ
মানসিক চাপের পাশাপাশি লিংকনে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পরিস্থিতি নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে খাবার, সাবান ও টুথপেস্টের মতো মৌলিক সামগ্রীর ঘাটতি, পানির সমস্যা এবং প্লাম্বিং ব্যবস্থায় ত্রুটির কথা বলা হয়েছে।
মার্কিন সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে পাঠানো চিঠিতে পানি দূষণ, সরবরাহ ঘাটতি, প্লাম্বিং সমস্যা, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি এবং ডাকব্যবস্থায় বিঘ্নের মতো বিষয় উল্লেখ করে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছেন।
হেগসেথের দাবি, পরিস্থিতি ‘বিকৃতভাবে’ উপস্থাপন করা হচ্ছে
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোকে বাস্তবতার তুলনায় বিকৃতভাবে উপস্থাপিত বলে দাবি করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জাহাজের নাবিকদের প্রতি প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।
অর্থাৎ একদিকে নাবিকদের পরিবার ও আইনপ্রণেতারা গুরুতর সমস্যার কথা বলছেন, অন্যদিকে পেন্টাগন পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিত হিসেবে দেখছে। এই দুই ধরনের বক্তব্যের মধ্যেই এখন লিংকনের মিশন শেষ করে ক্রুদের ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি চলছে।
এগিয়ে আসছে ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’
এই পরিস্থিতিতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন থাকা ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন ক্যারিয়ার স্টাইক গ্রুপ’
মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি ভিয়েতনামের দা নাং থেকে রওনা হয়ে ‘মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করছে’ এবং ভারত মহাসাগরের দিকে এগোচ্ছে।
জর্জ ওয়াশিংটন-এর আগমন হলে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর দীর্ঘ মিশনের অবসান ঘটবে এবং লিংকনের নাবিকদের দেশে ফেরানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে নতুন রোটেশনের ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীর উপস্থিতিতে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে সামরিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
শুধু একটি জাহাজের সমস্যা নয়, বড় প্রশ্ন মার্কিন নৌবাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে
ইউএসএস লিংকন-এর ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—‘দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও একের পর এক উচ্চমাত্রার মোতায়েন কতটা টেকসই?’
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পাশাপাশি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের মোকাবিলায় মার্কিন নৌবাহিনীকে শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রাখতে হচ্ছে। কিন্তু সক্রিয় বিমানবাহী রণতরীর সংখ্যা সীমিত এবং প্রতিটি জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্রুদের বিশ্রামের জন্য সময় প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ সেই ভারসাম্যের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
জর্জ ওয়াশিংটন-এর মধ্যপ্রাচ্যমুখী যাত্রা তাই শুধু একটি বিমানবাহী রণতরীর বদলি নয়। এটি একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ-সক্ষমতা, সরবরাহব্যবস্থা এবং হাজারো নাবিকের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা কতটা চাপের মধ্যে রয়েছে—সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। ‘আর ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর ক্রুরা দেশে ফেরার পর তাদের দীর্ঘ মিশনের প্রকৃত অভিজ্ঞতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









