জৈবিক অস্ত্রের বিপদ এতদিন আমরা কল্পনা করেছি এমন কিছু হিসেবে, যা শরীরে ঢুকে রোগ সৃষ্টি করে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিন সম্পাদন ও সিনথেটিক বায়োলজির দ্রুত অগ্রগতি আশঙ্কার একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। ভবিষ্যতের কোনো জৈবিক হামলা হয়তো তাৎক্ষণিক সংক্রমণের বদলে মানুষের জিনে পরিবর্তন ঘটাবে, যার ক্ষতি প্রকাশ পেতে পারে বহু বছর পর।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে সম্ভাব্য মিউটাজেনিক ও টেরাটোজেনিক এজেন্ট—যেগুলো জিনগত পরিবর্তন, ক্যানসার, প্রজননগত সমস্যা বা ভ্রূণের বিকাশে অস্বাভাবিকতা ঘটাতে পারে। এমন বিপদের নজির পুরোপুরি নতুন নয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যবহৃত এজেন্ট অরেঞ্জে থাকা টিসিডিডি নামের ডাইঅক্সিন ক্যানসার ও জন্মগত ত্রুটির সঙ্গে যুক্ত। আবার সাদ্দাম হোসেনের সরকার জাতিসংঘের কাছে স্বীকার করেছিল যে ইরাক অ্যাফ্লাটক্সিন তৈরি করেছিল, যা বিমানবাহী বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেডে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল।
এখন উদ্বেগ বাড়ছে কারণ জিন সম্পাদনের প্রযুক্তি আগের চেয়ে সহজলভ্য এবং এআই বিপুল পরিমাণ জৈবিক তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স জেমস ক্ল্যাপার জিন সম্পাদনকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র ও বিস্তারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। ২০১৭ সালে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির একটি ম্যানুয়ালেও নির্দিষ্ট জিনগত বৈশিষ্ট্যকে লক্ষ্য করে ভবিষ্যৎ হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
তবে কোনো বিপজ্জনক জৈবিক ধারণা তৈরি করা আর সেটিকে কার্যকর অস্ত্রে পরিণত করা এক বিষয় নয়।
সবচেয়ে বড় বাধা—ছড়িয়ে দেওয়া
২০১৮ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী ও সিনথেটিক বায়োলজির ঝুঁকি-বিশেষজ্ঞদের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, এমন এজেন্ট তৈরি করাই প্রধান সমস্যা নয়; বরং বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেটিকে বিপুল মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া। জিনের মাধ্যমে রোগ সৃষ্টি করা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও, তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিচিত পদ্ধতিগুলোর কার্যকারিতা সীমিত। ফলে ল্যাবরেটরির একটি বিপজ্জনক ধারণা বাস্তবে কার্যকর অস্ত্রে পরিণত করা এখনও অত্যন্ত কঠিন।
হামলা ঘটলেও আরেকটি বড় সমস্যা হবে তাৎক্ষণিক শনাক্তকরণ। বিজ্ঞানীদের জানতে হবে কোন এজেন্ট ব্যবহৃত হয়েছে, তার প্রভাব কী এবং কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর ক্ষতির লক্ষণ যদি বহু বছর পরে প্রকাশ পায়, তাহলে আক্রান্তদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণও প্রয়োজন হতে পারে।

এআই কি সেই বাধা কমিয়ে দেবে?
এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। এআই নিজে কোনো জৈবিক অস্ত্র নয়, কিন্তু বিপুল বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা জীববিজ্ঞানের জটিল সমস্যা সমাধানের কিছু বাধা কমিয়ে দিতে পারে।
২০২৫ সালের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, বায়োটেররিজম-সম্পর্কিত সক্ষমতা অর্জনের বাধা ভবিষ্যতে কমতে পারে এবং এআই-সহায়তায় জৈবিক হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। তবে প্রযুক্তি এখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে এসব ভয়াবহ পরিস্থিতি সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। জীবন্ত ব্যবস্থাকে নির্ভরযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং কোনো এজেন্টকে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেওয়া এখনও অত্যন্ত জটিল। তবু সতর্ক হওয়ার কারণ এখানেই। প্রযুক্তির অগ্রগতি যদি ঝুঁকির বাধা কমিয়ে দেয়, তবে প্রস্তুতির কাজটি ঝুঁকি বাস্তবে পরিণত হওয়ার আগেই শেষ করতে হবে।
জেনেটিক অস্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট অস্ত্র ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জীবপ্রযুক্তি যে দ্রুত এগোচ্ছে, আমাদের নজরদারি, জনস্বাস্থ্য ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









