জেলবন্দি দলীয় প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে রবিবার ইসলামাবাদ অভিমুখে লং মার্চ শুরু করেছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)।
খাইবার পাখতুনখাওয়া (কেপি) প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদি লাকি মারওয়াতের গান্ডি চকে এই মার্চের উদ্বোধন করেন। তিনি বলেন, কেপি’র মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো নীতি দল মেনে নেবে না।
অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রীর হেলিকপ্টার ব্যবহার নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রদেশের রাজ্যপাল তীব্র আপত্তি তুলেছেন।
‘কেপি’তে শুধু ইমরান খানের নীতি চলবে’
পেশোয়ার-করাচি ইন্ডাস হাইওয়ের গান্ডি চক থেকে মার্চ শুরু হয়। আফ্রিদি হেলিকপ্টারে লাকি মারওয়াতে পৌঁছান। হাজার হাজার মানুষের সামনে তিনি সবাইকে পাকিস্তানের জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে আসার ডাক দেন।
তার কথায়, ইমরান খান, তার স্ত্রী ও বোনেরা জেলে আছেন, আর জনগণকে বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে হবে যে তারাই দেশের প্রকৃত মালিক।
আফ্রিদি অভিযোগ করেন, পিটিআইয়ের আলোচনাকারী দল রাজনৈতিক উত্তাপ কমাতে ইসলামাবাদে গিয়েছিল, কিন্তু আড়ালে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া মহল সেই আলোচনা ভেস্তে দিয়েছে।
তিনি বলেন, তারা কেপিতে নিজেদের ইচ্ছা চাপাতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে এখানে শুধু ইমরান খানের দর্শন ও নীতিই চলবে।
তার ঘোষণা, ‘‘আমরা হাঁ-জি বলা লোক নই, আমরা ইমরান খানের সৈনিক।’’
সামরিক অভিযান নিয়ে তিনি বারবার জনতার কাছে জানতে চান, কারা এর পক্ষে। যারা বিপক্ষে, তাদের হাত তুলতে বলেন। সন্ত্রাস দমনের বর্তমান নীতি নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তার প্রশ্ন, ‘‘২২ বছর ধরে সন্ত্রাস চলছে, এ কেমন নীতি?’’
আফ্রিদির দাবি, ইমরান খানের সরকারের সময় শান্তি ছিল, কারণ তার নীতি ঠিক ছিল। কিন্তু ক্ষমতা পরিবর্তনের অভিযানের পর সন্ত্রাসীদের আবার বসতি গড়তে দেওয়া হয়েছে, আর তাতেই অন্তহীন সন্ত্রাস শুরু হয়েছে। ২০২৩ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইমরান খান তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের সদস্যদের পুনর্বাসনের সরকারি পরিকল্পনার পক্ষে সাফাই দিয়েছিলেন।
আফ্রিদি বলেন, ‘‘তাদের নীতি চালু হলে ১০০ দিনের মধ্যে শান্তি ফিরবে।’’
তিনি জানান, মার্চ গান্ডি চক থেকে শুরু হয়ে অন্য একটি চকে শেষ হবে। তখন জনতা চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘ডি-চক’।
আফ্রিদি আরও বলেন, পিটিআই একটি রাজনৈতিক শক্তি, যারা দলের পতনের স্বপ্ন দেখেন, তারা কখনো সফল হবেন না। মার্চের পরবর্তী বিরতি হবে কারাকে।
রবিবার দুপুর থেকেই গান্ডি চকে পিটিআই কর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। সেখানে কড়া নিরাপত্তা ছিল। বিশাল পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে ছিল সাঁজোয়া যান ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল।

সরকারি হেলিকপ্টার ব্যবহারে সমালোচনা
রাজনৈতিক কর্মসূচিতে প্রাদেশিক সরকারের হেলিকপ্টার ব্যবহারের সমালোচনা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক লং মার্চে ‘সরকারি হেলিকপ্টার’ ব্যবহার করা হয়েছে।
তার দাবি, এটি ইসলামাবাদ হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশের লঙ্ঘন। ওই নির্দেশে কোনো রাজনৈতিক মিছিল বা সমাবেশে সরকারি সম্পদ বা যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করার জন্য প্রাদেশিক সরকারগুলোকে বলা হয়েছিল।
তারার কটাক্ষ করে বলেন, প্রদেশে সন্ত্রাসবাদ বাড়ছে, আর মুখ্যমন্ত্রী যেন ‘নিরো সম্রাটের মতো বাঁশি বাজাচ্ছেন’।
কেপির গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দিও হেলিকপ্টার ব্যবহারের সমালোচনা করে এটিকে আদালত অবমাননার শামিল বলে মন্তব্য করেন।
তার প্রশ্ন, মুখ্যমন্ত্রী নিজেই আদালতের নির্দেশ না মানলে তার দলের কর্মীরা কীভাবে আইন মেনে চলবেন?
ডেরা ইসমাইল খান থেকে কাফেলা
এর আগে সাবেক কেপি মুখ্যমন্ত্রী আলী আমিন গান্ডাপুরের নেতৃত্বে ডেরা ইসমাইল খান থেকে পিটিআই কর্মী ও সমর্থকরা লাকি মারওয়াতের উদ্দেশে রওনা হন।
গান্ডাপুর জানান, কাফেলা ইয়ারিক ও পেজু হয়ে গান্ডি চকে পৌঁছাবে।
রওনা হওয়ার আগে তিনি কর্মীদের শান্ত থাকতে, শৃঙ্খলা মানতে এবং সহিংসতা, ভাঙচুর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলতে বলেন।
তার কথায়, ‘‘যারা রাস্তা অবরোধ করেন বা সংঘর্ষে জড়ান, তারা আমাদের কর্মী নন।’’ তিনি এই মার্চকে দলের রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং ইমরান খানের প্রতি আনুগত্যের নতুন প্রতিজ্ঞা বলে বর্ণনা করেন।
তিনি আরও বলেন, আগেও ইমরান খানের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা হয়েছে, দরকার হলে আবারও করা হবে।
প্রদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র ও উপজাতি বিষয়ক বিশেষ সহকারী তারিক সাদ সাংবাদিকদের জানান, বান্নু, ডেরা ইসমাইল খান, টাঙ্ক, উত্তর ওয়াজিরিস্তান ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান থেকে কর্মীরা গান্ডি চকে জড়ো হবেন। কারফিউসহ নানা বিধিনিষেধের কারণে টাঙ্ক ও ওয়াজিরিস্তানের কিছু কর্মী আজ যোগ দিতে না পারলে তারা পরদিন পেশোয়ারের পথে মার্চে যুক্ত হবেন।
কেন্দ্রের হুঁশিয়ারি
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে এই মার্চ দুই পক্ষের মধ্যে সর্বশেষ বিরোধের কারণ। আগস্টে পিটিআই ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদ অভিমুখে লং মার্চের ঘোষণা দেয়। দলটি ইমরানের কারাবাসকে ‘বেআইনি’ বলছে।
নির্ধারিত দিনের কয়েকদিন আগে মার্চ পিছিয়ে ৪ অক্টোবর করা হয়।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বিক্ষোভের ডাকের কারণে কেপি’তে গভর্নর শাসন বা জরুরি অবস্থা জারি করা ছাড়া কেন্দ্রের উপায় থাকবে না।
পিটিআইয়ের পাল্টা সতর্কবার্তা, এমন পদক্ষেপ নিলে ভয়াবহ পরিণতি হবে।
সপ্তাহান্তের আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের ইসলামাবাদে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

মার্চের পরিকল্পনা
এক্স-এ মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী মার্চের সূচি এ রকম:
- ৪ অক্টোবর: টাঙ্ক, ডেরা ইসমাইল খান, দক্ষিণ ও উত্তর ওয়াজিরিস্তান এবং বান্নুর সমর্থকরা লাকি মারওয়াতের গান্ডি চক থেকে যোগ দেবেন। রাতে কাফেলা কারাক্রের কাছে থামবে।
- ৫ অক্টোবর: দুপুর সাড়ে ১২টায় রওনা দিয়ে রাতে কোহাটের কাছে বিশ্রাম।
- ৬ অক্টোবর: দুপুর ১২টায় কোহাট, হাঙ্গু, কুররাম ও ওরাকজাইয়ের মানুষ যোগ দেবেন। কাফেলা পেশোয়ারের দিকে এগিয়ে মাত্তানির কাছে রাত কাটাবে।
- ৭ অক্টোবর: বিকেলে পেশোয়ারের বুধ বেয়ার থেকে রওনা। পেশোয়ারের বাকি এলাকার মানুষ কোহাট রোড ব্রিজ ও মোটরওয়ে টোল প্লাজায় যোগ দেবেন। রাত কাটবে চারসাদ্দা ইন্টারচেঞ্জের কাছে।
- ৮ অক্টোবর: চারসাদ্দা ও মোহমন্দের মানুষ যোগ দেওয়ার পর দুপুর সাড়ে ১২টায় রওনা। পুরো কেপি’র মানুষ খাইবারাবাদে জড়ো হবে এবং রাত সেখানেই কাটবে।
ইসলামাবাদ পর্যন্ত শেষ ধাপের বিস্তারিত আফ্রিদি জানাননি। তিনি বলেন, খাইবারাবাদে পরবর্তী পর্যায়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে।
কেপি’র একাধিক জেলায় ১৪৪ ধারা
মার্চের আগে কেপি’র বিভিন্ন জেলায় সংশ্লিষ্ট ডেপুটি কমিশনারদের বিজ্ঞপ্তিতে ১৪৪ ধারা জারি হয়েছে। নিরাপত্তা ও জনসুরক্ষার কারণ দেখিয়ে নির্দিষ্ট পথে মানুষ ও যানবাহনের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
- ডেরা ইসমাইল খান: ৪ থেকে ৬ অক্টোবর, প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট সড়কে সব ধরনের চলাচল নিষিদ্ধ।
- উচ্চ দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান: ৩ থেকে ৫ অক্টোবর মালবাহী যান, রিকশা ও ডাম্পারের চলাচল নিষিদ্ধ। পাশের এলাকায় গাড়িবোমা বা বিস্ফোরক-ভরা যানের হামলার আশঙ্কাই এর কারণ।
- নিম্ন দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান: ১ থেকে ১০ অক্টোবর ওয়ানা ও আজম ওয়ার্সাকে লোডার রিকশা, সিঙ্গেল ও ডাবল ক্যাবিন মালবাহী গাড়ি, মাজদা, সুজুকি লোডার ও ডাম্পার চলতে পারবে না।
- টাঙ্ক: ৩ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ৫ অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত নির্দিষ্ট পথে সব ধরনের চলাচল বন্ধ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জনসুরক্ষা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার কথা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
- হাঙ্গু: ৩ থেকে ৬ অক্টোবর হাঙ্গু-কোহাট, হাঙ্গু-থাল, হাঙ্গু বাইপাস ও হাঙ্গু-সুমারিসহ ছয়টি পথে মানুষ ও সব ধরনের যানবাহনের চলাচল নিষিদ্ধ।
এই নিষেধাজ্ঞা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও জরুরি সেবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। জেলা পুলিশ কর্মকর্তা বা নিরাপত্তা বাহিনী অন্যদেরও ছাড় দিতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









