সোমবার রাতের সেই ঘোষণাটি যখন এল, তখন হয়তো পৃথিবীর কোথাও কোনো ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কেউ একজন নীরবে তাকিয়ে ছিলেন, কোনো পুরোনো দেয়ালে রোদ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল, কোনো মানুষ তার জন্মভূমির কথা মনে করছিলেন—আর ঠিক সেই সময় ফিলিস্তিনের শিল্পজগতের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একজন, চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, লেখক ও কার্টুনিস্ট সুলাইমান মানসুরের জীবনের শেষ অধ্যায়টি লেখা হয়ে গেল।

তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “শেষ অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে।” কয়েকটি শব্দ, অথচ সেই শব্দের ভেতর যেন একটি দীর্ঘ জীবনের সমস্ত রং, ধুলো, অপেক্ষা, হারিয়ে যাওয়া ঘর, দূরের শহর, মাটির গন্ধ এবং ফিরে আসতে না পারা মানুষের স্মৃতি একসঙ্গে জমে আছে। পরিবার জানিয়েছে, তিনি সৌন্দর্য, স্মৃতি ও সৃষ্টিশীলতার এমন এক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যা তাকে ছুঁয়ে যাওয়া মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকবে। তার জানাজা ও স্মরণসভা সম্পর্কে পরে জানানো হবে।
১৯৪৭ সালে রামাল্লার কাছে বিরজেইত শহরে জন্মেছিলেন মানসুর। তারপর কেটে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। পৃথিবী বদলেছে, মানুষ বদলেছে, শহরের চেহারা বদলেছে, কিন্তু তার ছবির ভেতর যে মাটি ছিল, যে মাটির দিকে মানুষ ফিরে তাকায় যখন তার কাছে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, সেই মাটি তাঁর শিল্পে ক্রমে আরও গভীর হয়ে উঠেছে।

তিনি শুধু ছবি আঁকেননি। তিনি এঁকেছেন স্মৃতি।
এঁকেছেন বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘ ছায়া, নিজের ভূমির সঙ্গে মানুষের অদৃশ্য বন্ধন, ইতিহাসের ক্ষত, গ্রামের পথ, পুরোনো বাড়ি, মানুষের মুখ এবং এমন এক ফিলিস্তিন, যা কেবল মানচিত্রের একটি ভূখণ্ড নয়—বরং যার ভেতরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমে আছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
ফিলিস্তিনের ইতিহাস, লোকজ ঐতিহ্য ও দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রতীক নিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজস্ব এক শিল্পভাষা। তার ছবির মানুষগুলো যেন কেবল ছবির মানুষ নয়; তারা এমন সব মানুষের প্রতিনিধি, যারা কোনো এক সকালে দেখেছে তাদের ঘর আর তাদের নেই, কোনো এক সন্ধ্যায় দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বুঝেছে, সেই পাহাড়টি এখনও আছে, কিন্তু তার কাছে পৌঁছানোর পথটি আর আগের মতো নেই।

২০২৪ সালে আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মানসুর বলেছিলেন, ফিলিস্তিনের মানুষকে অমানবিক করে দেখানোর প্রচেষ্টার বিপরীতে শিল্পের কাজ হলো তাদের আবার মানবিক করে তোলা। শিল্পী ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের দায়িত্ব, তার মতে, ফিলিস্তিনের মানুষকে তাদের মানবিক মর্যাদায় তুলে ধরা।
এই কথাটির ভেতরেই হয়তো তার শিল্পের সবচেয়ে গভীর অর্থটি লুকিয়ে আছে।
কারণ তাঁর ক্যানভাসে যুদ্ধের চিৎকারের চেয়ে অনেক সময় বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একজন মানুষের মুখ, একটি গাছ, একটি ঘর, একটি পথ কিংবা মুঠোভর্তি মাটি। তিনি জানতেন, হারিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে সবসময় অস্ত্র প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো একটি ছবি, একটি স্মৃতি, একটি নামও যথেষ্ট।
মাটি ছিল তার শিল্পের কেন্দ্র।
“সবাই মাটি নিয়ে লড়াই করছে, আর মাটিই আমার প্রধান অনুপ্রেরণা”—বলেছিলেন তিনি।
এই মাটিই তার ছবিতে কখনো শস্যক্ষেত, কখনো পাহাড়, কখনো মানুষের শরীরের ভার, কখনো আবার এমন এক স্মৃতি হয়ে এসেছে, যাকে মানুষ যত দূরেই যাক, নিজের ভেতর থেকে মুছে ফেলতে পারে না।
তার সবচেয়ে পরিচিত কাজগুলোর একটি ‘দ্য ক্যামেল অব হার্ডশিপস’। ছবিতে দেখা যায়, এক বৃদ্ধ প্যালেস্টাইনি তার পিঠে জেরুজালেম বহন করছেন। দৃশ্যটি সহজ, কিন্তু সেই সরলতার ভেতরেই যেন বহু বছরের ইতিহাসের ভার। একজন মানুষ তাঁর পিঠে একটি শহর বহন করছেন—শুধু একটি শহর নয়, একটি স্বপ্ন, একটি স্মৃতি, একটি হারানো ঘর, একটি জাতির দীর্ঘ অপেক্ষা।
সময়ের সঙ্গে ছবিটি প্যালেস্টাইনি মানুষের ধৈর্য, বেদনা ও টিকে থাকার এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
দেশের বাইরে ছড়িয়ে থাকা ফিলিস্তিনিদের প্রতিও তার আহ্বান ছিল খুব সরল—ফিলিস্তিনিকে ভুলে যেয়ো না। কারণ তার কাছে ফিলিস্তিন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন ছিল না; সেটি ছিল সৌন্দর্যেরও নাম।

“ফিলিস্তিনিকে ভুলে যেয়ো না। ফিলিস্তিন সুন্দর।”
এই বাক্যটি তার শিল্পকে বোঝার জন্য হয়তো যথেষ্ট। আর সে কারণেই তার শিল্পকে শুধু প্রতিবাদের শিল্প বলে দেখলে কিছু একটা বাদ পড়ে যায়। প্রতিবাদ সেখানে আছে, অবশ্যই আছে, কিন্তু তার সঙ্গে আছে কোমলতা। আছে ভালোবাসা। আছে এমন এক সৌন্দর্যের প্রতি আস্থা, যা ধ্বংসের মধ্যেও হারিয়ে যায় না।
মানসুর নিজেই বলেছিলেন, “আমার শিল্পে ঘৃণার কোনো বার্তা নেই। এখানে আছে সৌন্দর্য ও ভালোবাসা।”
এখন তিনি নেই। হয়তো কোনো ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি একদিন হঠাৎ বুঝবেন, শিল্পীটি চলে গেছেন। হয়তো কোনো পুরোনো ছবির রঙ তখনও আগের মতোই থাকবে, বৃদ্ধ মানুষটির পিঠে জেরুজালেমও একইভাবে থাকবে, মাটিও একইভাবে পড়ে থাকবে তার নিচে—শুধু যে মানুষটি সেই মাটির দিকে তাকিয়ে আমাদের বলেছিলেন তার গল্প, তিনি আর ফিরে আসবেন না।
কিন্তু শিল্পীর জন্য ফিরে আসার অন্য পথ থাকে। ছবির ভেতর দিয়ে। স্মৃতির ভেতর দিয়ে। মানুষের চোখের ভেতর দিয়ে।
সুলাইমান মানসুর সেই পথেই থেকে গেলেন—একটি ভূখণ্ডের মাটি, মানুষের মুখ, হারানো ঘরের স্মৃতি এবং সৌন্দর্য ও ভালোবাসার প্রতি এক শিল্পীর দীর্ঘ বিশ্বাস হয়ে।

সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









