নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার দুদিন পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে সময় গড়াচ্ছের সাথে সাথে জীবিতদের ফিরে পাওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল পর্যন্ত এই দুর্যোগে ৩৮৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, আর বিদেশি পর্যটকসহ এখনো নিখোঁজ অন্তত ৮২৬ জন। এ পরিস্থিতির মধ্যেই প্লাবিত এলাকায় নতুন করে গঠিত একটি হ্রদ ভেঙে আরও বড় ধরণের বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বুধবার সকালে হিমালয় এলাকায় একটি হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ পানি, পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি নদীগুলোর দিকে নেমে আসে। এর ফলে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ব্যাপক বন্যা দেখা দেয়।
কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাত ৯টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নেপাল পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে মৃতের সংখ্যা ৩৮৯ জনে পৌঁছানোর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর মধ্যে চিতওয়ানে ১৩৭টি, নাওয়ালপরাসি ইস্টে ৮৭টি, ধাদিংয়ে ৩৩টি, গোরখায় ৩২টি, নুওয়াকোটে ২৮টি, তানাহুনে ২৮টি, রাসুয়ায় ১৭টি, নাওয়ালপরাসি ওয়েস্টে ২৭টি মরদেহ পাওয়া গেছে।
নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা, নিরাপত্তাকর্মী এবং দেশি-বিদেশি পর্যটক রয়েছেন।
তাদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৪ জন, নেপাল পুলিশের ২৮ জন এবং আর্মড পুলিশ ফোর্স নেপালের ১৩ জন সদস্য রয়েছেন।
নিখোঁজদের বড় একটি অংশ পর্যটক। তাদের সংখ্যা ৫৯০ জন; এর মধ্যে ৪৭৬ জন বিদেশি এবং ১১৪ জন নেপালি পর্যটক।
যেভাবে শুরু ভয়াবহ বন্যা
বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমালয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও মাটির ধস নদীতে পড়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। বন্যার পানি ও ধ্বংসাবশেষ দ্রুতগতিতে নদী উপত্যকা দিয়ে নেমে এসে বসতি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ভাসিয়ে নেয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। পরে ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, ভূমিকম্প নয়, বরং ভূমিধস থেকেই ওই ভূকম্পনজনিত শক্তি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার সঙ্গে এই দুর্যোগের যোগসূত্র রয়েছে।
রয়টার্স বলছে, নেপালের রাসুয়া জেলার উঁচু পার্বত্য এলাকা থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নদীর উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এর ফলে নদীতে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ তৈরি হয়। পরে সেই স্রোত নেপালের বিভিন্ন জনপদ এবং চীন-নিয়ন্ত্রিত তিব্বতের কিছু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
বন্যার প্রবল স্রোত ভুটে কোশি, ত্রিশূলীসহ সংশ্লিষ্ট নদী অববাহিকা ধরে নিচের দিকে নেমে যায়। এতে বহু বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধার তৎপরতাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
নিখোঁজদের মধ্যে শত শত বিদেশি
বন্যায় নেপালে নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ৫৯০ জন বিদেশি বলে জানিয়েছে নেপালের কর্তৃপক্ষ। তাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
কাঠমান্ডু পোস্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ১৭৭ জন ভারতীয়, ৬৩ জন মার্কিন, ৫৩ জন ইউক্রেনীয়, ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় এবং ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক।
রয়টার্সও জানিয়েছে, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নাগরিকদের মধ্যে অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং জানিয়েছেন, দেশটির অন্তত ৩৪ নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
নিখোঁজদের একটি অংশ তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রায় যাওয়া পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। আবার অনেকে ট্রেকিং বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে নেপালের পার্বত্য এলাকায় গিয়েছিলেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্গম ভূপ্রকৃতি, খারাপ আবহাওয়া এবং যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকর্মীদের জন্য নিখোঁজদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপালের পাশাপাশি তিব্বতেও এই দুর্যোগের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। সেখানে তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









