দক্ষিন লেবাননের ফ্রাউন গ্রামের স্কুলটির সামনে দাঁড়ালে প্রথমে মনে হয়, এখানে এখনো স্কুল আছে। তারপর একটু তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায়, কথাটি ঠিক নয়। স্কুল আছে, কিন্তু তার চারপাশের পৃথিবীটি আর আগের মতো নেই।
দেয়ালের ওপারে ভাঙা বাড়ি। কোথাও কংক্রিটের স্তূপ, কোথাও লোহার বাঁকা দণ্ড, কোথাও এমন একটি দরজা, যা এখন আর কোনো ঘরে খোলে না। গ্রামের অনেক জায়গায় পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই। অথচ সেপ্টেম্বর আসছে, আর সেপ্টেম্বর মানেই স্কুল খোলার সময়।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্বাস মাক্কি তার ছোট অফিসে বসে সেই দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার টেবিলে কাগজপত্র, স্কুলের হিসাব, শিক্ষার্থীদের তালিকা। কিন্তু এই কাগজগুলোর পাশে আরেকটি অদৃশ্য তালিকা আছে—যে মানুষগুলো এখনো এই স্কুলের ঘরগুলোতে ঘুমায়, যাদের বাড়ি ছিল, কিন্তু এখন আর নেই। স্কুলটি একই সঙ্গে স্কুল এবং আশ্রয়কেন্দ্র। এই দুই পরিচয়ের মধ্যে কোনো আপাদত সহজ সমাধান নেই।
মাক্কি বলেন, “আমরা স্কুল খুলব। কিন্তু যারা এখানে আশ্রয় নিয়েছে, তাদেরও ছাড়বো না।” কথাটি খুব সাধারণ। কিন্তু যুদ্ধের পরে সাধারণ কথাগুলোই কঠিন হয়ে ওঠে।
ফিরে আসার পর
ফ্রাউনে মানুষজন যুদ্ধবিরতির পরে ফিরে এসেছিল। তারা ভেবেছিল, বাড়ি হয়তো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু বাড়ি তো বাড়িই। মানুষ যখন দীর্ঘদিন দূরে থাকে, তখন তার মনে নিজের বাড়ির একটি ছবি থেকে যায়—একটি জানালা, দরজার সামনে কয়েকটি গাছ, রান্নাঘরের গন্ধ, হয়তো দেয়ালে ঝোলানো কোনো পুরোনো ছবি।
কিন্তু ফিরে এসে তারা সেই ছবির জায়গায় দেখল ধ্বংসস্তূপ।
ফ্রাউন দক্ষিণ লেবাননের বিন্ত জবেইল জেলার একটি গ্রাম। বৈরুত থেকে এখানে আসতে প্রায় দুই ঘণ্টা লাগে। যুদ্ধের পর এটি সেই কয়েকটি এলাকার একটি হয়ে ওঠে, যেখানে নতুন সমঝোতার অধীনে ইসরায়েলি সেনাদের সরে যাওয়া এবং লেবাননের সেনাবাহিনীর প্রবেশের কথা ছিল।
মানুষ ফিরে এল। কিন্তু বাড়ি ফিরে এল না।
সুজুদ রামাদানও তাদের একজন। এখন তিনি স্কুলের ভেতরেই থাকেন। স্কুলের প্রবেশপথে তিনি একটি ছোট দোকান খুলেছেন। সেখানে বিস্কুট, নাশতা, আর দৈনন্দিন জীবনের সামান্য কিছু জিনিস বিক্রি হয়।
দোকানটি যেন একটি ছোট্ট ঘোষণা—জীবন এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
গ্রামের দোকানপাট ধ্বংস হয়ে গেছে বলে মানুষকে অন্য গ্রামে যেতে হয়। তাই স্কুলের দরজার পাশে এই ছোট বাজারটি তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের পরে পৃথিবী কখনো কখনো এভাবেই নতুন করে সাজে: একটি শ্রেণিকক্ষ হয়ে যায় শোবার ঘর, স্কুলের দরজা হয়ে যায় বাজারের দরজা, আর একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রামের মানুষ নিজেদের স্বাভাবিক জীবনের সামান্য অংশটুকু আবার তৈরি করার চেষ্টা করে।
রামাদান বলেন, “যুদ্ধবিরতির পর আমরা ফিরে এসে দেখলাম, পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু আমি আশা করি, ফ্রাউন আবার আগের মতো হবে। হয়তো তার চেয়েও ভালো হবে।”
মানুষের আশা অনেক সময় আশ্চর্য জিনিস। চারপাশে যখন কিছুই আগের মতো নেই, তখনও সে ভবিষ্যতের একটি ছবি আঁকে।

স্কুলে আবার ঘণ্টা বাজবে
১৫ সেপ্টেম্বর লেবাননে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু একটি স্কুলে ঘণ্টা বাজানোর আগে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। যারা এখনো স্কুলে থাকে, তারা কোথায় যাবে? যে বাড়িগুলো ভেঙে গেছে, সেগুলোর মানুষ কোথায় থাকবে? যে শিশুরা যুদ্ধের মধ্যে বড় হচ্ছে, তারা কীভাবে বই খুলবে?
ইউনেস্কোর শিক্ষা বিশেষজ্ঞ মাইসুন চেহাবের কথায়, একটি স্কুল একই সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্র এবং স্বাভাবিক শিক্ষার জায়গা হয়ে থাকতে পারে না। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো স্কুলে থাকলে কোথাও ক্লাস দেরিতে শুরু হবে, কোথাও শ্রেণিকক্ষ ছোট হয়ে যাবে।
কিন্তু তাদের সরিয়ে দেওয়াও সহজ নয়। কারণ একজন মানুষকে স্কুল থেকে বের করে দিয়ে যদি বলা হয়, “এখন তুমি কোথায় যাবে?”, তাহলে যুদ্ধের পরে সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো ঘর হয়তো পৃথিবীতে নেই।
লেবাননের শিক্ষামন্ত্রী রিমা কারামি বলেছেন, কোনো শিক্ষার্থীকে স্কুলের বাইরে রাখা হবে না। তবে কোনো বাস্তুচ্যুত মানুষকেও বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া স্কুল থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে না।
কোথাও বাস্তুচ্যুত মানুষদের একটি সরকারি স্কুল থেকে বেসরকারি স্কুলে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কোথাও ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্কুলের জায়গায় অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ তৈরির পরিকল্পনা হচ্ছে। ফ্রাউনেও অস্থায়ী ঘর বানানোর কথা বলা হয়েছে, যাতে আশ্রয় নেওয়া মানুষ অন্যত্র থাকতে পারেন এবং শিশুরা আবার স্কুলে ফিরতে পারে।
এ যেন এক অসম্ভব সমীকরণ—এক পাশে ঘরহারা মানুষ, অন্য পাশে স্কুলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা শিশু।
যে প্রজন্ম অপেক্ষা করছে
দক্ষিণ লেবাননের স্কুলগুলো শুধু ভবন নয়। এগুলোও যুদ্ধের স্মৃতি বহন করে। তিন শতাধিক স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরও কয়েকশ স্কুল সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির কারণে কোনো না কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চ, বই, কম্পিউটার, দেয়াল—সবকিছুই যুদ্ধের হিসাবের অংশ হয়ে গেছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয়তো কোনো ভবনে দেখা যায় না।
গত সাত বছর ধরে লেবাননের শিশুদের স্কুলজীবন বারবার থেমে গেছে। একবার যুদ্ধ, একবার বাস্তুচ্যুতি, একবার অন্য কোনো সংকট। একটি শিশুর কাছে সাত বছর খুব দীর্ঘ সময়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সাত বছরকে জীবনের একটি অধ্যায় বলতে পারে; একটি শিশু সাত বছরে শৈশব পার হয়ে যায়।
তাই শিক্ষা যদি অপেক্ষা করতে থাকে, তাহলে যে প্রজন্ম অপেক্ষা করছে, তার শৈশব আর ফিরে আসবে না।
চেহাব বলেন, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক শান্তি বা নিরাপত্তা ফিরে আসার জন্য শিক্ষা অপেক্ষা করতে পারে না। শিশুদের এখনই নিরাপদ শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে হবে, শিক্ষকদের সহায়তা করতে হবে, তাদের জীবনে আবার কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে দিতে হবে।
ফ্রাউনের স্কুলে তাই সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখটি শুধু একটি নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু নয়।
সেদিন হয়তো একটি ঘণ্টা বাজবে। কেউ বই খুলবে। কেউ হয়তো জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকবে, যেখানে একসময় একটি বাড়ি ছিল। কেউ হয়তো মনে করার চেষ্টা করবে, যুদ্ধের আগে এই জায়গাটি কেমন ছিল। আর স্কুলের ভেতরেই, অন্য একটি ঘরে, এমন কোনো পরিবার হয়তো এখনো ঘুমিয়ে থাকবে যার নিজের বাড়ি নেই।
এই দুই বাস্তবতাকে পাশাপাশি রেখেই লেবাননের নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হবে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একটি স্কুল আবার খুলবে আর তার ভেতর দিয়ে একটি দেশ নিজের ভবিষ্যৎটিকে, যতটা সম্ভব সাবধানে, আবার হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









