একজন মায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে, আমি বহুবার ভেবেছি, একজন মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা কি সত্যিই তাঁর সন্তানকে মানুষ করার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি?
আমরা খুব সহজেই বলি, ‘মা অশিক্ষিত’, ‘মা উচ্চশিক্ষিত’, ‘মা মাস্টার্স পাস’, ‘মা চাকরি করেন’, ‘মা ঘরে থাকেন’। যেন এই পরিচয়গুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে একজন মা কেমন এবং তাঁর সন্তান কেমন হবে তার উত্তর। কিন্তু জীবনকে একটু কাছ থেকে দেখলে মনে হয়, বিষয়টি এত সরল নয়। আমার কাছে অশিক্ষিত মা মানে অজ্ঞ মা নন। যে মা হয়ত বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে পারেননি, অক্ষরজ্ঞানও সীমিত-কিন্তু জীবনকে নিজের মতো করে পড়েছেন, মানুষকে বুঝেছেন, প্রকৃতিকে অনুভব করেছেন, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছেন- তিনি স্বশিক্ষিত। তাঁর কোনো সার্টিফিকেট নেই, কিন্তু তাঁর জীবনের ভাঁজে ভাঁজে জমে আছে এক বিশাল শিক্ষার ইতিহাস।
আমি দেখেছি, এমন অনেক মায়ের সন্তান খুব স্বাভাবিকভাবে বড় হয়েছে। তাদের শৈশবের মধ্যে ছিল মাটি, গাছ, আকাশ, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, খেলা, গল্প আর মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ। মা হয়তো জানতেন না ‘চাইল্ড সাইকোলজি’ কী, কিন্তু সন্তানের মনটা বুঝতেন। সন্তান কখন চুপ করে আছে, কখন কাঁদতে চায়, কখন বাইরে ছুটতে চায়- তিনি অনুভব করতেন। তিনি হয়ত জানতেন না ‘লিবারেল থিংকিং’ কী; কিন্তু সন্তানকে বলতেন, ‘তুমি তোমার মতো করে বাঁচো।’ এই কথাটির মূল্য অনেক। আবার আমাদের সময়ের শিক্ষিত মায়েদের দিকে তাকালে অন্য একটি বাস্তবতা চোখে পড়ে। আমি তাঁদের কোনোভাবেই ছোট করছি না। বরং তাঁদের সংগ্রাম, শিক্ষা ও কর্মজীবনের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়, আমরা উচ্চশিক্ষিত হতে হতে সন্তান পালনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত হিসাবি হয়ে যাচ্ছি।
আমরা সন্তানকে ভালো স্কুলে দিতে চাই, ভালো ফল করাতে চাই, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে চাই, ভালো চাকরি দিতে চাই। তার ভবিষ্যৎ নিয়ে এত বেশি পরিকল্পনা করি যে, কোথাও কোথাও তার বর্তমানটাকেই হারিয়ে ফেলি। সন্তান কী খেলতে চায়, কী পড়তে চায়, কাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায়, কোন বিষয় নিয়ে তার কৌতূহল- এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, ‘ওর রেজাল্ট কেমন?’ আমি নিজেকে প্রশ্ন করি- আমরা কি সন্তানকে মানুষ করছি, নাকি একটি সফল প্রকল্প তৈরি করছি?
আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে এই প্রবণতাটি আমাকে ভাবায়। আমরা সন্তানকে নিরাপদ রাখতে চাই। কিন্তু নিরাপত্তার নামে তাকে এত বেশি নিয়ন্ত্রণ করি যে, একসময় সে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলে। আমরা বলি- ‘আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছি।’ নিশ্চয়, আমরা ভালোর জন্যই বলছি। কিন্তু সন্তানের ভালো আর আমাদের ধারণা করা ভালো- দুটি কি সবসময় এক? একজন সন্তান যখন বড় হয় এবং তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে যদি মায়ের অনুমোদন খুঁজতে হয়, তখন সে হয়ত শিক্ষিত হয়, সফলও হয়; কিন্তু নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বরটি কতটা শুনতে শেখে? এই প্রশ্নটি আমাকে তাড়িত করে। আজকের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আমরা আত্মকেন্দ্রিকতা, একাকিত্ব, সম্পর্কের প্রতি অনীহা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা অতিরিক্ত অন্তর্মুখিতার কথা বলি। এর জন্য অবশ্যই শুধু পরিবারকে দায়ী করা যায় না। প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নগরজীবন, প্রতিযোগিতা, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন-সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত। তবু, পরিবার যে শিশুর প্রথম পৃথিবী, সেটি আমরা ভুলতে পারি না।
একটি শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই শুধু শুনতে থাকে-‘এটা করো’, ‘ওটা করো না’, ‘ওর সঙ্গে মিশবে না’, ‘মানুষ কী বলবে’, ‘তোমাকে সবার চেয়ে ভালো হতে হবে’-তাহলে সে ধীরে ধীরে নিজের ভেতরে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করতে পারে। আর সেই দেয়ালের নাম কখনো কখনো হয় ভয়। অথচ সন্তানকে বড় করার জন্য ভয়ের চেয়ে বেশি দরকার বিশ্বাস। আমি চাই, একজন মা সন্তানকে বলুন- ‘তুমি প্রশ্ন করো।’ ‘আমার সঙ্গে দ্বিমত করো।’ ‘ভুল করো, কিন্তু ভুল থেকে শেখো।’ ‘পৃথিবীটাকে নিজের চোখে দেখো।’ ‘শুধু আমার কথা শুনে নয়, নিজের বিবেক দিয়েও সিদ্ধান্ত নাও।’ এই শিক্ষার জন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাগে না। আবার উচ্চশিক্ষারও প্রয়োজন নেই- এ কথা আমি কখনো বলব না। বরং আমি মনে করি, একজন শিক্ষিত মা যদি তাঁর শিক্ষা ও বোধকে সন্তানের স্বাধীনতা তৈরির কাজে ব্যবহার করেন, তাহলে তার চেয়ে সুন্দর মাতৃত্ব খুব কমই আছে। একজন শিক্ষিত মা তাঁর সন্তানকে বইয়ের জগতের সঙ্গে পরিচয় করাবেন, বিজ্ঞান শেখাবেন, ইতিহাস শেখাবেন, যুক্তি শেখাবেন। কিন্তু পাশাপাশি তাকে নদীর কাছে নিয়ে যাবেন, গাছের সঙ্গে পরিচয় করাবেন, মাটির গন্ধ চিনতে শেখাবেন, মানুষের গল্প শুনতে দেবেন। কারণ, মানুষ শুধু বই পড়ে বড় হয় না। মানুষ পৃথিবী পড়েও বড় হয়। আমার নিজের দৃষ্টিতে, সন্তানকে প্রকৃতির সঙ্গে বড় হতে দেওয়া একটি গভীর শিক্ষা। প্রকৃতি শিশুকে অপেক্ষা করতে শেখায়, পরিবর্তন বুঝতে শেখায়, ক্ষয় ও পুনর্জন্ম দেখতে শেখায়। একটি গাছের দিকে তাকিয়ে থাকা কখনো কখনো দশটি উপদেশের চেয়েও বেশি কিছু শেখাতে পারে।
আমাদের শহুরে জীবনে সেই সুযোগ কমে যাচ্ছে। শিশুর হাতে মাটি নেই, কিন্তু মোবাইল আছে। উঠোন নেই, কিন্তু স্ক্রিন আছে। প্রতিবেশীর সঙ্গে গল্প নেই, কিন্তু ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব আছে। অবসর নেই, কারণ প্রতিটি মুহূর্তকে আমরা কোনো না কোনো ‘অর্জন’-এর সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেছি।
এখানেই আমার ভয়। আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা অনেক কিছু জানে কিন্তু খুব কম কিছু অনুভব করে? যারা অসংখ্য মানুষের সঙ্গে অনলাইনে যুক্ত, অথচ পাশের মানুষটির দুঃখ বোঝে না? যারা নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন, কিন্তু অন্যের অধিকারের কথা ভাবতে শেখেনি? যারা সফল হতে জানে, কিন্তু ব্যর্থ হতে জানে না? যারা নিজের জন্য লড়তে জানে, কিন্তু অন্যের জন্য দাঁড়ানোর শিক্ষা পায়নি? আমি মনে করি, এখানেই মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আর সেই মা শিক্ষিত কিনা, চাকরি করেন কিনা, তাঁর কত ডিগ্রি আছে- সেটি দ্বিতীয় প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্ন হলো তিনি কি সন্তানের স্বাধীন সত্তাকে সম্মান করেন? কারণ, সন্তান আমাদের সম্পত্তি নয়। সন্তান আমাদের মাধ্যমে পৃথিবীতে আসে, কিন্তু সে আমাদের হয়ে পৃথিবীতে আসে না। তার নিজের চোখ আছে, নিজের মেধা আছে, নিজের অনুভূতি আছে, নিজের ভুল করার অধিকার আছে, নিজের পথ বেছে নেওয়ার অধিকার আছে।
মা হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো তখনই, যখন সন্তান একদিন আমাদের ছাড়িয়ে নিজের মতো করে দাঁড়াতে পারে। আমি চাই না আমার সন্তান শুধু আমাকে অনুসরণ করুক। আমি চাই সে আমাকে প্রশ্ন করুক। আমার ভুল ধরুক। আমার চেয়ে ভালো মানুষ হোক। আমার চেয়ে মুক্তভাবে চিন্তা করুক। কারণ, সন্তানের স্বাধীনতা মায়ের পরাজয় নয়- এটাই মায়ের সবচেয়ে বড় অর্জন। তাই আজ যখন আমরা বলি ‘শিক্ষিত মা’, আমি একটু থেমে ভাবতে চাই-শিক্ষিত বলতে আমরা কী বুঝি? শুধু এমএ পাস? শুধু মাস্টার্স? শুধু চাকরি? শুধু ইংরেজিতে সাবলীল কথা বলা? নাকি শিক্ষা মানে নিজের চিন্তার সীমাবদ্ধতাকে চিনতে পারা? শিক্ষা মানে অন্যের মতামতকে সম্মান করা? শিক্ষা মানে সন্তানকে নিজের ইচ্ছার অধীন না করে তার নিজস্ব সত্তাকে স্বীকার করা? যে মা এই শিক্ষা অর্জন করেছেন, তিনি অক্ষরজ্ঞান কম হলেও আমার কাছে শিক্ষিত। আর যে মা বহু ডিগ্রি অর্জন করেও সন্তানের চিন্তার দরজায় তালা লাগিয়ে রাখেন, তাঁর শিক্ষার কোথাও যেন একটি অপূর্ণতা থেকে যায়।
আমি কোনো মাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই না। কারণ, আমরাও আমাদের সময়ের সন্তান। আমাদের ওপরও ছিল সমাজের চাপ, নিরাপত্তার চিন্তা, লোকলজ্জা, প্রতিযোগিতা, ভবিষ্যতের ভয়। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন আমাদের নতুন করে শিখতে হবে- সন্তানকে আগলে রাখা আর তাকে আটকে রাখা এক বিষয় নয়। আমাদের সন্তানদের শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করলে হবে না; জীবন নামের বড় পরীক্ষার জন্যও প্রস্তুত করতে হবে। তাকে স্বাধীনতা দিতে হবে, কিন্তু দায়িত্বও শেখাতে হবে। তাকে প্রশ্ন করতে দিতে হবে, কিন্তু যুক্তিও শেখাতে হবে। তাকে নিজের মতো হতে দিতে হবে, কিন্তু অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাতে হবে। তাকে প্রকৃতির কাছে নিয়ে যেতে হবে, মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে, বইয়ের কাছে নিয়ে যেতে হবে- সবশেষে, তাকে নিজের কাছে ফিরতে শেখাতে হবে।
আমার বিশ্বাস, আগামী দিনের সমাজ বদলাবে কোনো একটি ডিগ্রির কারণে নয়; বদলাবে যখন মায়েরা বুঝবেন- সন্তানকে নিজের স্বপ্নের ছাঁচে ঢালার চেয়ে তার নিজের স্বপ্নটি আবিষ্কার করতে সাহায্য করা অনেক বড় কাজ। সনদ শিক্ষার পরিচয় হতে পারে। কিন্তু মুক্ত মন, মানবিকতা, বিবেক ও স্বাধীন চিন্তাই প্রকৃত শিক্ষার পরিচয়। আর একজন মায়ের হাতে যদি এই শিক্ষাটুকু থাকে, তবে তাঁর সন্তান হয়ত শুধু জীবনে সফল হবে না- সে একজন স্বাধীন, সংবেদনশীল ও মানবিক মানুষ হয়ে উঠবে। সন্তানের জন্য শেষ পর্যন্ত সেটিই তো আমাদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হওয়া উচিত।
লেখক : কলামিস্ট ও প্রকাশক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









