যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে বৈঠক করতে চান। এ জন্য তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার কিছু জায়গায় ছাড়ও দিচ্ছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে একটি বড় যৌথ সামরিক মহড়া সীমিত করেছে এবং আরেকটি মহড়া বাতিল করেছে।
ট্রাম্পের কাছে এটি মূলত ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার বিষয়। সেখানে দক্ষিণ কোরিয়া বা চীনের ভূমিকা কতটা থাকবে, তা নিয়েই প্রশ্ন আছে। জাপান ও রাশিয়াও থাকবে আরও দূরে।
আরেকটি বাস্তবতা এখন স্পষ্ট: ভবিষ্যতের কোনো বৈঠকে উত্তর কোরিয়ার সম্পূর্ণ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ হয়তো আর মূল আলোচনার বিষয় হবে না। পিয়ংইয়ং তার পারমাণবিক অস্ত্রকে নিজেদের নিরাপত্তার স্থায়ী অংশ হিসেবে দেখছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে তাদের পারমাণবিক মর্যাদা ‘অপরিবর্তনীয়’ বলেও ঘোষণা করেছে।
কিমের হাতে কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান উত্তর কোরিয়ার স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের মধ্যে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার সক্ষমতা নিয়ে উত্তর কোরিয়ার আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে এখনও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তবু দুই নেতা চাইলে এমন একটি চুক্তি করতে পারেন, যাতে দুজনই নিজ নিজ দেশের মানুষের কাছে নিজেদের বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু সেই চুক্তির মূল্য দিতে হতে পারে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং পুরো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে।
সম্ভাব্য চুক্তিতে উত্তর কোরিয়া বলতে পারে, তারা আর নতুন আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করবে না। ভবিষ্যতে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের আলোচনা হবে—তবে সেটি ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পর। এর বিনিময়ে পিয়ংইয়ং পেতে পারে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে কার্যত স্বীকৃতি, জাতিসংঘের কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগ এবং বিনিয়োগ।
ট্রাম্পও বলতে পারবেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আরও নিরাপদ করেছেন। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে মার্কিন কোম্পানির প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু সমস্যা হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানকে তুলনামূলকভাবে অনিরাপদ অবস্থায় রেখে দেয়, তাহলে পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তাব্যবস্থাই বদলে যাবে।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সবচেয়ে বড় ভরসা হলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘পারমাণবিক ছাতা’। ওয়াশিংটনের কোনো চুক্তি যদি সেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দুর্বল করে, তাহলে মিত্র দেশগুলোর আস্থায় বড় ধাক্কা লাগতে পারে। যে আস্থা তৈরি হতে কয়েক দশক লেগেছে, তা নষ্ট হতে পারে খুব অল্প সময়েই।
এর পরিণতি আরও ভয়ংকর হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি আরও জোরালো হতে পারে। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরেই এ নিয়ে জনমত রয়েছে। এরপর জাপানও একই পথে হাঁটতে পারে। এমনকি তাইওয়ানও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারে।
তখন যে বিষয়টি আজ অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে, সেটিই ধীরে ধীরে বাস্তব রাজনৈতিক বিকল্প হয়ে উঠবে—আরও দেশ পারমাণবিক অস্ত্র চাইবে।
এর অর্থ হবে বর্তমান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা। বর্তমানে স্বীকৃত ও অস্বীকৃত মিলিয়ে নয়টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান যুক্ত হলে সংখ্যাটি ১১-তে উঠতে পারে; অন্য কেউ যোগ দিলে আরও বাড়বে।
তখন প্রশ্নটি শুধু কোরীয় উপদ্বীপের থাকবে না। বিশ্বজুড়ে অন্যান্য দেশও ভাবতে শুরু করতে পারে, নিরাপত্তার শেষ ভরসা যদি পারমাণবিক অস্ত্র হয়, তাহলে তারা কেন পিছিয়ে থাকবে?
এই কারণেই কিমের সঙ্গে ট্রাম্পের নতুন বৈঠকের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়তো বৈঠকের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি সফল চুক্তি।
কারণ এমন একটি চুক্তি যদি যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ করে কিন্তু তার মিত্রদের নিরাপত্তা দুর্বল করে, তাহলে কোরীয় উপদ্বীপের বর্তমান সংকট হয়তো ভবিষ্যতের সংকটের তুলনায় ছোট বলেই মনে হবে।
বিপদ তাই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসা নয়। বিপদ হলো—এমন একটি সমঝোতা, যা দুই নেতাকে রাজনৈতিক সাফল্য দেবে, কিন্তু তার খেসারত দিতে হবে তাদের মিত্র, প্রতিবেশী এবং শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্বকে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









