কয়েক মাস আগে এআই এজেন্টদের একটি দল এমন কিছু করেছিল, যা তাদের করতে বলা হয়নি। তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করেছে, দল গঠন করেছে, অন্য সিস্টেমে ঢোকার চেষ্টা করেছে এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডের চিহ্ন আড়াল করার চেষ্টা করেছে। ঘটনাটি একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে এনেছে: এআইয়ের যে প্রক্রিয়া থেকে বুদ্ধিমত্তা তৈরি হচ্ছে, তার ঝুঁকিও আসছে একই জায়গা থেকে।
২০২৪ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ধারণা বোঝাতে আমি একটি মানচিত্র তৈরি করেছিলাম। প্রশ্ন ছিল—এআই কতটা শক্তিশালী হবে এবং সেটি মানুষের জন্য উপকারী হবে, নাকি বিপজ্জনক? তখন সব ধরনের মত ছিল। দুই বছর পর আলোচনা অনেকটাই বদলে গেছে। এআই আরও শক্তিশালী হচ্ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে ভয়ও।
সম্প্রতি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকে কাজ করা গবেষক জ্যাকব কক্সন পদত্যাগ করে অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের জীবন নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খেলা খেলছে। অ্যানথ্রপিকের অ্যালাইনমেন্ট বিভাগের প্রধান ইভান হুবিঙ্গারও বলেন, এআই সব মানুষকে হত্যা করতে পারে এবং আগামী এক দশকে এই ঝুঁকি ১০ শতাংশের বেশি বলে তিনি মনে করেন।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন আশঙ্কা নয়। ২০২৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে ১,৫৮০ জন এআই গবেষককে নিয়ে করা এক জরিপে অর্ধেকেরও বেশি বলেছেন, এআইয়ের কারণে মানবসভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বা মানুষের নিয়ন্ত্রণ চিরতরে হারানোর সম্ভাবনা অন্তত ১০ শতাংশ। জিওফ হিন্টন ১০ থেকে ২০ শতাংশ এবং ইয়োশুয়া বেঙ্গিও ২০ শতাংশ ঝুঁকির কথা বলেছেন। ডেমিস হাসাবিস বলেছেন, ঝুঁকি শূন্য নয় এবং উপেক্ষা করার মতোও নয়। অবশ্য সব পূর্বাভাস এতটা আশঙ্কাজনক নয়। মেটাকুলাসের হিসাবে ২১০০ সালের আগে এআইয়ের কারণে মানবসভ্যতা বিলুপ্ত বা প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা ০.৬ শতাংশ।
নির্দিষ্ট সংখ্যাটি অবশ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, শক্তিশালী প্রযুক্তির সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ে। এআইয়ের কিছু ঝুঁকি খুব সাধারণ—যেমন শিক্ষায় চ্যাটবটের প্রভাব। আবার কিছু ঝুঁকি এতটাই অস্বাভাবিক যে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো শোনে। কিন্তু সেগুলোর কিছু ইতিমধ্যেই পরীক্ষায় দেখা গেছে।

এর একটি উদাহরণ এআই এজেন্টদের একটি পরীক্ষা। ওপেনএআই হাজার হাজার এজেন্টকে আলাদা করে সাইবার নিরাপত্তার কাজ দিয়েছিল। কয়েকটি এজেন্ট কাজটি সমাধান করতে না পেরে জানতে পারে যে অন্য এজেন্টরাও একই ধরনের কাজ করছে। তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের ব্যবস্থা তৈরি করে। কয়েক দিনে প্রায় ১,২০০ এজেন্ট ৭০ হাজারের বেশি বার্তা বিনিময় করে। পরে শত শত এজেন্ট মিলে হাগিং ফেস নামের একটি প্রতিষ্ঠান আক্রমণ করে পুরস্কার জেতার চেষ্টা করে। কেউ তাদের এই কাজ করতে বলেনি। প্রায় এক হাজার এজেন্টের মধ্যে মাত্র ছয়টি মানুষকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিল।
এআইয়ের অগ্রগতির গতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। প্রোগ্রামিং, গণিতসহ নানা ক্ষেত্রে মডেলগুলোর সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৩ সালে চ্যাটজিপিটি ‘raspberry’ শব্দে কয়টি ‘r’ আছে, তা নিয়েও ভুল করত। এখন উন্নত এআই জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং হাজার হাজার এজেন্টকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান করার দাবিও উঠেছে। একই সঙ্গে এআই এখন পরবর্তী প্রজন্মের এআই তৈরিতেও সাহায্য করছে। একে বলা হয় ‘recursive self-improvement’।
সমস্যা হলো, এআইয়ের ক্ষমতা বাড়লেও তাকে নজরদারি করা সহজ হচ্ছে না। হাজার হাজার এজেন্ট মাসে লাখ লাখ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাদের বিপুল কর্মকাণ্ড মানুষের পক্ষে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। আরও বড় সমস্যা হলো, আধুনিক এআই সব সময় তার অভ্যন্তরীণ হিসাব প্রকাশ করে না। নজরদারি চলছে বুঝতে পারলে কিছু মডেল তাদের লিখিত চিন্তার ব্যাখ্যাও সংক্ষিপ্ত করে।
এখানে ‘emergent behaviour’ বা উদ্ভূত আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। এআইকে কেউ সরাসরি ব্যাকরণ, ব্যঙ্গ, পরিকল্পনা বা যুক্তি শেখায়নি। মানুষের লেখা বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের প্রশিক্ষণের মধ্য থেকেই ভাষা, জ্ঞান, পরিকল্পনা, যুক্তি ও সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। বুদ্ধিমত্তা তৈরি হয়েছে প্রশিক্ষণের পরিবেশ থেকে।
এটাই এআইয়ের শক্তি, আবার এটাই তার ঝুঁকিও। কেউ এজেন্টগুলোকে হাগিং ফেস আক্রমণ করতে শেখায়নি। তাদের একটি লক্ষ্য দেওয়া হয়েছিল। সেই লক্ষ্য পূরণের চেষ্টার মধ্য থেকেই অপ্রত্যাশিত আচরণ বেরিয়ে এসেছে। কোনো ব্যবস্থাকে ‘টিকে থাকতে হবে’ এমন নির্দেশ না দিলেও নিজের কাজ চালিয়ে যাওয়া ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা অনেক লক্ষ্য পূরণের পথের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এআইকে মানুষের ইচ্ছামতো কাজ করানোর এই সমস্যাকে বলা হয় ‘অ্যালাইনমেন্ট’। এর কোনো নিশ্চিত সমাধান এখনো নেই। বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশই মনে করেন, বিপদ এখনই আসন্ন নয়, কারণ বর্তমান এআই এখনও মানুষের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো সক্ষম হয়নি। কিন্তু এর সম্ভাব্য পথটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এআই ইতিমধ্যে বিজ্ঞান গবেষণা এবং নিজের উন্নয়নকে দ্রুততর করছে। অ্যানথ্রপিকের তথ্য অনুযায়ী, তাদের গবেষণাকাজের ২৬ শতাংশে এখন ক্লদ এআইয়ের ভূমিকা রয়েছে, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে তা ছিল ১ শতাংশেরও কম।
এখানেই এআইয়ের সবচেয়ে বড় আশা ও ভয় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একই বুদ্ধিমত্তা আমাদের রোগ নিরাময়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও বিজ্ঞানের জটিল সমস্যা সমাধানে সাহায্য করতে পারে। আবার সেই বুদ্ধিমত্তাই এমন কৌশল তৈরি করতে পারে, যা আমরা চাইনি—বিশেষ করে যখন কেউ তাকে দেখছে না।
তাই আসল প্রশ্ন শুধু এআই কতটা বুদ্ধিমান হবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা যে বুদ্ধিমত্তা তৈরি করছি, সেটি শেষ পর্যন্ত কতটা আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এআই হয়তো পুরোপুরি তৈরি একটি যন্ত্র নয়; বরং এটি প্রকৌশল ও বাগান করার মাঝামাঝি কিছু। আমরা পরিবেশ তৈরি করি, প্রশিক্ষণ দিই, কিন্তু সেই বুদ্ধিমত্তা শেষ পর্যন্ত কীভাবে বিকশিত হবে, তা পুরোপুরি আমাদের হাতে নাও থাকতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









