যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে এ সপ্তাহে ওয়াশিংটন সফরে আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। প্রায় এক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জিনপিংয়ের এটি প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। দুই দেশের বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তাইওয়ান ও বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে এই সফরে।
বুধবার শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালে ওয়াশিংটনের অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে তাকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানানোর কথা রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। পরদিন বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে জিনপিংকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হবে। সেখানে সামরিক উড়োজাহাজের প্রদর্শনী এবং প্রায় ৫০০ সামরিক সদস্যের অংশগ্রহণ থাকবে।
জিনপিংয়ের এই সফর শুক্রবার শেষ হওয়ার কথা। সফরে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি নৈশভোজ, ব্যক্তিগত পরিদর্শন এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনাসহ নানা আয়োজন রাখা হয়েছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডেভিড স্যাকস এই আয়োজনকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মিত্র দেশের নেতার জন্যও সাধারণত এমন আয়োজন দেখা যায় না।
বাণিজ্যই বড় আলোচনার বিষয়
ট্রাম্প ও জিনপিংয়ের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হতে পারে বাণিজ্য। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন। সর্বশেষ মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ৯১ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
২০২৫ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও জিনপিংয়ের বৈঠকের পর দুই দেশ একটি বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছেছিল। ওই সমঝোতার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর নতুন করে বড় ধরনের শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত করে। অন্যদিকে, চীন শিল্প উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’ রপ্তানির ওপর কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করে।
তবে এই সমঝোতার মেয়াদ নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ফলে জিনপিংয়ের সফরের সময় এর মেয়াদ বাড়ানো বা নতুন কোনো সমঝোতার ঘোষণা আসে কি না, সেদিকে নজর থাকবে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকের পাশে মঙ্গলবার মার্কিন ও চীনা কর্মকর্তারা বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করেন। তবে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। কৃষিপণ্য রপ্তানি ও বাণিজ্যের অন্যান্য বাধা কমানোর মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বুধবার জিনপিং ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর পরও দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আলোচনায় এআই
ট্রাম্প ও জিনপিংয়ের বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতায় রয়েছে।
বুশ চায়না ফাউন্ডেশনের ডেভিড ফায়ারস্টেইনের মতে, জিনপিংয়ের সফরের আগে এআই দ্রুত দুই দেশের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এআই প্রযুক্তি নিয়ে বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা ঘটায় এর উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্কও বেড়েছে। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স সম্প্রতি ট্রাম্প ও জিনপিংকে এআই উন্নয়ন সাময়িকভাবে থামানো এবং অত্যন্ত শক্তিশালী এআই নিয়ন্ত্রণে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে ট্রাম্প এআইকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। চীনের সঙ্গে এআই প্রতিযোগিতায় জয়কে তিনি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখেন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ট্রাম্প ও জিনপিং এআই ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করতে পারেন। তবে এবারের সফরে এআই বা অন্য কোনো বিষয়ে বড় ধরনের চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে তারা মনে করছেন।
আলোচনায় থাকবে তাইওয়ান
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি তাইওয়ান। স্বশাসিত তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও চীন উড়িয়ে দেয়নি।
অন্যদিকে, তাইওয়ানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির একটি প্রস্তাব কংগ্রেস অনুমোদন করেছে। এখন সেটিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বাক্ষর প্রয়োজন। তবে চীনের সঙ্গে আলোচনায় এটিকে একটি দর-কষাকষির বিষয় হিসেবে ব্যবহার করতে ট্রাম্প আপাতত সিদ্ধান্তটি স্থগিত রেখেছেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, জিনপিং চাইতে পারেন ট্রাম্প যেন অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত আরও পিছিয়ে দেন অথবা তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ খুঁজে নেন।
ঘরোয়া রাজনীতিতেও চাপ
চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশই বর্তমানে অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য আরও বাড়ানোর বিষয়ে জিনপিংয়ের আগ্রহ থাকতে পারে।
তবে ট্রাম্পের জন্য বিষয়টি সহজ নয়। তার প্রশাসনের কিছু সদস্য এবং সমর্থকদের মধ্যে চীনকে নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি ফোর্ড মোটর কোম্পানিকে চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। জাতীয় নিরাপত্তা ও মার্কিন কর্মসংস্থানের স্বার্থে তিনি এমন পদক্ষেপের কথা বলেন।
ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্প
বাণিজ্য, এআই ও তাইওয়ানসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ট্রাম্প জিনপিংয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।
ন্যাশনাল কমিটি অন ইউএস-চায়না রিলেশন্সের প্রেসিডেন্ট স্টিফেন অরলিন্সের মতে, ট্রাম্প মনে করেন দুই দেশের নেতাদের মধ্যে যত বেশি সরাসরি বৈঠক হবে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক তত কম সংঘাতপূর্ণ হতে পারে।
তবে এবারের রাষ্ট্রীয় সফর থেকে বড় কোনো চুক্তি বা দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। বাণিজ্য, এআই, তাইওয়ান এবং দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে মতপার্থক্য এখনও রয়ে গেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









