জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না ইরান। তবে শক্তির ভাষায় নয়, কূটনীতি ও আলোচনার পথেই এগোতে চায় তেহরান।’’
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতিসংঘের ভাষণের এক দিন পরই বক্তব্য আসে পেজেশকিয়ানের।
ট্রাম্প তার ভাষণে ইরানকে সতর্ক করার পাশাপাশি দেশটির অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার আহ্বান জানান এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ‘ধ্বংস’ করার হুমকি দেন।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘‘ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। একই সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রাখবে তেহরান। আমরা শুধু আত্মরক্ষা করেছি।’’
ভাষণের শুরুতেই ইরানকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘‘ইরানিরাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সন্ত্রাস ও আগ্রাসনের শিকার।’’
ভাষণে মিনাব ও লামার্দে নিহত শিক্ষার্থীদের ছবি তুলে ধরেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। এ সময় দেশটির প্রয়াত নেতা সৈয়দ আলি খামেনির ছবিও ছিল তার হাতে।
ইরানের বিভিন্ন শহর ও স্থাপনায় হামলার কথা তুলে ধরে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘‘মিনাবে একটি স্কুল এবং লামার্দে শিশুদের উপস্থিতি থাকা একটি ক্রীড়া হলে হামলা চালানো হয়েছে।’’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অস্ত্র ব্যবহার করে এসব হামলায় ইরানি বিজ্ঞানী, বেসামরিক মানুষ ও শিশু নিহত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘‘যারা সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা দেয়, তারাই ইরানকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করছে। ইরান শুধু আত্মরক্ষা করেছে, তারা ‘সন্ত্রাসী’ নয়।’’
ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল, হাসপাতাল ও অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘‘এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’’
ইরানের প্রেসিডেন্ট তেহরানে হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়া হত্যার ঘটনাও স্মরণ করেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার অভিষেকের দিন তেহরানে হানিয়াকে হত্যা করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘‘এই ঘটনা ইরানের সামনে থাকা হুমকিরই প্রমাণ।’’
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘‘চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্যই ইরান পারমাণবিক প্রযুক্তি চায়। এই সক্ষমতা অর্জনে বাধা দেওয়ার মতো কোনো বিধিনিষেধ মেনে নেবে না তেহরান।’’
তিনি বলেন, ‘‘পারমাণবিক প্রযুক্তি কেবল কয়েকটি দেশের একচেটিয়া অধিকার হতে পারে না। ইরান তার নিজস্ব অধিকার ছেড়ে দেবে না।’’ একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, ‘‘ইরান পারমাণবিক অস্ত্র চায় না এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ওপরও কোনো সীমাবদ্ধতা মেনে নেবে না।’’
পেজেশকিয়ান ইরানের সামরিক সক্ষমতাকেও আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। তার বক্তব্য, ‘‘নিজেদের ভূখণ্ড ও ভবিষ্যৎকে হুমকি থেকে রক্ষা করতে ইরানকে শক্তিশালী হতে হবে। তবে অন্য দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার বা অন্য দেশের নিরাপত্তার বিনিময়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো লক্ষ্য ইরানের নেই।’’
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘‘গাজায় ৮০ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত এবং কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।’’ তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তুলেন এবং বলেন, ‘‘যারা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করছে, তাদেরই ‘সন্ত্রাসী’ বলা হচ্ছে।’’
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘‘বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ ঠেকাতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে—গাজা তারই প্রমাণ।’’
তিনি বলেন, ‘‘ফিলিস্তিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেকের ওপর একটি খোলা ক্ষত হয়ে আছে এবং গাজা বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ ঠেকাতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতীক।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘ফিলিস্তিনিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়।’’ বিশ্বে দখলদারিত্ব, আগ্রাসন ও অবিচার চলতে থাকলে প্রতিরোধও চলবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিরোধের অবসান ঘটানো সম্ভব—এ ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ‘‘নিজেদের ভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চললে তারা প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে।’’
আঞ্চলিক সমস্যার সমাধানে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের পরিবর্তে অঞ্চলটির দেশগুলোকেই ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিরাপত্তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে না দাবি করে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘‘তেহরান শক্তিশালী প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা চায়।’’
হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘বাইরের শক্তিগুলো এই জলপথ থেকে সুবিধা নেবে, অথচ সেটিকে ব্যবহার করে ইরানের ওপর সামরিক চাপ ও অনিরাপত্তা তৈরি করবে—এমন পরিস্থিতি মেনে নেবে না তেহরান।’’
তিনি বলেন, ‘‘এতে ইরান নতি স্বীকার করবে না। যুদ্ধের বিস্তার নিরাপত্তা তৈরি করবে না।’’
আঞ্চলিক নিরাপত্তা কোনো একটি দেশের পক্ষে একা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতার মাধ্যমে বৃহত্তর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান পেজেশকিয়ান।
ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের জন্য দায়ীদের উদ্দেশে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘‘তেহরান দেখিয়েছে তাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় না। ইরান কখনো আগ্রাসী ছিল না, কখনো যুদ্ধ শুরু করেনি এবং সবসময় আলোচনার টেবিলে বসার প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছে। ইরান আত্মরক্ষা চালিয়ে যাবে, একই সঙ্গে কূটনীতির জন্যও প্রস্তুত থাকবে।’’
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘‘ইরান সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনায় প্রস্তুত। তবে সামরিক চাপের মধ্যে কোনো আলোচনা মেনে নেবে না।’’
জাতিসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়ার সময়েই পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্য আসে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগের খবরও পাওয়া যায়।
ভাষণের শেষদিকে পেজেশকিয়ান সমান অধিকার, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং দ্বিমুখী নীতি প্রত্যাখ্যানের ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘‘যে শান্তি সবার জন্য নয়, তা শান্তি নয়। আর যে ন্যায়বিচার সবার জন্য নয়, তাকে ন্যায়বিচার বলা যায় না।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









