একটি পুরোনো জাদুঘরের কথা ভাবুন। সেখানে পাশাপাশি দুটি দরজা। প্রথম দরজার ওপরে লেখা—‘চেতনা’; দ্বিতীয়টির ওপরে—‘ইতিহাস’। আপনি যে দরজা দিয়েই ঢুকুন, শেষ পর্যন্ত হয়তো একই মূর্তির সামনে এসে দাঁড়াবেন: গ্রিক দেবতা, অর্ধনগ্ন মানবদেহ, কোনো ট্র্যাজেডির নায়ক, কিংবা এক অজ্ঞাত শিল্পীর আঁকা মুখ। কিন্তু প্রথম দরজা দিয়ে ঢুকলে আপনি জিজ্ঞেস করবেন, এই মূর্তির মধ্যে কোন সত্য নিজেকে দৃশ্যমান করেছে? দ্বিতীয় দরজা দিয়ে ঢুকলে প্রশ্নটি বদলে যাবে: কোন সমাজ, কোন শ্রম, কোন উৎপাদনব্যবস্থা, কোন মানুষের জীবন এই মূর্তিকে সম্ভব করেছিল? প্রথম দরজাটি হেগেলের। দ্বিতীয়টি মার্কস।
অবশ্য এই দুই দরজার মাঝখানে কোনো দেয়াল নেই। বরং তাদের মধ্যে এমন একটি গোপন করিডর আছে, যার মানচিত্র আজও অসম্পূর্ণ। মার্কস হেগেলকে উল্টে দিয়েছিলেন—এ কথা আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু শিল্পের প্রশ্নে মার্কসকে পড়লে দেখা যায়, তিনি তার পূর্বসূরিকে কেবল অস্বীকার করেননি; অনেক সময় তার প্রশ্নগুলোকে অন্য মাটিতে বসিয়েছেন। হেগেলের কাছে শিল্প ছিল আত্মা বা স্পিরিটের নিজের সত্যকে ইন্দ্রিয়ের সামনে উপস্থিত করার এক ঐতিহাসিক পদ্ধতি। তার ভাষায়, সৌন্দর্য হলো “আইডিয়ার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আবির্ভাব”—অর্থাৎ কোনো বিমূর্ত ধারণা যখন পাথর, রং, শব্দ কিংবা ভাষার মধ্যে দৃশ্যমান বা শ্রাব্য হয়ে ওঠে, তখনই তার সৌন্দর্য।
এই বাক্যটির ভেতরেই হেগেলের নন্দনতত্ত্বের একটি ছোট মহাবিশ্ব লুকিয়ে আছে। সৌন্দর্য তার কাছে কেবল সুন্দর মুখ, সুষমা বা আনন্দের বিষয় নয়। শিল্পের গভীরে আছে সত্য। কিন্তু সেই সত্য গণিতের সূত্রের মতো নগ্ন নয়; তাকে শরীর নিতে হয়। ধারণাকে পাথর হতে হয়, আত্মাকে মুখ হতে হয়, স্বাধীনতাকে কোনো মানবদেহের ভঙ্গিতে দাঁড়াতে হয়। শিল্প তাই দর্শনের চেয়ে কম নয়, যদিও দর্শনের মতো ধারণার ভাষায় কথা বলে না। শিল্প সত্যকে দেখায়; দর্শন সত্যকে চিনে।
এখানে গ্রিক ভাস্কর্য হেগেলের কাছে প্রায় একটি নিখুঁত রহস্য। দেবতার মূর্তি মানবদেহে, অথচ সেই দেহের মধ্যে মানুষ তার নিজের স্বাধীন আত্মাকে দেখতে পায়। শিল্পের ইতিহাস তাই নিছক শৈলীর ইতিহাস নয়। এটি আত্মসচেতনতার ইতিহাস। হেগেল শিল্পকে তিন বৃহৎ রূপে দেখেছিলেন—প্রতীকী, ধ্রুপদি ও রোমান্টিক। প্রথমটিতে ধারণা এবং তার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপের মধ্যে দূরত্ব; দ্বিতীয়টিতে দুয়ের আপাত সামঞ্জস্য; তৃতীয়টিতে আত্মা আবার বস্তুগত রূপকে অতিক্রম করে অন্তর্জগতের দিকে সরে যায়। শিল্প যেন এক দীর্ঘ যাত্রা—পাথর থেকে মানুষ, মানুষ থেকে অন্তর, অন্তর থেকে এমন এক জ্ঞান যেখানে শিল্প নিজেই নিজের সীমা বুঝতে শুরু করে।

এইখানেই আসে হেগেলের বহুল আলোচিত ‘শিল্পের অবসান’-এর ধারণা। এর অর্থ এই নয় যে তার পর থেকে আর ছবি আঁকা হবে না, কবিতা লেখা হবে না, গান গাওয়া হবে না। বরং তার বক্তব্যের গভীরে রয়েছে একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন: আধুনিক যুগে শিল্প আর মানুষের সর্বোচ্চ সত্যের একমাত্র বা প্রধান বাহন নয়। একসময় ধর্ম যে কাজ করত, পরে দর্শন যে কাজ করতে পারে, শিল্প সবসময় সেই কাজটি আর করতে পারে না। হেগেলের কাছে শিল্প অতীত হয়ে যাওয়া মানে শিল্পের মৃত্যু নয়; বরং তার ঐতিহাসিক ভূমিকার পরিবর্তন।
মার্কস জাদুঘরের দ্বিতীয় দরজা খুলে দেন।
১৮৫৭ সালের ‘গ্রুন্ডরিসে’-এর ভূমিকায় তিনি একটি আপাত সরল, কিন্তু আসলে গভীর প্রশ্ন করেছিলেন: গ্রিক শিল্প ও মহাকাব্য আমাদের এখনও কেন আনন্দ দেয়? গ্রিক সমাজ তো আমাদের সমাজ নয়। তাদের দেবতা আমাদের দেবতা নন, তাদের অর্থনীতি আমাদের অর্থনীতি নয়, তাদের সামাজিক সম্পর্কও আমাদের নয়। তবু হোমারকে পড়লে বা গ্রিক ভাস্কর্য দেখলে কেন মনে হয়, সময় যেন হঠাৎ উল্টো দিকে বয়ে যাচ্ছে?
মার্কসের নিজের ভাষায়, “গ্রিক শিল্প ও মহাকাব্য এখনও আমাদের কাছে শিল্পসুখ দেয়”—এটাই সমস্যা। যদি শিল্প কেবল তার সময়ের সামাজিক সম্পর্কের সরাসরি প্রতিফলন হতো, তবে প্রাচীন গ্রিসের শিল্প আধুনিক মানুষের কাছে এত জীবন্ত থাকার কথা নয়।
মার্কসের উত্তরটি কোনো সহজ ‘শিল্প সমাজের আয়না’ তত্ত্ব নয়। বরং তিনি একটি আশ্চর্য উপমা ব্যবহার করেন: গ্রিকরা আমাদের কাছে মানবজাতির শৈশবের মতো। কিন্তু শৈশব হারিয়ে যায় বলেই কি তার সৌন্দর্য হারিয়ে যায়? বরং প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তার শৈশবের দিকে ফিরে তাকিয়ে এক ধরনের আনন্দ পায়—একটি হারিয়ে যাওয়া জগতের প্রতি, যার কাছে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।
মার্কসের নন্দনতত্ত্বে সময় নিজেই শিল্পী হয়ে ওঠে।
তিনি ব্যঙ্গের সঙ্গে প্রশ্ন করেন: স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, রেলওয়ে, টেলিগ্রাফের যুগে গ্রিক পুরাণের জগৎ কীভাবে আবার সম্ভব? “ভলকান” কোথায় দাঁড়াবেন আধুনিক কারখানার যন্ত্রের পাশে? “জুপিটার” কী করবেন বজ্রনিরোধকের যুগে? “হার্মিস”-এর জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে আধুনিক বাণিজ্য ও পুঁজির প্রতিষ্ঠান। প্রযুক্তি শুধু আমাদের উৎপাদনের পদ্ধতি বদলায়নি; বদলে দিয়েছে আমাদের কল্পনার জগতও।
এখানে হেগেল ও মার্কসের মধ্যে একটি অদ্ভুত সাদৃশ্য দেখা যায়। দুজনেই শিল্পকে ইতিহাসের বাইরে রাখেন না। কিন্তু ইতিহাসের অর্থ তাদের কাছে ভিন্ন।
হেগেলের ইতিহাস মূলত আত্মার আত্মপরিচয়ের দিকে অগ্রসর হওয়া। শিল্প সেই যাত্রার দৃশ্যমান অধ্যায়। মার্কসের ইতিহাস বস্তুগত জীবন, উৎপাদন, শ্রম ও সামাজিক সম্পর্কের সংঘাতের ইতিহাস। শিল্প সেই জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে নেই। কিন্তু শিল্প আবার তার নিজের সময়ের চেয়েও দীর্ঘজীবী হতে পারে। একটি সমাজ বিলীন হয়ে যায়, তার অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে যায়, কিন্তু তার শিল্প থেকে যেতে পারে—যেন ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের নিচে চাপা পড়ে থাকা একটি চিঠি।

এইখানে মার্কসের নন্দনতত্ত্ব সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তিনি সরল অর্থে বলেননি যে শিল্পের মূল্য কেবল শ্রেণিসমাজের প্রতিফলন। বরং তার প্রশ্ন ছিল: একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সমাজ কীভাবে এমন শিল্প সৃষ্টি করল, যা সেই সমাজের বিলুপ্তির পরও আমাদের স্পর্শ করে?
হেগেল জিজ্ঞেস করেন, শিল্পে সত্য কীভাবে প্রকাশিত হয়। মার্কস জিজ্ঞেস করেন, কোন ঐতিহাসিক জীবন সেই প্রকাশকে সম্ভব করেছিল। একজন তাকান শিল্পের ভেতরের আত্মার দিকে; অন্যজন শিল্পের পেছনের সমাজের দিকে। কিন্তু দুজনের পথ আবার এক জায়গায় এসে মিশে যায়—মানুষের স্বাধীনতার প্রশ্নে।
হেগেলের কাছে সত্যিকারের শিল্পে মানুষের স্বাধীন আত্মা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়ে ওঠে। তাই শিল্প নিছক প্রকৃতির অনুকরণ নয়। প্রকৃতি সুন্দর হতে পারে, কিন্তু শিল্পে মানুষের আত্মসচেতন স্বাধীনতা নিজের জন্য একটি রূপ তৈরি করে। মার্কসের কাছে মানুষও প্রকৃতির সঙ্গে কেবল নিষ্ক্রিয় সম্পর্ক রাখে না; শ্রমের মাধ্যমে সে পৃথিবীকে পরিবর্তন করে, আবার সেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নিজেকেও পরিবর্তন করে। ফলে শিল্পও এক ধরনের মানবিক উৎপাদন—কিন্তু এমন উৎপাদন, যেখানে মানুষের কল্পনা, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক অস্তিত্ব একসঙ্গে কাজ করে।
তবু তাদের পার্থক্যটি অমোচনীয়। হেগেল সৌন্দর্যের কেন্দ্রে রাখেন ‘আইডিয়া’; মার্ক্সের কাছে কোনো আইডিয়াকে বুঝতে হলে তার ঐতিহাসিক বস্তুগত শর্তের দিকে তাকাতে হয়। হেগেল শিল্পের ইতিহাসকে আত্মার ক্রমবিকাশ হিসেবে পড়েন; মার্কস আমাদের মনে করিয়ে দেন, আত্মারও একটি শরীর আছে—শ্রমিকের হাত, কারিগরের যন্ত্র, নগরের বাজার, জমির মালিকানা, পণ্য উৎপাদন, অবসর ও জীবিকার অসম বণ্টন।

তাই একটি গ্রিক মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে হেগেল হয়তো দেখবেন আত্মার শান্ত স্বাধীনতা। মার্কস দেখবেন সেই মূর্তির পেছনে থাকা সমাজের শ্রমবিভাগ, নাগরিকত্বের সীমা, দাসত্ব, উৎপাদনের কাঠামো—কিন্তু একই সঙ্গে এমন এক মানবিক রূপও দেখবেন, যার সৌন্দর্য সেই সমাজকে অতিক্রম করে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে।
এ যেন একটি আয়নার সামনে আরেকটি আয়না রাখা। প্রথম আয়নায় শিল্প নিজেকে দেখছে। দ্বিতীয় আয়নায় দেখা যাচ্ছে শিল্পকে তৈরি করা সমাজ। তারপর অসংখ্য প্রতিফলন: শিল্পী, দর্শক, শ্রম, স্মৃতি, শ্রেণি, আকাঙ্ক্ষা, ইতিহাস। কোথায় শুরু, কোথায় শেষ—বলা কঠিন।
সম্ভবত এ কারণেই হেগেল ও মার্কসকে পাশাপাশি পড়া মানে কোনো ‘সঠিক’ নন্দনতত্ত্ব বেছে নেওয়া নয়। বরং একই ছবির সামনে দুটি ভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়ানো।
হেগেল বলবেন— এই ছবির মধ্যে কোন সত্য নিজেকে দৃশ্যমান করেছে? মার্কস জিজ্ঞেস করবেন—কোন মানুষের জীবন, কোন সমাজ, কোন ইতিহাস এই সত্যকে এমন রূপ দিতে পেরেছে? আর আমাদের তৃতীয় প্রশ্নটি হতে পারে— কেন ছবিটি তার নিজের সময় পার হয়ে এখনও আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে?
এই প্রশ্নটির উত্তর হয়তো কোনো একক দর্শনে নেই। শিল্পের রহস্য সম্ভবত এখানেই—তার জন্মের শর্তকে সে অতিক্রম করতে পারে, কিন্তু কখনো পুরোপুরি ভুলে যায় না। গ্রিক মূর্তির শরীরে প্রাচীন গ্রিসের ছায়া থাকে; আধুনিক উপন্যাসে আধুনিক শহরের শব্দ; একটি কবিতায় কোনো হারানো অর্থনীতির ধুলো; একটি ছবিতে এমন কোনো ভবিষ্যৎ, যার নাম শিল্পী নিজেও জানতেন না।
হেগেল আমাদের বলেন, শিল্পে দৃশ্যমান সত্যকে পড়তে। মার্কস বলেন, সেই দৃশ্যমানতার পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসকে পড়তে। একজন গোলকধাঁধার কেন্দ্র খোঁজেন; অন্যজন খোঁজেন কে গোলকধাঁধাটি নির্মাণ করেছিল।
কিন্তু হয়তো শেষ পর্যন্ত গোলকধাঁধার কোনো কেন্দ্র নেই। আছে শুধু পথ—একটি মূর্তি থেকে একটি সমাজে, একটি সমাজ থেকে একটি মানুষের মুখে, একটি মানুষের মুখ থেকে আমাদের নিজের চোখে।
সেখানে দাঁড়িয়ে শিল্প আর অতীতের বস্তু থাকে না। সে হয়ে ওঠে একটি প্রশ্ন, যা বহু শতাব্দী পেরিয়ে এসে আমাদের জিজ্ঞেস করে— তুমি যখন আমাকে সুন্দর বলছ, তখন আসলে কী দেখছ—আমাকে, তোমাকে, নাকি সেই ইতিহাসকে, যার ভিতর দিয়ে আমরা দুজনেই এখানে এসে পৌঁছেছি?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









