স্যাটেলাইটনির্ভর ইন্টারনেটের বাজারে স্পেসএক্সের স্টারলিংকের সঙ্গে পাল্লা দিতে এগোচ্ছে অ্যামাজন। গত সপ্তাহে প্রথমবারের মতো একটি এয়ারলাইনকে তাদের ‘প্রজেক্ট কুইপার’ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে উড়োজাহাজে ওয়াই-ফাই দেওয়ার চুক্তি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এয়ারলাইনটি হলো জেটব্লু। ২০২৭ সাল থেকে নির্বাচিত উড়োজাহাজে কুইপার ব্যবহার করে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট দেওয়া হবে, যা জেটব্লুর ফ্লাই-ফাই ইন-ফ্লাইট ওয়াই-ফাই সেবাকে উন্নত করবে।
তবে স্টারলিংকের তুলনায় কুইপার এখনো অনেক পিছিয়ে। ভার্জিন আটলান্টিক, ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ও এয়ার ফ্রান্সের মতো বড় এয়ারলাইন ইতিমধ্যে স্টারলিংকের গ্রাহক। এ বাজারে ইউটেলস্যাটের ওয়ানওয়েব, চীনের স্পেসস্যাট ও ভিয়াস্যাটও প্রতিযোগিতা করছে।
কুইপারের কক্ষপথে এখন মাত্র ১০২টি স্যাটেলাইট। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৬০০টি স্যাটেলাইট স্থাপনের শর্ত দিয়েছে। অ্যামাজনের নিজস্ব লক্ষ্য ২০২৯ সালের জুলাইয়ের মধ্যে ৩ হাজার ২৩৬টি স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠানো। বিপরীতে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্টারলিংকের কক্ষপথে ছিল ৮ হাজার ৩৯৩টি স্যাটেলাইট। এফসিসি প্রাথমিক অনুমোদনের অধীনে স্টারলিংককে মোট ১২ হাজার স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের অনুমতি দিয়েছে।
স্টারলিংকের এগিয়ে থাকার বড় কারণ স্পেসএক্সের উৎক্ষেপণ সক্ষমতা। আগস্টের মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠানটি ১০০টি ফ্যালকন ৯ উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করে। এর মধ্যে ৭২টি উৎক্ষেপণে স্টারলিংকের স্যাটেলাইট বহন করা হয়।
অন্যদিকে অ্যামাজনের মহাকাশ কোম্পানি ব্লু অরিজিনের ভারী পেলোড বহনে সক্ষম নিউ গ্লেন রকেট প্রথম উৎক্ষেপণ করে এ বছরের জানুয়ারিতে। কুইপার উৎক্ষেপণের জন্য অ্যামাজন ২০২২ সালেই নিউ গ্লেনের ১২টি উৎক্ষেপণ বুক করেছিল এবং প্রয়োজনে আরও ১৫টির সুযোগ রেখেছিল। কুইপারের প্রথম দফার কিছু স্যাটেলাইট ইউনাইটেড লঞ্চ অ্যালায়েন্সের অ্যাটলাস ফাইভ ও স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটেও উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৮টি উৎক্ষেপণের জন্য আরিয়েনস্পেসের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে অ্যামাজনের; এর ১৬টি হবে আরিয়ানে ৬৪-এর উন্নত সংস্করণে।

স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ঘিরে প্রতিযোগিতা বাড়ার কারণও স্পষ্ট। পৃথিবীর কক্ষপথ নতুন যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের মার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে বিভিন্ন স্যাটেলাইট অপারেটর প্রায় ৭০ হাজার নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির গ্রেটার চায়না প্রযুক্তি গবেষণার প্রধান অ্যালেন চ্যাং মনে করেন, ভবিষ্যতের ৬জি যোগাযোগব্যবস্থায় স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বাণিজ্যিকভাবে ৬জি চালু হতে এখনো অন্তত পাঁচ বছর লাগতে পারে। তবে নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথের স্যাটেলাইট সেবা বাড়লে প্রত্যন্ত, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও কম জনবসতিপূর্ণ এলাকার মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বাড়তে পারে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ, ইন্টারনেটের বাইরে।
অ্যামাজন ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ কুইপার গ্রাহকসেবা চালুর পরিকল্পনা করেছে। একই সময়ে স্টারলিংকও সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। চলতি সপ্তাহে স্পেসএক্স প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে ইকোস্টারের ওয়্যারলেস স্পেকট্রাম লাইসেন্স কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এর লক্ষ্য স্টারলিংকের ৫জি ব্যবসা শক্তিশালী করা। স্পেসএক্সের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা গুইন শটওয়েল বলেছেন, চুক্তিটি বিশ্বজুড়ে মোবাইল নেটওয়ার্কের ‘ডেড জোন’ কমানোর আরেকটি পদক্ষেপ।
তবে মহাকাশ প্রতিযোগিতা শুধু স্যাটেলাইট ইন্টারনেটেই সীমাবদ্ধ নয়। নাসার ভারী ও ব্যয়বহুল এসএলএস রকেটের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিটি উৎক্ষেপণে এর খরচ প্রায় ৪০০ কোটি ডলার।
নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, মহাকাশযাত্রা স্টেম কোষের বয়স বাড়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারে। নভোচারীদের হাড়ের ঘনত্ব কমা ও জিনের কার্যক্রমে পরিবর্তনের পাশাপাশি গবেষকদের ধারণা, মহাকাশে মানুষের বার্ধক্যপ্রক্রিয়া পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ১০ গুণ দ্রুত হতে পারে।

মঙ্গলে জীবনের সন্ধানেও নতুন তথ্য এসেছে। নাসার পারসিভিয়ারেন্স রোভার ‘চেয়াভা ফলস’ নামের একটি শিলা থেকে সংগ্রহ করা নমুনায় সম্ভাব্য বায়োসিগনেচার পাওয়া গেছে। তবে এগুলো অতীতে মঙ্গলে জীবনের অস্তিত্বের প্রমাণ নয়, কেবল সম্ভাব্য ইঙ্গিত।
সূর্যের ক্ষেত্রেও নতুন তথ্য মিলেছে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সোলার অরবিটার সৌরঝড় থেকে নির্গত অত্যন্ত দ্রুতগতির ইলেকট্রনের দুটি উৎস শনাক্ত করেছে—সৌর অগ্ন্যুৎপাত ও করোনাল মাস ইজেকশন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মহাকাশ প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। নাসার সাবেক প্রধান জিম ব্রাইডেনস্টাইন বলেছেন, স্পেসএক্সের স্টারশিপ কর্মসূচির ধারাবাহিক বিলম্ব যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের মহাকাশ কর্মসূচির তুলনায় পিছিয়ে দিচ্ছে। চাঁদে আবার মার্কিন নভোচারী পাঠানোর আর্টেমিস কর্মসূচিতে স্টারশিপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের অবসর নেওয়ার সময়সীমা দশকের শেষ দিকে। এরপর নাসা একাধিক নতুন মানববাহী মহাকাশ স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা করছে। যোগাযোগব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসছে। মার্কিন স্পেস ফোর্স জিওস্টেশনারি কক্ষপথে ছোট যোগাযোগ স্যাটেলাইট ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে ‘প্রোটেক্টেড ট্যাকটিক্যাল স্যাটকম-গ্লোবাল’ বা পিটিএস-জি কর্মসূচির অধীনে।
এদিকে স্পেসএক্সের ড্রাগন কার্গো ক্যাপসুল আইএসএসের কক্ষপথ কিছুটা উঁচু করার একটি পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। সাধারণত রাশিয়ার প্রগ্রেস মহাকাশযান এ কাজ করে। পৃথিবীর মহাকর্ষের কারণে আইএসএস ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে বলে নির্দিষ্ট সময় পরপর এর কক্ষপথ উঁচু করতে হয়।
নাসার মহাকাশ কর্মসূচিতেও চীনা নাগরিকদের অংশগ্রহণ সীমিত করা হয়েছে, যদিও তাদের মার্কিন ভিসা রয়েছে। চাঁদে ফেরার প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মহাকাশ কর্মসূচির পার্থক্যও কৌশলগত ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মহাকাশ খাতেও চলছে নতুন বিনিয়োগ। স্পেসএক্সের ইকোস্টার চুক্তির পাশাপাশি ইতালির মহাকাশ প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যাস্ট্রাডাইন মহাকাশে ব্যবহারের জন্য হালকা সৌরপ্যানেল তৈরিতে ২০ লাখ ইউরো বা প্রায় ২৩ লাখ ৪০ হাজার ডলারের বীজ বিনিয়োগ পেয়েছে। প্রিমো স্পেস ফান্ডের মাধ্যমে প্রিমো ক্যাপিটাল এই বিনিয়োগের নেতৃত্ব দিয়েছে।
কানাডার নর্ডস্পেসও তাইগা রকেট উৎক্ষেপণের নতুন প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি উৎক্ষেপণ সফল হলে এটি হতে পারে কানাডার প্রথম বাণিজ্যিক মহাকাশ উৎক্ষেপণ। এর আগে আগস্টে রকেটটির উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হয়েছিল।
মহাকাশের নতুন প্রতিযোগিতা এখন শুধু রকেট উৎক্ষেপণের সক্ষমতা নিয়ে নয়। পৃথিবীর চারপাশে তৈরি হতে থাকা হাজার হাজার স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কে যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তুলবে, প্রত্যন্ত অঞ্চলকে ইন্টারনেটের আওতায় আনবে এবং নতুন বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরি করবে—লড়াই এখন সেই প্রশ্নকে ঘিরে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









