ইসরায়েলের নির্বাচনের সামনে এখন একটি সরল কিন্তু গভীর প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে— দেশের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কতটা জায়গা পাবে?
২৭ অক্টোবরের পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি দেশটির দুটি প্রধান আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক জোটকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্তটি বহাল থাকলে নেসেটে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের একটি বড় অংশ নির্বাচনের বাইরে চলে যাবে।
কমিটি শুধু দল দুটিকেই নয়, হাদাশ দলের ইহুদি রাজনীতিক ওফের কাসিফ এবং ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী দল বালাদের নেতা সামি আবু শেহাদেহকেও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করেছে।
তবে এখানেই বিষয়টির শেষ নয়। সুপ্রিম কোর্ট আগামী সপ্তাহে এসব সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করবে। অতীতের কয়েকটি নির্বাচনে আদালত আরব দল ও প্রার্থীদের নিষিদ্ধ করার নির্বাচন কমিটির সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে। ফলে এবারও শেষ সিদ্ধান্ত আদালতের হাতে।
যে দুটি দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাদের একটি জয়েন্ট লিস্ট। এতে রয়েছে হাদাশ, বালাদ ও তাআল। অন্যটি রাআম, যা ইউনাইটেড আরব লিস্ট নামেও পরিচিত। দুটি দলই মূলত ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটের ওপর নির্ভরশীল। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তাঁরা।
জয়েন্ট লিস্টে থাকা হাদাশ একটি বামপন্থী দল, যেখানে ইহুদি ও আরব—দুই সম্প্রদায়ের সদস্য রয়েছেন। তাআল মূলত ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে। বালাদ সব নাগরিকের সমান অধিকারের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেয়।
এই দলগুলোর একসঙ্গে নির্বাচন করার একটি বাস্তব কারণও আছে। ইসরায়েলের নির্বাচনে নেসেটে ঢুকতে একটি দল বা জোটকে জাতীয় ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হয়। ছোট দলগুলো আলাদাভাবে নির্বাচন করলে কেউ কেউ সেই সীমা পার হতে না-ও পারে। একসঙ্গে গেলে ভোট ভাগ হওয়ার ঝুঁকি কমে।
বর্তমান ১২০ আসনের নেসেটে হাদাশ-তাআল জোটের পাঁচটি আসন রয়েছে। এর মধ্যে তিনজন হাদাশের এবং দুজন তাআলের। বালাদের কোনো আসন নেই।
রাআম এবার আলাদাভাবে নির্বাচন করছে। দলটির নেতা মানসুর আব্বাস। অন্য আরব দলগুলোর তুলনায় রাআম ইসরায়েলের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আরব জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি অর্থ ও সেবা আদায়ের ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলে যে জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল, রাআম তার অংশও হয়েছিল। বর্তমান নেসেটে দলটির পাঁচটি আসন রয়েছে।
এই দলগুলোকে কেন বাদ দেওয়া হলো, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
ডানপন্থী দল লিকুদ ও ওতজমা ইয়েহুদিতের আবেদনের পর নির্বাচন কমিটি বিষয়টি বিবেচনা করে। অভিযোগ ছিল, সংশ্লিষ্ট দল ও প্রার্থীরা ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করেন না, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামকে সমর্থন করেন অথবা বর্ণবাদে উসকানি দেন।
রাআমকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব ১৮-৫ ভোটে পাস হয়। একই ব্যবধানে জয়েন্ট লিস্টকেও বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কাসিফের বিরুদ্ধে ভোট ছিল ১৮-৫ এবং আবু শেহাদেহর বিরুদ্ধে ৩১-৪।
কিন্তু ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারা রাআম, জয়েন্ট লিস্ট ও কাসিফকে অযোগ্য ঘোষণার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এসব ক্ষেত্রে যে প্রমাণ দেওয়া হয়েছে, তা দল বা প্রার্থীদের নিষিদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত মানদণ্ড পূরণ করে না।

আবু শেহাদেহর বিষয়টি কিছুটা আলাদা। তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগের একটি অংশ ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত একটি নিবন্ধকে ঘিরে। হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার পরদিন আরব৪৮ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখায় তিনি হামলাটিকে “সামরিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের দাবি, এই ভাষা সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখা যেতে পারে। আবু শেহাদেহ সেই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের বিরোধী এবং শান্তি, ন্যায়বিচার ও সমতার জন্য রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগ্রামের পক্ষে।
এখানে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে—একই নির্বাচনে অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ক্ষেত্রে মানদণ্ড কি একই?
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের দুই কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী—জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ—এর দলকে নিষিদ্ধ করার আবেদনও করা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিটি তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
বেন-গভিরের ওতজমা ইয়েহুদিত এবং স্মোটরিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা ধরে রেখেছে। দুজনই গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়া এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে তাঁদের কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যের কারণে দুজনের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, এই দুই দলকে নিষিদ্ধ করার আবেদনের পক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ভিত্তি পাওয়া যায়নি। বিরোধী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়াইর গোলান অবশ্য বেন-গভিরকেও নির্বাচনে অযোগ্য করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য রয়েছেন। গাজায় কথিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। ২০২০ সালে শুরু হওয়া দুর্নীতির মামলাটিও এখনো চলছে। নেতানিয়াহু এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এই বৈপরীত্যই বিতর্কটিকে আরও বড় করেছে। একদিকে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে পুরোনো বক্তব্য, রাজনৈতিক অবস্থান বা নির্দিষ্ট লেখাকে প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হচ্ছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া ডানপন্থী দলগুলো নির্বাচনে থাকার সুযোগ পাচ্ছে।
তবে এ দুটি পরিস্থিতি আইনগতভাবে একই কি না, তার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আদালতের। নির্বাচন কমিটির রাজনৈতিক ভোট এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনি পর্যালোচনার মধ্যে ব্যবধানটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ফিলিস্তিনি মানবাধিকারকর্মী উবাই আল-আবুদি এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ইসরায়েলের রাজনৈতিক কাঠামোয় ফিলিস্তিনি নাগরিকদের এখনো একটি জনমিতিক হুমকি হিসেবে দেখা হয়। তবে এটি তাঁর রাজনৈতিক ও মানবাধিকারভিত্তিক মূল্যায়ন; আদালত বা নির্বাচন কমিটির চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত নয়।
আরব দল ও প্রার্থীদের নির্বাচনে বাধা দেওয়ার ঘটনা ইসরায়েলে নতুন নয়। আদালাহ নামের ফিলিস্তিনি আইনি অধিকার সংগঠন ২০০৩, ২০১৩, ২০১৫, ২০২০ ও ২০২২ সালের নির্বাচনে এ ধরনের চ্যালেঞ্জের নথি সংরক্ষণ করেছে। বেশ কয়েকবার সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিটির সিদ্ধান্ত বাতিলও করেছে।
এবারের ঘটনাকে আলাদা করে দেখার একটি কারণ হলো—দুটি প্রধান আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ তালিকাই একসঙ্গে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে। সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা অবশ্য অন্য দলকে ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু তাঁদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক তালিকা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না।
শেষ পর্যন্ত তাই বিষয়টি শুধু চারজন প্রার্থী বা দুটি রাজনৈতিক জোটের প্রশ্ন হয়ে থাকে না। এটি ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সীমা কোথায়, সেই প্রশ্নও সামনে আনে।
এখন তাকিয়ে থাকতে হবে সুপ্রিম কোর্টের দিকে। অতীতের রায়গুলো দেখায়, নির্বাচন কমিটির সিদ্ধান্তই সবসময় শেষ কথা নয়। কিন্তু বর্তমান সিদ্ধান্তগুলোতে আদালত কী করবে, তা এখনো অজানা।
নির্বাচনের আগে এই অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে স্পষ্ট বাস্তবতা। ব্যালটের কাগজে কে থাকবেন, শেষ পর্যন্ত সেই তালিকা হয়তো আদালতের কক্ষেই নির্ধারিত হবে।
কাওলান ম্যাগি, সাংবাদিক ও ফিচার লেখক। তিনি অস্ত্রশিল্প, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং মানবাধিকার নিয়ে লিখেন। বর্তমান লেখাটি আল জাজিরা, শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









