অর্থনীতির উত্থান-পতন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর স্থিতিশীলতা নীতি প্রণয়নের পথ সুগম করেছেন দুই অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড। এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তারা। তাদের উন্নত সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেল অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা এবং অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধির চাপ নিয়ন্ত্রণে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে আরও কার্যকর নীতি গ্রহণে সহায়তা করছে।
সুইডিশ রয়্যাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের তথ্য অনুযায়ী, নতুন এই মডেলগুলোর ভিত্তিতে সঠিক সময়ে রাজস্ব ও মুদ্রানীতি গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনীতির উত্থান-পতনের তীব্রতা কমানো সম্ভব।
অর্থনীতিতে মন্দা ও প্রবৃদ্ধির পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন একটি পরিচিত বাস্তবতা। প্রায় এক শতাব্দী আগে অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনসের তত্ত্বের বিকাশের পর থেকে এসব ওঠানামা মোকাবিলায় স্থিতিশীলতা নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। অর্থনৈতিক মন্দার সময় সুদের হার কমানো ও বাজেট ঘাটতি বাড়ানোর মাধ্যমে চাহিদা ও উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে, অর্থনীতি অতিরিক্ত গতিতে বাড়তে থাকলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে বিপরীতধর্মী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
তবে ১৯৭০-এর দশকে তেলের সংকটের সময় প্রচলিত কেইনসীয় মডেলগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসব মডেলের ভিত্তিতে নেওয়া নীতি অনেক ক্ষেত্রে বেকারত্ব কমাতে ব্যর্থ হয়; বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পশ্চিমা দেশগুলোকে এক দশক ধরে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ বেকারত্ব ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নীতির কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেল পুনর্গঠনের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা নীতিকে নতুন ভিত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আগে যেখানে মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ও ভোগের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোর পরিসংখ্যানগত সম্পর্কের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো, সেখানে তারা মডেল নির্মাণে ক্ষুদ্র অর্থনীতির ভিত্তিকে গুরুত্ব দেন।
এই পদ্ধতিতে ব্যক্তি ও পরিবারের পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে নিজেদের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে, তা বিশ্লেষণ করা হয়। সঞ্চয়, ভোগ, বিনিয়োগ ও পণ্যের মূল্য নির্ধারণের মতো সিদ্ধান্ত অর্থনীতির সামগ্রিক গতিপথে কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা এসব মডেলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নতুন মডেলগুলোর অন্যতম ভিত্তি হলো, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের অর্থনৈতিক নীতির পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিলে মানুষের প্রত্যাশা ও সিদ্ধান্তে প্রভাব পড়তে পারে। এর মাধ্যমে অর্থনীতিকে কাঙ্ক্ষিত পথে পরিচালিত করার সুযোগ তৈরি হয়।
এই মডেলগুলো চালু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছে সুইডিশ রয়্যাল একাডেমি অব সায়েন্সেস।
অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান জন হাসলার বলেন, “বিজয়ীদের কাজ এমন একটি স্থিতিশীল তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছে, যার ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার মডেল ব্যবহার করছে। জ্বালানি সংকট কিংবা পরিবারের ভোগব্যয়ের আকস্মিক পরিবর্তনের মতো অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় এসব মডেল আমাদের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করেছে।”
রবার্ট ই. হলের জন্ম ১৯৪৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টোতে। তিনি ১৯৬৭ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
অন্যদিকে, মাইকেল উডফোর্ডের জন্ম ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের চিকোপিতে। তিনি ১৯৮৩ সালে এমআইটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
দুই অর্থনীতিবিদের মধ্যে পুরস্কারের ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হবে।
সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুয়েরিয়েস রিক্সব্যাংকের উদ্যোগে প্রবর্তিত অর্থনীতিতে এই পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক নাম ‘আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতিতে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে সুয়েরিয়েস রিক্সব্যাংক পুরস্কার’।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









