প্রাচীনকাল থেকেই ব্যাংকব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ছিল। যুগ যুগ ধরে তা বিদ্যমান থাকলেও আমাদের দেশে সম্প্রতি সেই আস্থায় চিড় ধরেছে। ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। আমানতকারীরা নিজেদের জমানো টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। অপরদিকে, ঋণখেলাপিরা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে দেশ-বিদেশে আলিশান জীবনযাপন করছেন। দেশে থাকলেও তাঁরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাঁরা শাস্তির আওতায় না এসে বা তিরস্কৃত না হয়ে বরং বারবার পুরস্কৃত হচ্ছেন। বারবার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে, সময় বাড়ানো হচ্ছে। ফলে, ঋণগ্রহীতারা ঋণ পরিশোধে আগ্রহী হচ্ছেন না, সুযোগ গ্রহণ করে সময় ক্ষেপণ করছেন। সুতরাং, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের যে দৈন্যদশা, তা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী?
বাংলাদেশ জনসংখ্যায় বিশ্বে অষ্টম স্থান অধিকার করলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে তৈরি তালিকায় বিশ্বের ৫০টি বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৫তম। অথচ ২০১৯ ও ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র বলছে, বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল ৩২৩ বিলিয়ন ডলার, ভারতের দুই হাজার ৬৬০ বিলিয়ন ডলার, থাইল্যান্ডের ৫০০ বিলিয়ন ডলার এবং মালয়েশিয়ার ৩৩৭ বিলিয়ন ডলার। দেশগুলোর লাইসেন্সপ্রাপ্ত দেশীয় ব্যাংকের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে বাংলাদেশে ৫২টি, ভারতে ৩৪টি, থাইল্যান্ডে ১৮টি এবং মালয়েশিয়ায় আটটি।
আবার বিশাল অর্থনীতির দেশ চীনে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা মাত্র ১২টি। অথচ বাংলাদেশে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে এবং রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোর অবস্থা এমন যে, বিশ্বের ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও কার্যক্রমের ভিত্তিতে প্রথমবারের মতো ‘ওয়ার্ল্ডস টপ পারফর্মিং ব্যাংকস ২০২৬’ শীর্ষক তালিকা প্রকাশ করে মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস। বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিসটার সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এ তালিকা তৈরি করা হয়। এতে ৮৯টি দেশের ৫০০টি ব্যাংক স্থান পায়। এই তালিকায় বাংলাদেশের মাত্র একটি ব্যাংক স্থান পেয়েছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
বর্তমান সময়ে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৬১টি। অর্থাৎ, পূর্বে উল্লেখিত সময়ের চেয়েও আরো নয়টি ব্যাংক বেশি হয়েছে। বিপরীত দিকে দেখা যাচ্ছে, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ সালে প্রকাশিত ইত্তেফাকের একটি প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ‘বিশ্বে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই মাত্র আটটি দেশের নাগরিক। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘গ্লোবাল ফিনডেক্স ডেটাবেজ ২০২৫’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, সারা বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব নেই। এই বিশাল জনসংখ্যার ৫৩ শতাংশ (প্রায় ৬৫ কোটি) বাস করেন বাংলাদেশসহ মাত্র আটটি দেশে।’ অথচ বিশ্বে অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে এবং জনসংখ্যায় অগ্রসর হলেও সেসব দেশে বাংলাদেশের চেয়ে ব্যাংকের সংখ্যা কম রয়েছে। তাহলে বাংলাদেশে এত ব্যাংকের প্রয়োজন কেন? আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোর প্রত্যন্ত অঞ্চলের বা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকেও ব্যাংকিং সেবার অন্তর্ভুক্ত করার কথা ছিল। এই লক্ষ্যেই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের উৎপত্তি হয়। কিন্তু তা কতটুকু ফলপ্রসূ হয়েছে? যদি ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধি না করে ব্যাংকগুলোকে শাখার সংখ্যা বাড়াতে বাধ্য করা হতো, তাহলে অবশ্যই প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাংকগুলোর শাখা বিদ্যমান থাকত এবং দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষও মূল ব্যাংকিং সেবার অন্তর্ভুক্ত হতো।
ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে শহরকেন্দ্রিক শাখাগুলো বেড়েছে। বেশিরভাগ শহরেই ব্যাংকপাড়া নামে পরিচিত জায়গা রয়েছে। ওইসব ব্যাংকপাড়ায় প্রতিটি ভবনে ব্যাংকের শাখা লক্ষ্য করা যাবে। অথচ অধিকাংশ উপজেলা পর্যায়ে এখনো পাঁচ থেকে ছয়টির বেশি ব্যাংকের শাখা নেই। অর্থাৎ, উপজেলাগুলোতে অনেক মানুষই আর্থিক সেবার বাইরে রয়েছে। ব্যাংকগুলো যদি উপজেলা পর্যায়ে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত থাকত, তবে গ্রামীণ অর্থনীতি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিশাল এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আসত এবং করপোরেট খাতে এত ঝুঁকি তৈরি হতো না। উপরন্তু, দেশের অর্থনীতির সমভাবে উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হতো। কিন্তু আমাদের দেশে হয়েছে উল্টো। ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও হাতে গোনা দু-একটি বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের শাখা দুই শতাধিকের উপর। অন্যদিকে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম- এই দুই শহরেই ব্যাংকগুলোর ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ শাখা বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং, উপজেলা পর্যায়ে বেসরকারি ব্যাংকের শাখা নেই বললেই চলে। তাহলে ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধি করে লাভটা কী হলো?
আবার, ‘দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি ব্যাংক পুঞ্জীভূত লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। গত মার্চ পর্যন্ত হিসাবে ব্যাংকগুলোর পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা’ (প্রথম আলো, ৫ অক্টোবর, ২০২৬)। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮৫ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে ১৫টি ব্যাংককে। অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকিং খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছরে জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। এটি একজন ব্যাংকারের কাছে আশাব্যঞ্জক হলেও সাধারণ নাগরিক হিসেবে ঠিক ততটাই হতাশাজনক।
জনগণের দেওয়া ভ্যাট বা কর থেকে জনগণের উন্নয়ন খাতে ব্যয় না করে যারা ব্যাংকিং খাত থেকে অর্থ লুট করে বিদেশে পাচার করল, তাদের সহায়তা করার জন্য এমন উদ্যোগ কখনোই সুখকর হবে না। জনগণ রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য আয়কর দিয়ে থাকেন। সেই টাকা থেকে ব্যাংকিং খাতকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ভর্তুকি দেওয়াটা কতটা যুক্তিসংগত হবে, তা ভাববার বিষয় রয়েছে। অথচ ঋণ আদায় করে অথবা বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে এনে ব্যাংকিং খাতের উন্নয়ন ঘটানোই হবে মূল লক্ষ্য। খেলাপি ঋণধারীদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া আরো কঠোর হওয়া উচিত। যদি ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে বারবার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে ওই ঋণ কখনোই আদায় হবে না।
রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সমীহ করতেই হয়। কিন্তু সিদ্ধান্তগুলো যদি সমাজের উচ্চশ্রেণির সুবিধা দেওয়ার জন্য হয়, তাহলে করদাতা ও সাধারণ জনগণের জন্য তা বড়ই হতাশার, যেখানে কর ও ভ্যাট রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য আদায় করা হয়। বিপরীত দিকে দেখা যায়, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কারণে বা আইনের ফাঁকগুলো ব্যবহার করে বারবার রাঘববোয়ালরা সুবিধা গ্রহণ করছেন, যা রাষ্ট্রের জন্য সমীচীন নয়। সুতরাং, রাষ্ট্রের সামষ্টিক অর্থনীতির দিক বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে, ব্যাংকগুলোকে শাখা বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে প্রসার ঘটিয়ে প্রতিটি নাগরিককে ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে এসে ব্যাংকিং খাতকে আরো সমৃদ্ধ করা উচিত। যেখানে সবাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসবে এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নে প্রয়োজনে কর প্রদান করবে। ব্যাংকিং খাত লোকসান কাটিয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে সামগ্রিকভাবে ভূমিকা রাখবে। এটাই সবার কাম্য।
লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









