যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বন্ধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে সোমবার তেহরানে পৌঁছেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর এটিই তার প্রথম ইরান সফর।
তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও চলমান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেন লাভরভ। আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তাহীনতা ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের ফল। আঞ্চলিক সমস্যার সমাধানে কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
লাভরভ জানান, ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার ২০ বছর মেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি ২ অক্টোবর কার্যকর হয়েছে। যুদ্ধের কারণে বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছেড়ে যাওয়া রুশ বিশেষজ্ঞরা ধীরে ধীরে ফিরবেন। সোমবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গেও তার বৈঠকের কথা রয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলো রাশিয়াকে তেহরানের ওপর প্রভাব কাজে লাগিয়ে সংলাপ শুরু এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছে।
জিসিসির মহাসচিব জাসেম আল-বুদাইউই বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর সদস্যদেশগুলো ইরানের সাত হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে। পরিষদের ছয় সদস্যদেশ ভবিষ্যৎ আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।
ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক নিকিতা স্মাগিনের মতে, লাভরভের সফরের লক্ষ্য এ অঞ্চলের সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাশিয়ার অবস্থান শক্তিশালী করা। একই সময়ে উপসাগরীয় দেশ ও ইরানে সফর করে মস্কো ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের বার্তা দিতে চায়। বাহরাইনের মানামায় জিসিসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে লাভরভ বলেন, মধ্যপ্রাচ্য আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। রাশিয়া আঞ্চলিক দেশগুলোর পাশাপাশি রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগ মিলিয়ে সম্মিলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়তে চায়। এতে সমুদ্রপথে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থাকবে। ইরানের হামলার শিকার ইরাক ও জর্ডানকেও এ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে উত্তেজনা কমানোর কাঠামো হিসেবে সমর্থন করেছেন লাভরভ। পরে সমঝোতাটি ভেঙে পড়ে। ইরান আগের সমঝোতায় ফিরতে এবং হরমুজ প্রণালির জলসীমায় নৌ চলাচল পরিচালনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে চূড়ান্ত করা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের মেনে নেওয়া চায়। তবে ওয়াশিংটন এর বিরোধিতা করে নিজস্ব নৌপথ প্রতিষ্ঠা করেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়া ও চীন স্যাটেলাইটের ছবি এবং অস্ত্রের যন্ত্রাংশ দিয়ে ইরানকে সহায়তা করছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে এ দাবি নাকচ করে বলেন, ইরানকে সহায়তা করলে মস্কো ও বেইজিংয়ের অনেক কিছু হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞায় ছাড়ও দিয়েছে।
স্মাগিন বলেন, ইরান যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য লাভ ও ঝুঁকি—দুই-ই তৈরি করেছে। তেলের দাম বাড়ায় মস্কো লাভবান হচ্ছে। আবার চীনে ইরানের তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশটিকে বেশি দামে রাশিয়ার তেল কিনতে হচ্ছে। তবে যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়লে তার পরিণতি অনিশ্চিত হওয়ায় রাশিয়া সংঘাতের তীব্রতা বাড়াতে চায় না।
তার মতে, কাস্পিয়ান সাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও সীমিত সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে রাশিয়া ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াবে। এর লক্ষ্য শুধু অর্থনৈতিক লাভ নয়, বরং তেহরান ও আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি।
এদিকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের হামলা অব্যাহত রয়েছে। ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ‘শিগগিরই কাজ শেষ করার’ হুমকি দিয়েছেন। জবাবে আরাগচি বলেন, ‘আমাদেরও কিছু অসমাপ্ত কাজ রয়েছে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









