যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা হলে শুধু পাল্টা আঘাত নয়, আক্রমণাত্মক সামরিক পদক্ষেপও নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্থবির আলোচনার মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে।
বুধবার (২২ অক্টোবর) আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি জানান, ইরান তার প্রতিরক্ষানীতি বদলে আক্রমণাত্মক ও অসম যুদ্ধকৌশলের দিকে যাচ্ছে। আগে কোনো দেশ হামলা করলে পাল্টা জবাব দেওয়ার কথা বলা হতো। এখন হামলার জবাবের পাশাপাশি আক্রমণ চালানোর কথাও বিবেচনা করা হবে। তবে কোন দেশকে লক্ষ্য করে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
মোহেবির দাবি, ২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দেড় গুণ বেড়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা, ধ্বংসক্ষমতা ও নির্ভুলতাও উন্নত হয়েছে। নতুন একটি শক্তিশালী অস্ত্র প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। আইআরজিসির নৌবাহিনীর দাবি, অবৈধভাবে তেল স্থানান্তরের অভিযোগে চারটি জাহাজে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরও তিনটি জাহাজ প্রণালির পশ্চিমে মাইনে আঘাত পেয়েছে বলে জানানো হয়। এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সংঘাত জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কেন নীতি বদলাচ্ছে ইরান?
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলাই তেহরানের নতুন কৌশলের লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ গবেষক নেগার মোর্তাজাভি আল জাজিরাকে বলেন, আগের পাল্টা হামলার কৌশল ইরানকে বারবার আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারেনি। তাই এবার সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষতির পরিধি বাড়াতে চাইছে দেশটি।
প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারায় ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাবকে কাজে লাগাতে চাইছে ইরান। এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। জ্বালানি, পরিবহন, বিমা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র কী বলছে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনা এখন আর চলছে না। শিগগিরই কোনো একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এখনই যুদ্ধ শেষ করতে পারে, তবে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান চায়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করার পাশাপাশি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ থেকে সরে আসতে হবে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির আওতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার রয়েছে বলে দাবি করছে তেহরান। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিনিময়ে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং জব্দ করা সম্পদ ছাড়ের প্রস্তাবও দিয়েছে ইরান।
এদিকে হুতিদের হামলার পর সৌদি আরবে মার্কিন দূতাবাসের জরুরি নয় এমন কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরানের সরকার পরিবর্তনের বিষয়ে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

যুদ্ধ কি আসন্ন?
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার সম্ভাবনা বাড়ছে। মোর্তাজাভির মতে, দুই পক্ষই সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে কূটনীতির পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
আরব সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক রামি খুরি মনে করেন, নতুন হামলায় ইরানের বিদ্যুৎব্যবস্থা, পরিবহন অবকাঠামো, সেতু ও জরুরি সেবাকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। তবে বড় ধরনের সামরিক আক্রমণ মোকাবিলা করে ইরান কতটা পাল্টা ক্ষতি করতে পারবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান হলে তেহরান সেটিই পছন্দ করবে। তবে যুদ্ধ চলতে থাকলে জবাব দেওয়ার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ এবং দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তবে নতুন যুদ্ধ শুরু হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









