কবি, অনুবাদক ও সাংবাদিক রথো রাফি মারা গেছেন।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫১ বছর। তার ভাই এহতেশাম মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গত সোমবার থেকে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন ছিলেন রথো রাফি। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ও কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
বাংলা কবিতায় রথো রাফি ছিলেন স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। নিরাভরণ ও মিতভাষী কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব কাব্যভাষা। দীর্ঘদিন বই প্রকাশের আড়ালে থেকেও সমকালীন কবিতার পরিসরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য হারাল এক স্বতন্ত্র কবি ও অনুবাদককে। রেখে গেছেন তার একমাত্র কাব্যগ্রন্থ অক্ষর ও বালির পৃথিবী, বিশ্বসাহিত্যের নানা কবির কবিতার অনুবাদ এবং নিবিড় পাঠকসমাজ।
১৯৭৫ সালের ৩১ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় জন্ম রথো রাফির। পেশায় সাংবাদিক হলেও তার প্রধান পরিচয় ছিল কবি হিসেবে। রসায়নশাস্ত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিলেও কবিতা ও বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ তার মনন ও সৃজনশীলতার বড় অংশজুড়ে ছিল।
নব্বইয়ের দশকে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর তিনি দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন ছোটকাগজ আন্দোলন ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী ছোটকাগজ গাণ্ডীব’র নিয়মিত লেখক ছিলেন তিনি। সাময়িকীটির ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু সময়েও এই সম্পর্ক অটুট ছিল।
রথো রাফির সাহিত্যিক জীবনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল বই প্রকাশে অনীহা। দীর্ঘদিন কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ না করেও সমকালীন কবিতায় নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন তিনি। অবশেষে ২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম ও একমাত্র কাব্যগ্রন্থ অক্ষর ও বালির পৃথিবী। ৪৩২ পৃষ্ঠার বইটিতে সংকলিত হয়েছে দুই শতাধিক কবিতা। ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুই দশকে লেখা কবিতাগুলো নিয়ে বইটি প্রকাশিত হয়।
তার কবিতার বিষয়বৈচিত্র্য ছিল বিস্তৃত। মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর দর্শন থেকে শুরু করে কৃষ্ণের বাঁশি কিংবা যিশুর ক্রুশযাত্রা—বিভিন্ন ধর্মীয়, দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ উঠে এসেছে তার কবিতায়। প্রচলিত আবেগের প্রকাশের বাইরে গিয়ে চিন্তার গভীরতা নির্মাণের চেষ্টা ছিল তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কবিতার পাশাপাশি অনুবাদক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন রথো রাফি। এরিখ ফ্রাইড, চার্লস বুকোস্কি, মুহাম্মদ আল-মাঘুত ও ইয়ারোস্লাভ সাইফার্টের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কবিদের কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন তিনি। মূল কবিতার আবেগ, ভাবনা ও দার্শনিক অনুষঙ্গ বাংলা ভাষায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার অনুবাদে ছিল নিজস্বতা। এসব কাজের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে বিশ্বকবিতার নানা ধারা ও কণ্ঠ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।
রথো রাফির কবিতাভাবনার কেন্দ্রে ছিল বৌদ্ধিক অন্বেষণ। তার বিশ্বাস ছিল, কবিতায় কেবল আবেগতাড়িত সাড়া নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি, স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গি এবং প্রকাশনার প্রতি অনীহা তাকে সমকালীন কবিদের ভিড়ে আলাদা করে রেখেছিল।
তার প্রয়াণে বাংলা কবিতার এমন এক স্বর থেমে গেল, যার পরিচয় গড়ে উঠেছিল প্রচারের চেয়ে সৃষ্টির গভীরতায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









