সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী অ্যান কারসনের গদ্যের বই ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট: অ্যান এসে’ থেকে ‘ফোল্ডেড মিনিংস’ প্রবন্ধটি দৈনিক এদিন অনলাইন পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করল। আসুন পাঠক অর্থ কেন কিভাবে গোপন থাকে অ্যান কারসনের কাছে জেনে নেই।
লেখা ও পড়ার কৌশল যখন প্রথম ব্যবহৃত হতে শুরু করল, প্রাচীন মানুষেরা তখন থেকেই এর মধ্যে গোপনীয়তা রক্ষার এক আশ্চর্য উপায় দেখতে পেয়েছিলেন। যে সমাজে লেখার প্রচলন নেই, সেখানে যোগাযোগের প্রায় সবকিছুরই কিছু না কিছু প্রকাশ্য চরিত্র থাকে। একজন দূত এসে খোলা আকাশের নিচে সবার সামনে যে বার্তা ঘোষণা করেন, তা নিশ্চয়ই এমন চিঠির মতো ব্যক্তিগত নয়, যা লেখা হয়েছে শুধু আপনার চোখে পড়ার জন্য।
লেখালেখির শুরুর যুগের মানুষ এই পার্থক্য সম্পর্কে খুব সচেতন ছিলেন বলেই মনে হয়। স্যাফোকে আরোপিত একটি প্রাচীন ধাঁধায় সেই মনোভাবের সুন্দর প্রকাশ ঘটেছে। ধাঁধাটি এমন এক প্রাণীর কথা বলে, যার স্বভাব নারীসুলভ। সে নিজের গর্ভে লুকিয়ে রাখে অনাগত সন্তানদের। তাদের কোনো কণ্ঠস্বর নেই, অথচ তারা দূরদূরান্তের মানুষের সঙ্গে কথা বলে। সমুদ্র পেরিয়ে, স্থলভাগের বিস্তীর্ণ পথ অতিক্রম করে তারা পৌঁছে যায় যাদের কাছে পৌঁছাতে চায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, পাঠকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য কেউ তাদের কথা শুনতে পায় না। তাদের কণ্ঠহীন কণ্ঠ কেবল সেই মানুষের কাছেই পৌঁছায়, যার জন্য তারা কথা বলতে এসেছে। স্যাফো নিজেই ধাঁধার উত্তর দেন। সেই নারীসুলভ প্রাণী হলো একটি চিঠি। তার গর্ভে বহন করা অনাগত সন্তানগুলো হলো বর্ণমালা—অক্ষর। তাদের কোনো কণ্ঠস্বর নেই, তবু তারা দূরে থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বলে, লেখক যাদের কাছে তাদের পাঠাতে চান। অথচ ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ, পাঠক যখন চিঠিটি পড়ছেন, সেই কথোপকথন শুনতে পান না।
চিঠি অনুপস্থিত মানুষকে উপস্থিত করে। কিন্তু এই উপস্থিতি সবার জন্য নয়। চিঠি যেন লেখক ও পাঠকের মধ্যে বিনিময় হওয়া এক গোপন সংকেত। দুজনের মধ্যে এমন এক যোগাযোগ তৈরি হয়, যার বাইরে থেকে অন্য কেউ তার অর্থে প্রবেশ করতে পারে না। কবি আর্কিলোকোস নিজের কবিতার কথা বলতে গিয়েও সংকেতের এই রূপক ব্যবহার করেছেন। কাউকে কবিতা পাঠানোর সময় তিনি নিজেকে তুলনা করেছেন স্কিতালে নামের এক বিশেষ সংকেতবাহকের সঙ্গে। স্পার্টানরা গোপন বার্তা পাঠাতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করত। একটি দণ্ডের চারপাশে চামড়ার সরু ফিতা পেঁচিয়ে নেওয়া হতো। তারপর ফিতার ওপর আড়াআড়িভাবে বার্তা লেখা হতো। ফিতাটি খুলে পাঠিয়ে দেওয়া হলে অক্ষরগুলো এলোমেলো মনে হতো। প্রাপক একই মাপের আরেকটি দণ্ডের চারপাশে ফিতাটি আগের মতো পেঁচিয়ে নিলে বার্তাটি আবার পাঠযোগ্য হয়ে উঠত।
এই পদ্ধতিতে বার্তার অর্থ কেবল শব্দের মধ্যে ছিল না। অর্থ তৈরি হতো শব্দ আর তাদের বিন্যাসের মিলনে। লেখক ও পাঠককে যেন একই সংকেতের দুটি অর্ধেক হাতে নিতে হতো। দুজনের মিলিত কাজেই সম্পূর্ণ হতো অর্থ। বাইরের কেউ সেই মিলনের অংশ নয়। যোগাযোগের এই ধারণায় ঘনিষ্ঠতার একটি বিশেষ রূপ আছে। লেখক একা অর্থ তৈরি করেন না, পাঠকও একা তা আবিষ্কার করেন না। তাদের মধ্যে অর্থের জন্ম হয়—একটি গোপন সমঝোতার ভেতর দিয়ে। অন্যেরা শব্দগুলো দেখতে পারে, কিন্তু সেই শব্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্পর্কটি তাদের নাগালের বাইরে থেকে যায়। লেখার এই গোপন ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দেয় এস্কিলাসের সাপ্লায়ান্টস নাটকের একটি বিখ্যাত অংশ। এখানে রাজা পেলাসগোস জনগণের সম্মতিতে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছেন। তার ঘোষণা উচ্চারিত হচ্ছে সবার সামনে, মুখে মুখে। সেই প্রকাশ্য উচ্চারণের বিপরীতে তিনি লিখিত দলিলের কথা বলেন, যে দলিল গুটিয়ে রাখা যায়, আড়াল করা যায়, সিলমোহর দিয়ে বন্ধ করে রাখা যায়।
রাজা বলেন, নগরবাসীর সম্মিলিত সিদ্ধান্তে এই রায় গৃহীত হয়েছে। তার ওপর এমনভাবে পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়েছে, যেন তা দৃঢ়ভাবে স্থায়ী থাকে। কিন্তু সিদ্ধান্তটি কোনো ফলকে লেখা হয়নি, কোনো বইয়ের ভাঁজে সিলমোহর দিয়ে আটকে রাখা হয়নি। বরং স্বাধীনভাবে কথা বলা একটি কণ্ঠ থেকে তা স্পষ্ট করে শোনা যাচ্ছে। পেলাসগোসের কথায়, লিখিত শব্দের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। লেখা ভাঁজের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে, গোপন থাকতে পারে, চোখের আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে। তার বিপরীতে উচ্চারিত শব্দ প্রকাশ্য। তাকে কোনো পাতার ভাঁজে লুকিয়ে রাখা হয়নি। সে যেন মুক্ত কণ্ঠের, এমনকি গণতান্ত্রিক যোগাযোগেরও প্রতীক।
কিন্তু প্রাচীন পৃথিবীতে বই ও লেখার ফলক সত্যিই ভাঁজ করে রাখা হতো। সেই সময়ে চিঠি ও বার্তা লেখার সবচেয়ে প্রচলিত মাধ্যমগুলোর একটি ছিল দেলতোস—কাঠের তৈরি এমন এক ফলক, যা কবজার সাহায্যে ভাঁজ করা যেত। কখনো তার ভেতরের পৃষ্ঠে মোমের আস্তরণ থাকত। লেখার কাজ শেষ হলে ফলকটি বন্ধ করে দেওয়া হতো, যাতে ভেতরে লেখা কথাগুলো অন্যের চোখে না পড়ে। পাঠক ফলকটি খুলে নিতেন। আর সেই খোলার মুহূর্তে তার সামনে উন্মুক্ত হতো এমন একটি অর্থ, যা বিশেষভাবে তার জন্যই লেখা।
অর্থাৎ, লেখা শুধু কিছু কথা সংরক্ষণ করার উপায় ছিল না। তা ছিল কথাকে আড়াল করারও উপায়। একটি বার্তা লেখা হলে তাকে বন্ধ করে রাখা যেত; তার অর্থকে অন্যের কাছ থেকে সরিয়ে রাখা যেত। পড়ার জন্য যেমন চোখের প্রয়োজন, তেমনি কখনো কখনো প্রয়োজন হতো একটি বন্ধ দর খুলে দেওয়ার।

ধাতুর ফলকেও লেখা হতো। বিশেষত দেবতার কাছে প্রশ্ন নিয়ে যাওয়া মানুষেরা এমন ফলক ব্যবহার করতেন। সপ্তম শতাব্দী খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে সক্রিয় ডোডোনার দৈববাণীর মন্দিরে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা প্রায় দেড় শ সীসার ফলক খুঁজে পেয়েছেন। এগুলোতে লেখা ছিল জিউসের কাছে করা নানা প্রশ্ন।
ফলকগুলোর হাতের লেখা, বানান ও ব্যাকরণের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়। এ থেকে ধারণা করা হয়, প্রশ্নকারীরা নিজেরাই সেগুলো লিখেছিলেন। সীসার ফলকগুলো ছিল ফিতার মতো সরু ও লম্বাটে। প্রতিটিতে দৈর্ঘ্য বরাবর দুই থেকে চার লাইনে প্রশ্ন লেখা হতো। তারপর প্রায় প্রতিটি ফলকই কয়েকবার ভাঁজ করে ফেলা হতো, যাতে লেখাটি ভেতরে ঢাকা পড়ে যায়। ফলকের এই বিশেষ আকৃতি এবং তার উল্টো পিঠে প্রশ্ন না লেখার অভ্যাস—দুটিই সম্ভবত এই ভাঁজ করার প্রয়োজন থেকে এসেছে। ডোডোনায় সীসার ওপর আপনি যে শব্দগুলো লিখছেন, সেগুলো আপনার আর জিউসের মধ্যে এক গোপন বিষয়। দেবতার কাছে আপনার প্রশ্ন পৌঁছানোর আগে পৃথিবীর অন্য কারও তা জানার প্রয়োজন নেই। প্রাচীন পাঠকদের কাছে তাই ভাঁজ করা লেখা এবং ব্যক্তিগত অর্থ কেবল কাব্যিক কল্পনা ছিল না। সেগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব ছিল। কাঠের ফলক বন্ধ করা যেত, সীসার ফিতা গুটিয়ে রাখা যেত, চিঠির অক্ষর দূরবর্তী কাউকে কথা শোনাতে পারত অথচ পাশে দাঁড়ানো মানুষটিকে নীরব রাখতে পারত। লেখা একই সঙ্গে দূরত্ব অতিক্রম করত এবং নিজেকে আড়াল করত।
তবে এখানে আরেকটি বাস্তবতা আছে, যা কেবল বস্তুগত নয়। ভাঁজের একটি রূপক অর্থও রয়েছে। কোনো লেখা চোখের সামনে থাকলেই তার সমস্ত অর্থ চোখে পড়ে না। শব্দের বাইরেও কিছু থাকে—কিছু যা সরাসরি বলা হয়নি, কিছু যা পড়তে গেলে পাঠককে নিজের মতো করে খুলে নিতে হয়। লেখা তখন আর নিছক বার্তা থাকে না; তা হয়ে ওঠে অর্থের ভেতরে প্রবেশ করার একটি পদ্ধতি। এই রূপক হোমারের মতোই প্রাচীন। ইলিয়াড–এর ষষ্ঠ সর্গে বেলেরোফোনের যে কাহিনি বলা হয়েছে, সেটিই গ্রিক ভাষায় চিঠি লেখা ও পড়া নিয়ে আমাদের হাতে থাকা প্রাচীনতম গল্প।
এখানে লেখা কেবল একটি বার্তা বহন করে না। তার ভেতরে থাকে এমন কিছু, যা পাঠককে খুঁজে বের করতে হয়। শব্দের দৃশ্যমান পৃষ্ঠের নিচে আরেকটি পাঠ লুকিয়ে থাকে—ভাঁজের মধ্যে রাখা, অপেক্ষায় থাকা, উন্মোচিত হওয়ার অপেক্ষায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









