ফ্রান্সে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে বিভিন্ন প্রতিবাদী সংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়ন।
শনিবার দেশজুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভের পর রবিবার তারা নতুন করে সমাবেশের ডাক দেয়। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, মজুরি ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ কমেনি।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। এর ফলে ১৭ অক্টোবর বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়া ভাঙচুর ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব হয়।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা আগামী শনিবার, ৩১ অক্টোবর, আবারও বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ৫ নভেম্বর দেশজুড়ে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন তারা। তাদের দাবি, গত মাসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দিয়ে যে প্রতিবাদের সূচনা হয়েছিল, তা এখন শিক্ষাঙ্গনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।
বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন সলিদেয়ারের সহনেত্রী মুরিয়েল গিলবার্ট বিএফএম টেলিভিশনকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন পক্ষের ক্ষোভ এক জায়গায় জমা হতে দেখছি।’ তার ভাষ্য, শিক্ষার্থী, শ্রমিক, অগ্নিনির্বাপণকর্মীসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর অসন্তোষ এখন একসঙ্গে প্রকাশ পাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আগামী শনিবার মানুষকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানাচ্ছি।’
শিক্ষক সংগঠন এসইউডি এডুকেশন জানিয়েছে, তারা ৩১ অক্টোবরের বিক্ষোভে যোগ দেবে। বড় শ্রমিক সংগঠন সিজেটি এ বিষয়ে চলতি সপ্তাহে সিদ্ধান্ত নেবে।

বিক্ষোভকারীদের দাবি মেটানো কঠিন ম্যাক্রোঁর জন্য
২০১৮ সালে জ্বালানি কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। তৃণমূল পর্যায়ের এই আন্দোলনের কর্মীরাও আগামী শনিবার বড় সমাবেশের ডাক দিয়েছেন। বিভিন্ন শহরের পৌরসভা ভবন ও জাতীয় সংসদের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
আন্দোলনকর্মী আজেলমা সিগো সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়, সড়কের মোড়, আবাসিক এলাকা, খামার এবং কর্মক্ষেত্র—সব জায়গায় এই ক্ষোভ বাড়ছে।’ ২০১৯ সালে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সময় প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জ্বালানির ব্যয় কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সাত বছর পর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে।
দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে। ফলে বিক্ষোভকারীদের দাবিগুলো পূরণ করতে ম্যাক্রোঁর সরকারের হাতে এখন আগের তুলনায় কম সুযোগ রয়েছে। আগামী এপ্রিলেই তার প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। তার মধ্যপন্থী দলও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। ফলে বড় ধরনের আইন পাস করানো সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার শ্রমিক ইউনিয়ন ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। তবে আন্দোলনকারীদের নেতারা বলছেন, সরকার এখন পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে, তা তাদের দাবি পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।
মুরিয়েল গিলবার্ট বলেন, ‘এই সরকারের কাছ থেকে আমরা কোনো জবাবই পাইনি।’
এদিকে পুলিশ ইউনিয়নগুলো জানিয়েছে, শনিবারের মতো বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করে দীর্ঘ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। শনিবারের ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে প্যারিস ও মার্সেইসহ কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে ১ হাজার ৩১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আগের সপ্তাহের তুলনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। আহত হয়েছেন প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য। আগের সপ্তাহে আহত পুলিশের সংখ্যা ছিল এক হাজারের বেশি।

ফ্রান্সের বাইরেও ছড়াচ্ছে প্রতিবাদের ঢেউ
ফ্রান্সের বিক্ষোভের প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোতেও দেখা যাচ্ছে। শনিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও মরিচের গুঁড়া ছোড়ে। আলবেনিয়ায় মে মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চলতি মাসে সহিংস রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে ইতালির কয়েকটি শহরেও টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
ফ্রান্সে নতুন করে বিক্ষোভের প্রস্তুতি এবং সরকারের সীমিত রাজনৈতিক ও আর্থিক সক্ষমতা—দুই মিলিয়ে ম্যাক্রোঁর সামনে সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









