যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার বিষয়ে আন্তরিক নয় বলে অভিযোগ করেছে ইরান। দেশটির দাবি, ওয়াশিংটন বারবার কূটনীতিকে আলোচনার পরিবর্তে নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। দেশটি বলেছে, পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের কোনো চেষ্টা তারা কখনো করেনি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এসব কথা বলেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
বাঘাই বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ আলোচনার বিষয়ে আন্তরিক নয়।’ তার অভিযোগ, ওয়াশিংটন বারবার মিথ্যা দাবি করে আসছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক হামলার কিছুদিন আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকারও সমালোচনা করেন বাঘাই। তার দাবি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনুসরণ করেছে। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের প্রশ্নে দেশ তিনটির অবস্থানের সমালোচনা করেন তিনি। একই সঙ্গে ইরানের ওপর সামরিক হামলার নিন্দা না জানানোর অভিযোগও তোলেন।
পরমাণু অস্ত্র তৈরির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বাঘাই বলেন, তেহরানের কখনো পরমাণু অস্ত্র ছিল না এবং দেশটি এমন অস্ত্র অর্জনের চেষ্টাও করেনি। তাঁর অভিযোগ, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের যুক্তি দাঁড় করাতে ওয়াশিংটন পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নানা অভিযোগ তুলছে।
বাঘাই বলেন, ইরান আন্তরিকতার সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং ২০১৫ সালে পরমাণু চুক্তিতে সই করেছিল। তবে তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে সরে যায়। তাঁর দাবি, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েলের বক্তব্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মার্কিন প্রশাসন তেহরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে।
কাতারে নিখোঁজ তিন পাইলটের বিষয়ে প্রশ্ন
কাতারে তিন ইরানি পাইলটের ভাগ্য সম্পর্কে তথ্য প্রকাশের দায়িত্ব দেশটির ওপর রয়েছে বলে মনে করে তেহরান। বাঘাই বলেন, ওই পাইলটদের মৃত্যুর প্রমাণ অথবা তাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও নথি না পাওয়া পর্যন্ত ইরান এ বিষয়ে জবাবদিহির জন্য কাতারকে দায়ী করবে।
তিনি জানান, ইরানের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। পাশাপাশি কারিগরি প্রতিনিধিদল ও আইনি আলোচনার মাধ্যমেও তথ্য জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি কাতারের একটি প্রতিনিধিদল তেহরান সফর করেছে বলেও নিশ্চিত করেন বাঘাই। তার ভাষ্য, দুই দেশের সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়ে এ সফরে আলোচনা হয়েছে। আঞ্চলিক সংঘাতের সময় এ ধরনের সফর স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি প্রসঙ্গে বাঘাই বলেন, দেশটির রাজনীতিকেরা কে বেশি অপরাধ করতে পারেন, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা করছেন। ইসরায়েলের নেতৃত্বে কে আসছেন, তা নিয়ে তেহরানের বিশেষ মাথাব্যথা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাশিয়া সফরে যাচ্ছেন পেজেশকিয়ান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সোমবার রাতে রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা হবেন বলে জানান বাঘাই। গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি সম্মেলনে অংশ নিতে তার এ সফর। এ সফরের মাধ্যমে মস্কোর সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানো এবং অন্যান্য বড় জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে তেহরান।
পাকিস্তান ও ইরাকের সঙ্গে সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট সমস্যার বিষয়েও কথা বলেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র। তিনি জানান, পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। বিষয়টিকে কারিগরি সমস্যা হিসেবে দেখার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথাও জানিয়েছে ইসলামাবাদ।
ইরাকের বিষয়ে বাঘাই বলেন, ইরানের কূটনৈতিক মিশনগুলো বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। বাগদাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ইরাকের জনগণ এবং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
ইউরোপে বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে রোববার ইতালির রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে ইরান। বাঘাইয়ের অভিযোগ, ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও ইতালির কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করছে এবং প্রতিবাদের অধিকার সীমিত করছে। এসব পদক্ষেপ মানবাধিকার রক্ষায় দেশগুলোর অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সৌদি আরব-ইয়েমেন সংঘাত
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যকার সংঘাত প্রসঙ্গে বাঘাই বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তার প্রভাব অন্য দেশেও পড়তে পারে। তাই সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতেও তেহরান প্রস্তুত বলে জানান।
বাঘাইয়ের ভাষায়, সামরিক পদক্ষেপ সমস্যা আরও জটিল করে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনে। সৌদি আরব আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে এগোবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা দীর্ঘদিনের। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এতে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও ব্যাহত হয়।
১৮ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল সংঘাত বন্ধ করা, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি আবার খুলে দেওয়া এবং বৃহত্তর চুক্তির পথ তৈরি করা। তবে মার্কিন নৌ অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা এবং প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে মতপার্থক্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইরান জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। তেহরানের অবস্থান, অচলাবস্থা কাটাতে ওয়াশিংটনকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









