নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম (৩০) হত্যার ঘটনায় সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের ছেলে ও উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান মিন্টুকে (৫০) আটক করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে গুরুদাসপুরে তাঁর ভাড়া বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়।
নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মিন্টুকে ডিবি হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে। আলোচিত এ ঘটনায় নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীলভাবে তদন্ত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
১৪ অক্টোবর রাতে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হন শাকিল। হামলাকারীরা তাঁকে কুপিয়ে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সোমবার রাতে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) তার মৃত্যু হয়।
হামলার পর হাসপাতালের শয্যা থেকে শাকিলের দেওয়া একটি অডিও কলের রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, এমপিপুত্র মিন্টু বেশ কিছুদিন ধরে তাকে হত্যার চেষ্টা করছেন এবং মিন্টুই হামলা করিয়েছেন। এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গিয়েও তিনি সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে মিন্টুর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শাকিলের বাবা রবিউল করিম পেশায় রাজমিস্ত্রির শ্রমিক। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিজের শ্রমের আয়ে বড় করেছেন তিনি। শাকিল ডিগ্রি শ্রেণিতে পড়তেন। ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর হামলার শিকার হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানান স্বজনেরা।
রবিউল করিমের অভিযোগ, গত ১৪ অক্টোবর হামলার ঘটনায় ১৯ অক্টোবর তিনি চারজনের নাম উল্লেখ করে হত্যাচেষ্টা মামলা করতে যান। তবে পুলিশ এজাহারে তাঁদের নাম বাদ দিয়ে সাত-আটজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে মামলা নেয়। ঘটনার ১২ দিন পরও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
রবিউল করিম বলেন, ছেলের ওপর হামলার পর দলের কোনো নেতা-কর্মী তাঁদের খোঁজ নেননি। এখন ছেলের মৃত্যুর পর অনেকে আসছেন। তিনি বলেন, “এমপির ছেলে বলে কথা নয়। ছেলে হত্যার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এমপির ছেলে জড়িত থাকলেও তাঁকে আসামি করতে হবে।”
মিন্টুকে আটকের খবরেও স্বস্তি পাননি তিনি। তার আশঙ্কা, প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হওয়ায় মিন্টু পার পেয়ে যেতে পারেন।
অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ বলেন, অপরাধী তার ছেলে হলেও আপত্তি নেই। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে আছেন ও থাকবেন। শাকিলের চিকিৎসার ব্যয়সহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন বলেও জানান তিনি। ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের গ্রেপ্তারে পুলিশকে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে দাবি করেন এই সংসদ সদস্য।
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান বলেন, প্রকৃত আসামিদের চিহ্নিত করতে সময় লাগছে। দ্রুতই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এমপিপুত্রের নাম আলোচনায় আসায় তাকেও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
শাকিলের মৃত্যুর পর তার বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মঙ্গলবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনে স্বজন, দলীয় নেতা-কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অপেক্ষা করছেন। ঘরের ভেতরে শাকিলের মা তশরী বেগম বিলাপ করছেন। স্ত্রী হাফসা শারমিন শোকে প্রায় অচেতন। ছোট বোন শাকিলা খাতুনও কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। শেষবার বৃহস্পতিবার হাসপাতালে নিজের হাতে শাকিলকে স্যুপ খাইয়েছিলেন তিনি। তখন শাকিল বলেছিলেন, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবেন। সেই আশ্বাস নিয়ে বাড়ি ফিরলেও শেষ পর্যন্ত স্বামীর মরদেহের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে তাকে।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদল মরদেহের দায়িত্ব নিয়েছে। পল্টন ময়দানে জানাজা শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। পরে গুরুদাসপুর সরকারি বিলচলন শহীদ সামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে বাদ এশা দ্বিতীয় জানাজা শেষে পুরানপাড়া কবরস্থানে তাকে দাফন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে শাকিল হত্যার বিচারের দাবিতে গত সোমবার রাতে চাঁচকৈড়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রদল। এ ঘটনায় তিন দিনের শোক কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে সংগঠনটি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









