স্পেনে দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৯ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১০৭ জন, যাদের মধ্যে ১৫ জনের অবস্থা গুরুতর। দুর্ঘটনার পর দেশজুড়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে স্পেন সরকার। ধ্বংসস্তূপে এখনো নিখোঁজ যাত্রীদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান’র এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার সকালে মধ্য স্পেনের কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা অঞ্চলের উর্দা শহরের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়ার দিকে যাত্রা করা দুটি দ্রুতগতির ট্রেন একই রেলপথে চলাচলের সময় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ইরিও নামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একটি ট্রেন থেমে যাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফের আরেকটি ট্রেন সেটির পেছনে ধাক্কা দেয়। এতে কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে।
দুর্ঘটনার সময় দুটি ট্রেনে মোট ৫৪৪ জন যাত্রী ছিলেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সংঘর্ষের পরপরই উদ্ধারকারী দল, পুলিশ ও জরুরি সেবাকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। ভারী যন্ত্রপাতি ও ক্রেন ব্যবহার করে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বগি থেকে হতাহতদের বের করে আনা হয়।

তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক
দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। এ সময় সরকারি ভবন ও নৌযানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের দায়িত্ব। নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি কিংবা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
কম্পিউটার ব্যবস্থায় ত্রুটির অভিযোগ
স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার আগে রেলপথের স্বয়ংক্রিয় সংকেতব্যবস্থা এলজেডবি কম্পিউটারজনিত ত্রুটির কারণে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার রেলপথের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ট্রেন থেমে যায়।
এরপর মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে অন্তত দুটি ট্রেনকে চলাচল পুনরায় শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সামনে রেলপথে থামার সংকেত বহাল থাকা সত্ত্বেও কেন এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পরিবহনমন্ত্রী এ সিদ্ধান্তকে ভুল ও ব্যাখ্যাতীত বলে উল্লেখ করেছেন। তবে দুর্ঘটনার জন্য চূড়ান্তভাবে কারা দায়ী, তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

নিখোঁজদের সন্ধানে স্বজনদের অপেক্ষা
দুর্ঘটনার পর বহু যাত্রীর স্বজন তাদের খোঁজে বিভিন্ন হাসপাতালে ও তথ্যকেন্দ্রে ছুটে যান। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করতে পুলিশ মাদ্রিদ, তোলেদো, কর্দোবা ও সেভিয়ায় ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছে।
বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত স্বজনদের পক্ষ থেকে ৬৪ জন নিখোঁজ থাকার খবর জানানো হয়েছিল। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজও চলছে।
দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মানসিক সহায়তা দিচ্ছেন জরুরি সেবাকর্মী ও রেড ক্রসের কর্মীরা।
একই বছরে দ্বিতীয় বড় ট্রেন দুর্ঘটনা
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দক্ষিণ স্পেনের আদামুজ এলাকায় দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন। একই বছরে দ্বিতীয়বারের মতো বড় ধরনের প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনা ঘটায় দেশটির দ্রুতগতির রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিরোধী দল পিপির নেতা আলবার্তো নুনিয়েজ ফেইহো দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পাশাপাশি পুরো রেল নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, রেলকর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তায় আরও বিনিয়োগের দাবিও জোরালো হয়েছে।
স্পেনের রেল কর্তৃপক্ষ ও তদন্তকারীরা এখন দুর্ঘটনার কারণ, সংকেতব্যবস্থার ত্রুটি এবং নিয়ন্ত্রণকক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছেন। তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে রেল নিরাপত্তা জোরদারে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









