যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল দেশটির শেয়ারবাজার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাত এবং সরকারি ঋণসীমা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। এই নির্বাচন সাধারণত শেয়ারবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে না। তবে এবার কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় এবং ঋণসীমা নিয়ে আলোচনা নতুন মাত্রা পেতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কংগ্রেসের উভয় কক্ষ রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এ সময়ে দেশটির শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ণ সূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগ এবং বড় কোম্পানিগুলোর আয় বৃদ্ধির কারণে বাজারে এই ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের মুনাফার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে দেশটির অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও পড়ছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে বিভিন্ন পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
১৯৩০ সাল থেকে এ পর্যন্ত আটবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এর মধ্যে পাঁচবার নির্বাচনের পর বছরের বাকি সময়ে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে। নেড ডেভিস রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, এসব নির্বাচনের পর থেকে বছরের শেষ পর্যন্ত সূচকটির গড় মধ্যম বৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ৪ শতাংশ। সব মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর একই সময়ে এই বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ।
ডেমোক্র্যাটদের জয় হলে বাড়বে নজরদারি
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে এআই খাতে সরকারি নজরদারি বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। একই সঙ্গে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদন্তের সুযোগ পাবেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। ওয়াল স্ট্রিটের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার উদ্যোগও বাধার মুখে পড়তে পারে। এতে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেও সিনেট রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক পরিস্থিতিতে মিশ্র প্রভাব পড়তে পারে। বিভক্ত কংগ্রেসের কারণে সরকারি বাজেট পাস এবং ঋণসীমা বাড়ানো নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে। এতে সরকারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল বাজেট ঘাটতি এবং ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে বিনিয়োগকারীরা আগে থেকেই উদ্বিগ্ন। নতুন করে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হলে দেশটির ঋণমানের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। প্রতিরক্ষা ব্যয় ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ভর্তুকি নিয়ে ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ ধরনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হলে ডলারের দরও কমে যেতে পারে।
এআই খাতে বাড়তে পারে তদন্ত
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভালো ফলের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে এআই খাতে। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে বিরোধিতা বাড়ছে, তা আরও জোরালো হতে পারে।
রেমন্ড জেমসের ওয়াশিংটনবিষয়ক নীতিবিশ্লেষক এড মিলস এক নোটে বলেছেন, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের উদ্যোগ এআই খাতে নতুন নিরাপত্তাবিধি প্রণয়নের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারে। উন্নত এআই মডেলের নিরাপত্তা যাচাই, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং দুর্ঘটনা বা ত্রুটির তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি ডেটা সেন্টার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিও বাড়ানোর চেষ্টা হতে পারে।
এআই খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী। এ খাতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে সামান্য সংশয় তৈরি হলেও শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যায়। রয়টার্স ও ইপসোসের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তিনজন নাগরিকের মধ্যে মাত্র একজন দ্রুতগতিতে ডেটা সেন্টার নির্মাণের পক্ষে।
কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষে জয় পেলে ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন শিল্প খাত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রম তদন্তের সুযোগ পাবেন। ট্রাম্প ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং পূর্বাভাসভিত্তিক বাজারের সংশ্লিষ্টতা নিয়েও তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ডেমোক্র্যাটরা।
বাজার বিশ্লেষক দিয়েগো বার্নুয়েভোর মতে, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে আলোচনা মূলত বাজেট এবং ঋণসীমার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। ২০২৭ সালে ঋণসীমা নিয়ে আলোচনা সামনে আসার কথা।
তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক পরিস্থিতির জন্য তা নিরপেক্ষ থেকে সামান্য ইতিবাচক হতে পারে।
তবে অন্য বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলেও সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। রাজনৈতিক পরিস্থিতি যা-ই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের অবনতিশীল আর্থিক অবস্থার বড় কোনো পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম।
নেড ডেভিস রিসার্চের প্রধান মার্কিন কৌশলবিদ এড ক্লিসোল্ড বলেন, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে বছরের শেষ দিকে মার্কিন শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বগতি কিছুটা কমতে পারে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এতে সাধারণত শেয়ারবাজারের অগ্রযাত্রা থেমে যায় না। তাঁর মতে, রাজনৈতিক অচলাবস্থা শেয়ারবাজারের জন্য ইতিবাচক—এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের শাসনামলে শেয়ারবাজারের পারফরম্যান্স রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টদের সময়ের তুলনায় ভালো ছিল।
রিপাবলিকানরা জয়ী হলে বাড়তে পারে সরকারি ব্যয়
কংগ্রেসের উভয় কক্ষ রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের বাজারে বড় প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, এতে ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান নীতিগুলো অব্যাহত রাখার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে কর সংস্কার এবং প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। এতে দেশটির বাজেট ঘাটতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নুমেরা অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও কৌশলবিদ হোয়াকিন ক্রিটজ লারা বলেন, রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে তা ট্রাম্প প্রশাসনের আর্থিক নীতির প্রতি সমর্থন হিসেবে বিবেচিত হবে।
এতে শুরুতে সরকারি বন্ডের মুনাফার হার বাড়ার কারণে ডলার শক্তিশালী হতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে বাজেট ঘাটতি বাড়ানো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ এবং বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করতে পারে। ফলে ডলারে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে তাঁরা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারেন।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে এআই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত ও নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপের আশঙ্কা কমবে।
জেপি মরগ্যানের কৌশলবিদদের মতে, রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকলে এআই ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিগত পরিবেশ সবচেয়ে বেশি সহায়ক হতে পারে। নীতি অব্যাহত রাখা, সরকারি ব্যয় বাড়ানো, নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা এবং দ্রুত অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ এ খাতের সম্প্রসারণে সহায়তা করবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









