ইবন আরাবির ‘রূহ আল-কুদস ও আদ-দুররাত আল-ফাখিরাহ’র ইংরেজি ভার্সন ‘আন্দালুসের সুফি’, আর. ডব্লিউ. জে. অস্টিনের অনুবাদ, ভূমিকা ও টীকায় গড়ে ওঠা একটি অসাধারণ সংকলন। বইটি ইবন আরাবির সময়কার সাধকদের জীবন, সাধনা, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত এক দুলর্ভ ঐতিহাসিক সুফি অভিজ্ঞতা।
ইবন আরাবি তার সুফি সাধনার পথে যে সকল সাধকদের স্মরণ পেয়েছেন; দিক্ষা নিয়েছেন এই বইয়ে তিনি তাদের সম্পর্কে লিখেছেন। যা সুফি সাধনার এক ঐতিহাসিক দলিল। দৈনিক এদিন অনলাইন-এর পাঠকের জন্য আমরা সেই সকল পবিত্র আত্মাদের নিয়ে লেখা ইবন আরাবির জীবনীর ভাষান্তর ধারবাহিকভাবে প্রকাশ করছি।
আবু ইয়াকুব ইউসুফ ইবন ইয়াখলাফ আল-কুমি
এই শায়খ ছিলেন আবু মাদইয়ানের অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের একজন। আমাদের এই ভূখণ্ডের বহু বিশিষ্ট সুফির সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন তিনি। একসময় মিসরে বসবাস করেছেন এবং আলেকজান্দ্রিয়ায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। আবু তাহির আল-সালাফি তাকে নিজের পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। একবার তাকে ফেজ নগরীর শাসনকর্তার পদ গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ছিলেন সেইসব মানুষের একজন, যারা আধ্যাত্মিক পথের গভীরে সুপ্রতিষ্ঠিত। আমাদের তরিকার মুখপাত্র এবং পশ্চিমের ভূখণ্ডে এই তরিকার পুনর্জাগরণের অগ্রদূত আবু মাদইয়ান তার সম্পর্কে বলেছিলেন— একটি জাহাজের কাছে নিরাপদ নোঙর যেমন আশ্রয়, আবু ইয়াকুবও তেমনি আমাদের কাছে।
তিনি নির্জনে ইবাদত করতে ভালোবাসতেন এবং সর্বদা গোপনে দান করতেন। দরিদ্রদের সম্মান করতেন, ধনীদের অহংকার ভেঙে দিতেন এবং অভাবগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন মেটাতে নিজেই এগিয়ে যেতেন। তার তত্ত্বাবধানে থাকাকালে তিনি আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন, যত্ন করেছেন এবং আমার প্রতি অসাধারণ সদয় আচরণ করেছেন। আমার সঙ্গী আবদুল্লাহ বদর আল-হাবশি তাকে ভালোভাবে চিনতেন। এই শায়খ তারই গৃহে ইন্তেকাল করেন। বদর বলতেন, শায়খ চাইলে মুহূর্তের মধ্যে কোনো সাধককে আধ্যাত্মিক অধঃপতনের অতল গভীরতা থেকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করতে পারতেন। তার মনোসংযোগের ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। অধিকাংশ সময় তিনি মালামাতি তরিকার আদর্শ অনুসরণ করতেন।
তার মুখে প্রায়ই গাম্ভীর্যের ছাপ থাকত; মনে হতো, ভ্রূকুটি যেন তার স্বভাবেরই অংশ। কিন্তু কোনো দরিদ্র মানুষকে দেখামাত্র তার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠত। আমি নিজের চোখে দেখেছি, তিনি কোনো অভাবী মানুষকে কোলে তুলে নিয়েছেন। অনুসারীদের সেবা করতেও তিনি দ্বিধা করতেন না; বরং অনেক সময় নিজেই তাদের সেবকের ভূমিকা গ্রহণ করতেন। একবার স্বপ্নে তাকে দেখলাম। মনে হলো, তার বক্ষ বিদীর্ণ হয়ে গেছে, আর তার ভেতর থেকে সূর্যের মতো এক আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। স্বপ্নের মধ্যে তিনি আমাকে ডাকলেন, তার কাছে যেতে বললেন। আমি কয়েকটি বড়, সাদা পাত্র হাতে নিয়ে তার সামনে উপস্থিত হলাম। তিনি সেগুলো কানায় কানায় দুধে পূর্ণ করে দিলেন। তিনি যতই পাত্র ভরছিলেন, আমি ততই সেই দুধ পান করছিলাম। তার কাছ থেকে যে আধ্যাত্মিক অনুগ্রহ লাভ করেছি, তা সত্যিই বিস্ময়কর। একই রকম অনুগ্রহ পেয়েছি আবু মুহাম্মদ আল-মাওরিতির কাছ থেকেও, যার কথা পরে উল্লেখ করব।
আমাদের প্রথম সাক্ষাতের সময় শায়খ গভীর মনোযোগে আমার দিকে তাকিয়ে একটি প্রশ্ন করেছিলেন। বলেছিলেন— ‘যে ব্যক্তি নামাজরত মানুষের সামনে দিয়ে অতিক্রম করে, তার অপরাধ এত গুরুতর যে, সে যদি জানত এর পরিণাম কী, তবে চল্লিশ বছর একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাকেই শ্রেয় মনে করত—সেই অপরাধটি কী?’
আমি যথাযথ উত্তর দিয়েছিলাম। তিনি আমার উত্তরে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তার সামনে কিংবা আমার অন্য কোনো শায়খের সামনে বসলে আমি বাতাসে কাঁপতে থাকা পাতার মতো কেঁপে উঠতাম। কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে আসত, হাত-পা কাঁপত। তিনি যখনই আমার এই অবস্থা লক্ষ করতেন, কোমল আচরণে আমাকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করতেন। অথচ তার সেই মমতা আমার শ্রদ্ধা ও ভক্তিকে আরও গভীর করে তুলত।
এই শায়খ আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, কিন্তু সেই স্নেহ কখনো প্রকাশ করতেন না। বরং অন্যদের প্রতি অধিক অনুগ্রহ দেখিয়ে এবং আমার সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে নিজের ভালোবাসা আড়াল করতেন। অন্যদের বক্তব্যের প্রশংসা করতেন, অথচ সভা-সমাবেশে আমাকে তিরস্কার করতেন। এমনকি কখনো কখনো এত কঠোর হতেন যে, তার সান্নিধ্যে থাকা আমার সঙ্গীরা আমার আধ্যাত্মিক অগ্রগতি সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আমাদের সেই দলের মধ্যে আমিই তার কাছে অধ্যয়ন করে প্রকৃত সাফল্য অর্জন করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে শায়খ নিজেও তা স্বীকার করেছিলেন। তার সঙ্গে আমার আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা এখানে বলা প্রয়োজন। প্রথমে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। তখন পর্যন্ত আমি আল-কুশাইরির রিসালা কিংবা অন্য কোনো সুফি গ্রন্থ দেখিনি। আমাদের তরিকার কেউ যে কখনো কোনো গ্রন্থ রচনা করেছেন, সে সম্পর্কেও আমার কোনো ধারণা ছিল না। সুফিদের পরিভাষা বা আধ্যাত্মিক আলোচনার বিশেষ ভাষার সঙ্গেও আমি পরিচিত ছিলাম না।

একদিন শায়খ ঘোড়ায় আরোহণ করে আমাকে এবং আমার আরেক সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে আলমোনতেবের পর্বতে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সেভিল থেকে পর্বতটি প্রায় তিন মাইল দূরে। সকালে নগরীর ফটক খুলে গেলে আমরা দুজন যাত্রা শুরু করলাম। আমার সঙ্গীর কাছে ছিল আল-কুশাইরির রিসালা গ্রন্থের একটি কপি। পর্বতের চূড়ায় পৌঁছে দেখি, শায়খ সেখানে অপেক্ষা করছেন। তার সেবক ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা পর্বতের ওপর অবস্থিত মসজিদে প্রবেশ করে নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে শায়খ কিবলার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আমার হাতে রিসালা তুলে দিলেন। বললেন, এখান থেকে কিছু পড়ে শোনাতে।
তার প্রতি আমার ভক্তি ও ভয়ের মাত্রা এত গভীর ছিল যে, মুখ দিয়ে দুটি শব্দও বের করতে পারলাম না। বইটি হাত থেকে পড়ে গেল। তখন তিনি আমার সঙ্গীকে পড়তে বললেন। সে পড়তে শুরু করল, আর শায়খ পাঠ করা অংশের ব্যাখ্যা দিতে লাগলেন। এভাবেই আসরের নামাজের সময় হয়ে গেল। আমরা নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে শায়খ আমাদের নগরীতে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। তিনি ঘোড়ায় চড়ে রওনা হলেন। আমি তার ঘোড়ার রেকাবে হাত রেখে পাশাপাশি দৌড়াতে লাগলাম। পথ চলতে চলতে তিনি আমাকে আবু মাদইয়ানের গুণাবলি ও অলৌকিক ঘটনাগুলোর কথা বলতে শুরু করলেন। তার কথায় আমি এতটাই নিমগ্ন হয়ে পড়েছিলাম যে, চারপাশের পৃথিবীর কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলাম। চোখ তুলে শুধু তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। তারপর ঘোড়ায় চাবুক মারলেন। আমাকে তার সঙ্গে তাল মেলাতে আরও দ্রুত দৌড়াতে হলো।
কিছুক্ষণ পর তিনি থামলেন। আমার দিকে ফিরে বললেন— ‘পেছনে তাকিয়ে দেখো, কী ফেলে এসেছ!’
আমি পেছনে তাকিয়ে বিস্মিত হলাম। আমাদের অতিক্রান্ত পথের দুপাশে ছিল ঝোপঝাড়, আর সমগ্র ভূমি আচ্ছাদিত ছিল কাঁটায়। এরপর তিনি আমার পায়ের দিকে এবং পোশাকের দিকে তাকাতে বললেন। আমি দেখলাম, কোথাও কোনো কাঁটার আঁচড় নেই। পোশাকেও কাঁটার কোনো চিহ্ন নেই।
তখন তিনি বললেন—
‘আবু মাদইয়ানের কথা বলতে বলতে যে আধ্যাত্মিক অনুগ্রহের জন্ম হয়েছে, এ তারই ফল। অতএব, হে বৎস, এই পথে অবিচল থেকো। তুমি নিশ্চয়ই মুক্তির সন্ধান পাবে।’
এই কথা বলে তিনি ঘোড়ায় চাবুক মারলেন এবং আমাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেলেন। তার কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। এই শায়খের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি যখন কোনো সাধককে আধ্যাত্মিক অনুশীলনের নির্দেশ দিতেন, নিজেও সেই অনুশীলন পালন করতেন। এমনকি যদি দুই বা তিনজন সাধককে ভিন্ন ভিন্ন সাধনার নির্দেশ দিতেন, তবুও তিনি প্রত্যেকের অনুশীলন নিজে সম্পাদন করতেন। এতে তাকে কখনো ক্লান্ত হতে দেখিনি। একদিন আসরের নামাজের পর আমি তার সঙ্গে বসেছিলাম। তিনি বুঝতে পারলেন, আমার চলে যাওয়ার তাড়া রয়েছে। অস্থিরতার কারণ জানতে চাইলে আমি বললাম, কয়েকজন মানুষের কাছে আমার চারটি দায়িত্ব রয়েছে। সেগুলো সম্পন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এখন তার সঙ্গে বসে থাকলে আর সময়মতো তাদের কাছে পৌঁছাতে পারব না।
তিনি মৃদু হেসে বললেন:
‘এখন যদি তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাও, তবে তোমার কোনো দায়িত্বই পালন করা হবে না। বরং বসে থাকো, আমি তোমাকে আবু মাদইয়ানের আধ্যাত্মিক অবস্থার কথা বলি। আর তোমার যে কাজগুলো বাকি রয়েছে, সেগুলো সম্পন্ন করার দায়িত্ব আমার।’
আমি তার কাছে বসে রইলাম। সূর্যাস্তের নামাজের সময় হলে তিনি বললেন:
‘এবার বাড়ি ফিরে যাও। তুমি মাগরিবের নামাজ আদায় করার আগেই দেখবে, তোমার সব দায়িত্ব সম্পন্ন হয়ে গেছে।’
আমি তার সান্নিধ্য এতটাই কামনা করতাম যে, প্রায়ই মনে হতো, রাতের বেলায় আমাদের বাড়িতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তিনি যদি সেখানে উপস্থিত থাকতেন! এমন আকাঙ্ক্ষা যখনই মনে জাগত, আমি তাকে আমার সামনে দেখতে পেতাম। তখন তাকে প্রশ্ন করতাম, আর তিনি উত্তর দিতেন। সকালে তার কাছে গিয়ে আগের রাতের সেই কথোপকথনের বিবরণ দিতাম। দিনের বেলায় বাড়িতে থাকলেও একই ঘটনা ঘটত, যদি আমি তার উপস্থিতি কামনা করতাম।
এই শায়খের গুণাবলি, আধ্যাত্মিক ক্ষমতা এবং জ্ঞানের গভীরতা এমন যে, এখানে তার সবকিছু বর্ণনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আধ্যাত্মিক মিলন বা ওয়াসল-এর বিষয়ে তিনি আমাকে বিশেষভাবে শিক্ষা দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি কয়েকটি বাণীর ব্যাখ্যা করতেন: ‘আমি আদমসন্তানের নেতা।’
‘আদম এবং তার পরবর্তী সকলেই আমার পতাকার অধীন।’
‘সৎপথে পরিচালনা জীবিকার অর্ধেক।’
‘আল্লাহ যখন তার কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তাকে পরীক্ষায় ফেলেন।’
‘পবিত্র কোরআনের হৃদয় হলো সুরা ইয়াসিন।’
এই বিষয়গুলো এবং আরও অনেক বিষয়ে আমাদের ভূখণ্ডে তার চেয়ে অধিক জ্ঞানী কাউকে আমি জানতাম না। তার কাছ থেকে যা শিখেছি, তার সবকিছু আজ আর স্মরণ করতে পারি না।
আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন।

পরিচিতি
দ্বাদশ শতকের আল-আন্দালুসের সুফি সাধক, পণ্ডিত ও আধ্যাত্মিক শিক্ষক আবু ইয়াকুব ইউসুফ ইবন ইয়াখলাফ আল-কুমি ছিলেন এমন এক সুফি সাধক, যার জীবনের গভীরতা প্রকাশ পেত নীরবতা, বিনয় ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। আবু মাদইয়ানের সান্নিধ্যে তিনি আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক সাধনার পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। তার কাছে সাধনা ছিল না খ্যাতি কিংবা অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের বিষয়; বরং নিজের অহংকে অতিক্রম করে স্রষ্টার নৈকট্য অনুভবের এক নিরন্তর প্রয়াস।
তিনি গোপনে দরিদ্রদের সাহায্য করতেন, মানুষের দুঃখকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করতেন এবং বাহ্যিক সম্মানের প্রতি উদাসীন থাকতেন। তার শিক্ষায় ছিল সংযম, ধৈর্য ও অন্তরের পবিত্রতার আহ্বান। শিষ্যদের কাছে তিনি কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন আত্মার পথপ্রদর্শক। তার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আধ্যাত্মিক আলোর সন্ধান দূরের কোনো জগতে নয়; তা লুকিয়ে থাকে বিনম্র হৃদয়ে, নিঃশব্দ সেবায় এবং ভালোবাসার গভীরতম অনুভবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









