ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের জায়গায় দলে সুযোগ পাওয়ার পর যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন ইয়ান দিয়োমান্দে। মাত্র ২২ দিনে করেছেন চারটি অসাধারণ গোল। প্রতিটি গোলেই ছিল নিখুঁত শট, দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাস আর গোল করার বিরল দক্ষতার ছাপ। রিয়াল মাদ্রিদে শুরুটা খুব একটা ভালো না হলেও এখন তিনি হয়ে উঠেছেন দলের অন্যতম আলোচিত খেলোয়াড়।
রবিবার রেসিং সান্তান্দারের বিপক্ষে তার গোল দেখে বিস্মিত হয়েছেন সতীর্থ জুড বেলিংহামও। ডান পায়ে নেওয়া শটটি বক্সের বাইরে থেকে বাঁক খেয়ে জালে জড়ায়। গোলটি দেখে নিজের বিস্ময় লুকাতে পারেননি বেলিংহাম। কারণ, মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে এমন চারটি গোল করেছেন ১৯ বছর বয়সী এই আইভরিয়ান।
স্পেনের সংবাদমাধ্যম এল পাইস–এর বিশ্লেষণ বলছে, দিয়োমান্দের গোল করার দক্ষতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ধারালো। গত ১০ অক্টোবর ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে বাঁ প্রান্তে প্রথমবারের মতো শুরুর একাদশে সুযোগ পান তিনি। সেদিন বেঞ্চে বসতে হয়েছিল ভিনিসিয়ুসকে। এরপর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে তার খেলা।
রেসিং সান্তান্দারের বিপক্ষে গোলটির দিকে তাকালেই বোঝা যায়, কতটা কঠিন ছিল কাজটি। হাডলস্ট্যাটসবম্বের হিসাব অনুযায়ী, বক্সের বাইরে থেকে পাওয়া ওই সুযোগটির গোল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। গোল থেকে দূরত্ব ছিল ১৮ মিটারের কিছু বেশি। বলের উচ্চতা, গোলরক্ষকের অবস্থান এবং সামনে এগিয়ে এসে শট ঠেকানোর চেষ্টা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে এই সম্ভাবনা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু দিয়োমান্দের শট সেই সম্ভাবনাকে বদলে দেয়। শট নেওয়ার পর গোল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৬ শতাংশে। অর্থাৎ, খুব একটা সম্ভাবনাময় না হওয়া একটি সুযোগকে প্রায় ২০ গুণ বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছিলেন তিনি। তাঁর শটের নিখুঁত লক্ষ্যভেদই এই পার্থক্য গড়ে দেয়।
গোল করার বিরল দক্ষতা
২২ দিনে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে করা চারটি গোলের প্রতিটিতেই ছিল অসাধারণ নিখুঁত ফিনিশিং। গোল করার সম্ভাবনা পরিমাপের হিসাবে প্রতিটি শটেই তিনি মূল সুযোগের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬০-এর বেশি সম্ভাবনা যোগ করেছেন। এই চারটি গোল করতে দিয়োমান্দে যা করেছেন, গত মৌসুমে জার্মান বুন্দেসলিগায় আরবি লাইপজিগের হয়ে ৩৩ ম্যাচ খেলেও এমন কৃতিত্ব দেখাতে পেরেছিলেন মাত্র তিনবার। অর্থাৎ, ২২ দিনে চারবার সেই কাজ করে ফেলেছেন তিনি।
ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচটি তাই শুধু দিয়োমান্দের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত নয়, রিয়াল মাদ্রিদের মৌসুমের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বদলে গেছে ভিনিসিয়ুসের অবস্থান। সালিবার চুল টানার ঘটনায় সরাসরি লাল কার্ড দেখার পর চার ম্যাচ নিষিদ্ধ হয়েছিলেন ব্রাজিলিয়ান তারকা। সেই সুযোগেই বাঁ প্রান্তে নিজের জায়গা পাকা করার লড়াই শুরু করেন দিয়োমান্দে। অথচ রিয়ালে তার শুরুর দিনগুলো ছিল বেশ নীরব। দলবদল নিয়ে আলোচনার কারণে লাইপজিগে পুরোপুরি প্রস্তুতি নিতে পারেননি তিনি। নতুন মৌসুমে রিয়ালের প্রথম পাঁচ ম্যাচে তাকে বসে থাকতে হয় বেঞ্চে। এত বড় ক্লাবে নতুন খেলোয়াড় হিসেবে কোচ হোসে মরিনিওর সতর্কতাও ছিল স্বাভাবিক। পাশাপাশি মাঠের বাইরের স্বভাবও তার খেলায় প্রভাব ফেলেছিল।
দলের অনুশীলন ও দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত এক সূত্রের ভাষ্য, শুরুতে মাঠের বাইরের সংকোচ মাঠেও দেখা যাচ্ছিল দিয়োমান্দের মধ্যে। তবে মরিনিও তাকে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন। ব্যক্তিগত আলোচনায় বুঝিয়ে দেন, তাঁর কল্পনাশক্তি ও সাহসী ফুটবল দেখেই ক্লাব তাকে নিয়ে এত বড় বিনিয়োগ করেছে। লাইপজিগ থেকে দিয়োমান্দেকে কিনতে রিয়াল খরচ করেছে ১২ কোটি ৫০ লাখ ইউরো। বিভিন্ন শর্ত পূরণ হলে আরও দেড় কোটি ইউরো দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। ক্লাবটির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দামে কেনা খেলোয়াড় এখন তিনিই।
এরপর রায়ো ভায়েকানো ও এলচের বিপক্ষে পরপর দুটি ম্যাচে শুরুর একাদশে জায়গা পান দিয়োমান্দে। তবে দুই ম্যাচেই তাকে খেলতে হয় ডান প্রান্তে, বাঁ দিকে ছিলেন ভিনিসিয়ুস। মেত্রোপলিতানোতে আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে ডার্বিতে আবারও বেঞ্চে ফিরে যান তিনি। রিয়ালের হয়ে প্রথম আট ম্যাচে তার খেলার ধরন ছিল কিছুটা সতর্ক। প্রতি ৯০ মিনিটে শট নেওয়ার সংখ্যা ছিল ১ দশমিক ১টি। অথচ লাইপজিগে গত মৌসুমে এই সংখ্যা ছিল ১ দশমিক ৮। তবে ড্রিবলিংয়ে নিজের সাহস হারাননি। প্রতি ৯০ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ বার প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা লাইপজিগে তার পরিসংখ্যানের সমান।
তবু নিজের সবচেয়ে বড় গুণটি তখনো পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি—গোল করার দক্ষতা।
লাইপজিগে ১৮ বছর বয়সে বুন্দেসলিগায় পা রেখেই এই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন দিয়োমান্দে। গত মৌসুমে মাত্র ৭ এক্সপেক্টেড গোলের সুযোগ থেকে করেছেন ১২ গোল। অর্থাৎ, সুযোগের মান যা বলছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি গোল করেছেন তিনি। এই জায়গায় তার সঙ্গে তুলনা টানা যায় হ্যারি কেইনের। হাডলস্ট্যাটসবম্বের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেটপিস থেকে পাওয়া সুযোগগুলোকে গোলের সম্ভাবনায় রূপান্তর করার ক্ষেত্রে কেইন ও দিয়োমান্দে দুজনই দারুণ দক্ষ। প্রতি সুযোগে কেইন গড়ে শূন্য দশমিক ০৭ এবং দিয়োমান্দে শূন্য দশমিক ০৮ এক্সপেক্টেড গোল যোগ করেছেন। গত মৌসুমে দুজনই নিজেদের সুযোগের মানের তুলনায় ১ দশমিক ৭ গুণ বেশি গোল করেছিলেন।
অর্থাৎ, গোল করার এই অসাধারণ ক্ষমতা দিয়োমান্দের মধ্যে আগে থেকেই ছিল। কিন্তু নতুন ক্লাবে শুরুর সংকোচ আর বিপুল ট্রান্সফার ফির চাপের আড়ালে সেটি ঢাকা পড়ে ছিল।

ভিয়ারিয়াল ম্যাচেই বদলে গেল গল্প
ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচে সেই চিত্র পাল্টাতে শুরু করে। মরিনিও ভিনিসিয়ুসকে বেঞ্চে রেখে বাঁ প্রান্তের দায়িত্ব দেন দিয়োমান্দেকে। ব্রাজিলিয়ান তারকা যে জায়গায় খেলেই নিজের ক্যারিয়ার গড়েছেন, সেখানে নতুন একজনকে সুযোগ দেওয়াটা ছিল বড় সিদ্ধান্ত। আর সেই সিদ্ধান্তের জবাব মাঠেই দিয়েছেন আইভরিয়ান তরুণ। রিয়ালের হয়ে তার প্রথম গোলটিই ছিল পরিবর্তনের সূচনা। ডান প্রান্তে সরে যেতে থাকা ফেদেরিকো ভালভের্দে বাড়িয়ে দেন একটি থ্রু পাস। দিয়োমান্দে নিচু শটে বল পাঠান গোলরক্ষক গুলাচির ডান দিক ঘেঁষে জালে। সুযোগটির গোল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল মাত্র ১৮ শতাংশ। কিন্তু তাঁর নিখুঁত শটে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮২ শতাংশে। এর চার দিন পর রোমার বিপক্ষে স্টাদিও অলিম্পিকোয় নাটকীয় জয়ে গোল পাননি তিনি। তবে তার পরের চার দিনেই সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে সেভিয়ার বিপক্ষে আবারও জ্বলে ওঠেন। বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শটে বল জালে পাঠান। শটটি ছিল বিদ্যুতের ঝলকের মতো। গোলরক্ষক ভ্লাচোদিমোসের কিছুই করার ছিল না। মাত্র ৮ শতাংশ সম্ভাবনার একটি সুযোগকে তিনি পরিণত করেন ৬৮ শতাংশ সম্ভাবনার শটে।
এরপর চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজের সাবেক ক্লাব লাইপজিগের বিপক্ষে ম্যাচ। ভিনিসিয়ুসের খেলার সুযোগ থাকায় সেদিন আবারও বেঞ্চে বসতে হয় দিয়োমান্দেকে। তবে তাতে তার ছন্দ নষ্ট হয়নি। ম্যাচের ৭০ মিনিটে ভিনিসিয়ুসের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন। ৮৭ মিনিটে ডান পায়ের দুর্দান্ত ভলিতে বল পাঠান গোলের ওপরের কোণে।
ব্রাহিম দিয়াজের পাস থেকে পাওয়া সুযোগটির গোল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল মাত্র ৭ শতাংশ। কিন্তু দিয়োমান্দের শট সেটিকে পরিণত করে ৭১ শতাংশ সম্ভাবনার গোলে।
রোববার রেসিং সান্তান্দারের বিপক্ষে আবারও একই দৃশ্য। বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শটটি গোলের ওপরের কোণে গিয়ে জড়ায়। গ্যালারিতে বিস্ময়, সতীর্থদের উচ্ছ্বাস। বেলিংহামও মনে করিয়ে দেন লাইপজিগের বিপক্ষে সেই ভলির কথা।
ম্যাচের পর বেলিংহাম বলেন, ‘অবিশ্বাস্য! আমি জানতামই না, সে এভাবে শট নিতে পারে। লাইপজিগের বিপক্ষে গোলটির মতোই দুর্দান্ত। সে বিশেষ একজন খেলোয়াড়।’
স্প্যানিশ ভাষায় ক্রমেই সাবলীল হয়ে ওঠা বেলিংহামের কথায় ছিল সতীর্থের প্রতি মুগ্ধতা। আর সেই মুগ্ধতার পেছনে কারণও আছে। মাত্র তিন সপ্তাহে চারটি অসাধারণ গোলের পাশাপাশি তিনটি গোলে সহায়তা করেছেন দিয়োমান্দে।
রিয়ালে আসার পর প্রথম দিকে যাঁকে নিয়ে ছিল বিপুল প্রত্যাশা আর কিছুটা সংশয়, তিনিই এখন নিজের খেলার মাধ্যমে সেই প্রত্যাশার উত্তর দিচ্ছেন। ১৯ বছর বয়সে তার এই উত্থান কেবল চারটি গোলের গল্প নয়; এটি নিজের সামর্থ্য চিনে নেওয়া, সাহস ফিরে পাওয়া এবং বড় মঞ্চে নিজের জায়গা তৈরি করে নেওয়ার গল্প।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









