ইসরায়েলে নির্বাচনের ফল কোনো পক্ষকেই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেয়নি। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট—দুজনের কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের। তিনিই ঠিক করবেন, প্রথমে কাকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হবে।
কিন্তু এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমর্থন ছাড়া কি দেশটিতে নতুন সরকার গঠন সম্ভব? আর সেই সমর্থন নিয়েই যদি আইজেনকট এগিয়ে থাকেন, তাহলে তাদের সরকারে জায়গা দিতে তার আপত্তি কেন?
২৯ অক্টোবরের নির্বাচনে কোনো দল বা জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দলীয় নেতাদের পরামর্শ শেষে দেখা যায়, ৬৭ জন আইনপ্রণেতা আইজেনকটকে সমর্থন জানিয়েছেন। নেতানিয়াহুর পক্ষে ছিলেন ৪৬ জন। সংখ্যার হিসাবে আইজেনকট এগিয়ে থাকলেও তাঁর এই অগ্রগতির পেছনে রয়েছে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমর্থন। অথচ তাদের সরকারে নেওয়ার সম্ভাবনা তিনি নাকচ করে দিয়েছেন।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব, ক্ষমতার অনিশ্চয়তা
নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও ধর্মীয় জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। আইজেনকটকে সমর্থন জানানো চারটি ইহুদি-নেতৃত্বাধীন দলের আসন ৪৮। অন্যদিকে আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর হাতে রয়েছে ১৯টি আসন—ইসরায়েলের নির্বাচনী ইতিহাসে যা রেকর্ড।
নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের মিত্র ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম এবার তার পক্ষে সমর্থন জানায়নি। অতি-অর্থডক্স ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে নেতানিয়াহুর জোট—এ অভিযোগেই দলটি দূরত্ব বজায় রেখেছে। তবে শাসে পার্টি বুধবার নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানিয়েছে।
আইজেনকটের সামনে অন্য হিসাব। আরব দলগুলোর ১৯টি আসন যুক্ত হলে তার পক্ষে ৬৭ সদস্যের সমর্থন তৈরি হয়। কিন্তু তিনি তাদের নিয়ে সরকার গড়তে চান না। ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাস—এই দুই অতি-অর্থডক্স দলকে পাশে পেলে তার আসনসংখ্যা ৬১-তে পৌঁছাবে। ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম সমর্থনের দরজা খোলা রেখেছে, তবে বিনিময়ে কী চায়, তা স্পষ্ট। শাসে ইতিমধ্যে নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়েছে।

নেতানিয়াহুর জন্যও পথ সহজ নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে তাকে বিরোধী শিবিরের কোনো দলকে নিজের দিকে টানতে হবে। আইজেনকটের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার একটি সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু নেতানিয়াহুর বিরোধীদের অনেকেই তার অধীনে সরকারে কাজ করতে রাজি নন।
সমর্থন আছে, প্রতিনিধিত্ব নেই
আরব-নেতৃত্বাধীন দল দুটি হলো জয়েন্ট লিস্ট এবং ইউনাইটেড আরব লিস্ট—রাআম। তাদের আসন যথাক্রমে ১১ ও ৮। রাআম আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিতে প্রস্তুত। জয়েন্ট লিস্ট সরাসরি সরকারে না গিয়ে বাইরে থেকে তাকে সমর্থন দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। কিন্তু আইজেনকটের শর্ত রয়েছে। সরকারে জায়গা পেতে হলে দলগুলোকে হামাসকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। রাআমের নেতা মানসুর আব্বাস হামাসের নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে কথা বলেছেন, কিন্তু সংগঠনটিকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিতে রাজি হননি।
ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য সব সময় ৬১টি আসন প্রয়োজন হয় না। প্রস্তাবিত সরকার পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে জয়ী হলে ৬১টির কম আসন নিয়েও প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্ভব। ফলে আরব দলগুলোর বাইরের সমর্থন আইজেনকটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পরে সামরিক বাহিনীতে অতি-অর্থডক্সদের নিয়োগের প্রশ্নে ছাড় দিয়ে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা করতে পারেন।
তবে এই রাজনৈতিক সমীকরণে একটি গভীর বৈপরীত্য স্পষ্ট। ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোট ও সমর্থন সরকার গঠনের হিসাব বদলে দিতে পারে, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব মেনে নিতে অনীহা রয়েছে ইসরায়েলের প্রধান দলগুলোর একাংশের। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতাকে ‘ইসরায়েলের জন্য বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়েছে। আইজেনকটের কয়েকজন মিত্রও তাদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করার বিরোধিতা করেছেন। জয়েন্ট লিস্টের জ্যেষ্ঠ নেতা আহমেদ তিবি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন, আরব প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাজনৈতিক অংশীদারত্ব প্রত্যাখ্যান করা হলে প্রমাণ হবে, ইসরায়েল সব নাগরিকের সমান অধিকারের গণতন্ত্র নয়; বরং একটি ‘জাতিতান্ত্রিক রাষ্ট্র’।
ফিলিস্তিনিদের দাবি কী?
আরব দলগুলোর প্রথম লক্ষ্য নেতানিয়াহুর শাসনের অবসান। জয়েন্ট লিস্ট বলেছে, আইজেনকটকে তাদের সর্বসম্মত সমর্থন জনদাবিরই প্রতিফলন—নেতানিয়াহু ও তার সরকারকে আর ক্ষমতায় ফিরতে দেওয়া যাবে না। তবে এই সমর্থন আইজেনকটের বিরোধী জোটের প্রতি নিঃশর্ত আস্থা নয়।

বিনিময়ে তারা ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জন্য কিছু নিশ্চয়তা চাইছে: বাড়িঘর ভাঙা বন্ধ, বিদ্বেষমূলক উসকানি মোকাবিলা, অপরাধ দমন এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সুস্পষ্ট উদ্যোগ। তিবি স্বীকার করেছেন, নতুন সরকার ইসরায়েলের যুদ্ধনীতি বদলে দেবে কিংবা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে—এমন প্রত্যাশা তাদের নেই। তবে একটি ‘সংস্কারমূলক সরকার’ ফিলিস্তিনি নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন কিছুটা উন্নত করতে পারে।
রাআমের নেতা আব্বাসের কাছেও নেতানিয়াহুর পাশাপাশি কট্টর ডানপন্থী নেতা বেজালেল স্মোত্রিচ ও ইতামার বেন-গভিরকে ক্ষমতা থেকে সরানো অগ্রাধিকার।
অচলাবস্থার শেষ কোথায়?
হারজগের মনোনীত প্রার্থী সরকার গঠনের জন্য প্রথমে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন বাড়ানো যাবে। তিনি ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় একজনকে একইভাবে সুযোগ দেওয়া হবে। দ্বিতীয় প্রার্থীও ব্যর্থ হলে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য তৃতীয় কাউকে মনোনীত করতে পারবেন। তার জন্য সময় থাকবে ১৪ দিন।
সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে নেসেট ভেঙে দেওয়া হবে এবং ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তত দিন নেতানিয়াহুই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন।
ইসরায়েলবিষয়ক বিশ্লেষক নেহরু জামহুরের মতে, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থাই সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি—এবং নেতানিয়াহুর পছন্দের পথও সেটিই। নতুন নির্বাচন হলে বিরোধীরা দুর্বল হতে পারে, আর ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটদানের আগ্রহও কমে যেতে পারে—এমন হিসাব নেতানিয়াহু করছেন বলে তার ধারণা।
ইসরায়েলের এই ক্ষমতার লড়াই তাই কেবল দুই নেতার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতা নয়। এর ভেতরে রয়েছে নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক অধিকার এবং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। যে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সমর্থন ছাড়া একটি সরকার গঠনের হিসাব অসম্পূর্ণ থেকে যায়, সেই নাগরিকদেরই ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে মেনে নিতে অনীহা দেশটির রাজনীতির এক মৌলিক সংকটকে সামনে এনেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









