যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, পররাষ্ট্রনীতিতে সংযম এবং জননিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
শনিবার (৭ নভেম্বর) প্রকাশিত বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে ভ্যান্সও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নিজের বক্তব্যে প্রেসিডেন্টের নাম ও তার বিতর্কিত নীতিগুলোর উল্লেখ কমিয়ে দেন।
রয়টার্সের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরের রিপাবলিকান কনভেনশনের পর ভ্যান্সের দেওয়া অন্তত ছয়টি নির্বাচনী বক্তব্যে তিনি নিজের নীতিগত অবস্থানকে সামনে এনেছেন। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, পররাষ্ট্রনীতিতে সংযত অবস্থান এবং জননিরাপত্তা।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্সের ভিন্ন অবস্থান
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ভ্যান্স ইরান যুদ্ধকে দলের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পুনর্মূল্যায়ন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে বিবেচনার পরামর্শ দেন।
এটি ছিল যুদ্ধের অবসানের পক্ষে ভ্যান্সের অন্যতম স্পষ্ট প্রকাশ্য অবস্থান। ট্রাম্প যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন, সেখানে ভ্যান্সের বক্তব্য রিপাবলিকান শিবিরের ভেতরে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
তবে হোয়াইট হাউস ও ভ্যান্সের ঘনিষ্ঠ তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো উদ্যোগ নেননি ভ্যান্স। পোস্টটি প্রকাশের আগে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসও বিষয়টি জানতেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব ছিল বলে তিনি বুঝতে পারছেন। তবে যুদ্ধ নিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি ভ্যান্স। তবে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে তাকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভ্যান্সের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীর সমর্থন ধরে রাখা, একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর দায় থেকে নিজেকে কিছুটা আলাদা করা।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ মাইকেল রিচি মনে করেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে পাওয়া রাজনৈতিক মঞ্চ ব্যবহার করে ভ্যান্স ২০২৮ সালের নির্বাচনে দলের ভবিষ্যৎ নীতিগত বিতর্কের দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তবে তার রাজনৈতিক অবস্থানও নির্বাচনী পরাজয়ের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। যেসব অঙ্গরাজ্যে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন, সেখানেও দলটি পরাজিত হয়েছে। এ ছাড়া ওহাইওর গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী বিবেক রামাস্বামীর বিতর্কিত প্রচারকৌশলও দলের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিপাবলিকান শিবিরে মতপার্থক্য
নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে রিপাবলিকান নেতাদের মধ্যেও মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। সিনেটর টেড ক্রুজ মনে করেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়ে দলটি যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের মতে, নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীরা ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারেননি।
অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান জানাননি।
সব মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে দলটির ভেতরে নতুন মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভ্যান্স নিজের রাজনৈতিক পরিচয় কতটা স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, সেটিই এখন মার্কিন রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









