এক দশক আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় পশ্চিমা বিশ্বে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির এক প্রবল ঢেউ তুলেছিল। সেই ঢেউয়ের প্রভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদী ও অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোও ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারায় ভাঙন দেখা যাচ্ছে কি না, এখন সে প্রশ্নই সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয় ইউরোপের রাজনীতিতেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এপ্রিল থেকে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে জনতুষ্টিবাদী ডানপন্থী নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে। হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবানের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটেছে। সার্বিয়ায় আলেকসান্দার ভুচিচের দীর্ঘদিনের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিয়েছে ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন। ব্রাজিলে সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিওর ক্ষমতায় ফেরার পথও আটকে দিয়েছেন ভোটাররা।
বুদাপেস্টের পলিটিক্যাল ক্যাপিটাল ইনস্টিটিউটের পরিচালক পেতের ক্রেকো মনে করেন, ক্ষমতার ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ার লক্ষণ দৃশ্যমান হলে তা একের পর এক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। তার ভাষায়, ক্ষমতার ফাটল যত স্পষ্ট হয়, তার প্রভাব তত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ফ্রান্সে। ছয় মাস পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সেখানে জাতীয়তাবাদী ও অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির মুখ মেরিন লে পেন এখন জনমত জরিপে এগিয়ে। তিনি জয়ী হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন একটি দেশের নেতৃত্ব চলে যাবে উগ্র ডানপন্থীদের হাতে।
ট্রাম্পের পরাজয় লে পেনের রাজনৈতিক শিবিরকে বিচলিত করতে পারে। কিন্তু অন্যদিকে, হাঙ্গেরি থেকে সার্বিয়া পর্যন্ত ক্ষমতাসীন জনতুষ্টিবাদী নেতাদের বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভ তাকে আরও সুবিধা দিতে পারে। কারণ, তার ন্যাশনাল র্যালি পার্টি এখনো ফ্রান্সের জাতীয় সরকার পরিচালনা করেনি। ফলে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ভোটারদের যে অসন্তোষ, তার সরাসরি দায় লে পেনের ওপর পড়ছে না।
পরাজয়ের ধারায় উগ্র ডানপন্থীরা
ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের রাজনীতিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড্যাফনি হালিকিওপুলু বলেন, একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিতে উগ্র ডানপন্থীদের উত্থান ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতাগুলোর একটি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারায় বেশ কিছু ধাক্কা এসেছে।
গত দেড় বছরে রোমানিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, হাঙ্গেরি, সুইডেন, সার্বিয়া, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী, অভিবাসনবিরোধী কিংবা কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত দল ও নেতারা অন্তত আটবার বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। পর্তুগালে কট্টর ডানপন্থী আন্দ্রে ভেন্তুরাকে দুই-এক ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন মধ্যপন্থী সমাজতন্ত্রী আন্তোনিও হোসে সেগুরো। হাঙ্গেরিতে অরবানের ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটেছে। সার্বিয়ায় ভুচিচের বিরুদ্ধে জয় পেয়েছে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন। রোমানিয়ায় জাতীয়তাবাদী প্রার্থী জর্জ সিমিয়নকে হারিয়েছেন ইউরোপপন্থী মধ্যপন্থী নিকুশোর দান।
ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা অল্প ব্যবধানে হারিয়েছেন বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিওকে। নেদারল্যান্ডসে গিয়ার্ট ভিল্ডার্সের দল ১১টি আসন হারিয়েছে। সুইডেনেও উগ্র ডানপন্থী সুইডেন ডেমোক্র্যাটরা ১১টি আসন হারানোর পর বামঘেঁষা বিরোধীরা সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব বাথের রাজনীতি বিশ্লেষক অরেলিয়েন মঁদোঁর মতে, এসব ফলাফল দেখাচ্ছে, উগ্র ডানপন্থী রাজনীতি সব জায়গায় জনপ্রিয় নয়। এমনকি জার্মানির কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) একজন জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতাও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলকে বলসোনারো ও অরবানের পরাজয়ের ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে বিশ্লেষকদের সতর্কতা, এসব পরাজয়কে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির অবসান বলে ধরে নেওয়ার কারণ নেই। পোল্যান্ড, চিলি ও কলম্বিয়ায় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে জনতুষ্টিবাদী প্রার্থীরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।
ফ্রান্সের দিকে সবার নজর
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফলকে ইউরোপের মধ্য-বামপন্থী রাজনীতিকেরা আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছেন। ফ্রান্সের মধ্য-বামপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রাফায়েল গ্লুকসম্যান বলেছেন, রাজনীতিতে কোনো কিছুই অবধারিত নয়। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ফলাফল সবার জন্য আশার বার্তা। অন্যদিকে, ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখছে লে পেনের দল। গত বছর ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফেরাকে স্বাগত জানিয়েছিল ন্যাশনাল র্যালি। কিন্তু এখন দলটির সভাপতি জর্দান বারদেলা বলছেন, অন্য দেশের ঘটনা তাদের বিষয় নয়। দলের এক নেতা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফলকে ট্রাম্পের নীতির প্রত্যাখ্যান বলে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির উচ্চ দাম এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাবই রিপাবলিকানদের পরাজয়ের বড় কারণ।
লে পেনের সামনে অবশ্য আরেকটি আইনি বাধা রয়েছে। অর্থ আত্মসাতের মামলায় দণ্ডিত হওয়ার বিরুদ্ধে তার আপিলের রায় আগামী এপ্রিলের শুরুতে দেওয়ার কথা। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটের কয়েক সপ্তাহ আগে এই রায় তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। আদালত তার বিরুদ্ধে রায় দিলে ইলেকট্রনিক নজরদারি যন্ত্র পরে তাকে নির্বাচনী প্রচার চালাতে হতে পারে। এমনকি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগও হারাতে পারেন তিনি। তবে লে পেনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কে হবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কট্টর বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ, মধ্য-ডানপন্থী সাবেক প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার ফিলিপ এবং গ্লুকসম্যান—সবাই সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী।
পরাজয় মানেই রাজনৈতিক প্রভাবের অবসান নয়
বিশ্লেষকদের মতে, উগ্র ডানপন্থীরা নির্বাচনে হারলেও তাদের রাজনৈতিক প্রভাব অটুট থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মূলধারার দলগুলোই তাদের অভিবাসনবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী অবস্থানের কিছু অংশ গ্রহণ করছে। ব্রিটেনে লেবার পার্টি অভিবাসন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকারের সমর্থনে সিনেটে পাস হওয়া একটি বিলের মাধ্যমে সহিংস গোষ্ঠীর সদস্যদের জরিমানা এবং তাদের পরিবারের ভাতা থেকে অর্থ কেটে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ধরনের প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে লে পেনের রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ ছিল।
বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মঁদোঁর মতে, মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্ব উগ্র ডানপন্থীদের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হচ্ছে—এটাই বড় বিপদ। মাখোঁর এক দশকের শাসনে উগ্র ডানপন্থীদের অনেক বক্তব্যই এখন মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। লে পেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের শিক্ষা তাই কিছুটা ভিন্নও হতে পারে। জনতুষ্টিবাদীরা পরাজিত হচ্ছে—এটাই একমাত্র সত্য নয়; ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধেও ভোটারদের ক্ষোভ বাড়ছে। ২০২৪ সালে উন্নত দেশগুলোর জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া ক্ষমতাসীন দলগুলোর প্রত্যেকটিই ভোটের ভাগ হারিয়েছিল—এমন তথ্য উঠে এসেছে ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্লগভ তথ্যভান্ডারে।
ফ্রান্সে মাখোঁর শাসন নিয়ে অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা লে পেন ও মেলঁশোঁ—দুজনেরই পক্ষে কাজ করছে। ২০১৭ ও ২০২২ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের ভোটাররা একজোট হয়ে লে পেনকে ঠেকিয়েছিলেন। এবারও সেই বাধা টিকে থাকবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা দেখিয়েছেন, ক্ষমতায় থাকা জনতুষ্টিবাদী নেতাদের পরাজিত করা সম্ভব। ফ্রান্সের নির্বাচন দেখাবে, ক্ষমতায় আসার আগেই তাদের থামানো যায় কি না। হালিকিওপুলুর কথায়, ট্রাম্পের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ছিল বড় ধাক্কা—নিশ্চয়ই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি এখনো ক্ষমতায় আছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









