প্রায় ৭ হাজার ৩০০ বছর আগে জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের কাছে সমুদ্রের নিচে ভয়াবহ এক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছিল। কিকাই-আকাহোয়া নামে পরিচিত এই অগ্ন্যুৎপাত ছিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী। বিস্ফোরণের তীব্রতা ছিল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত পরিমাপের আট ধাপের সূচকে সাত। ভূমিকম্প, বিশাল সুনামি এবং কয়েক মিটার পুরু আগ্নেয় ছাইয়ে ঢেকে গিয়েছিল আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা।
তখন জাপানে বাস করত জোমন জনগোষ্ঠী। তারা মূলত শিকার, মাছ ধরা ও বুনো খাবার সংগ্রহ করে জীবন চালাত। এমন বিপর্যয়ের পর তাদের সমাজ কীভাবে টিকে ছিল, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলেছে।
‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত নতুন গবেষণায় আন্তর্জাতিক একদল বিজ্ঞানী সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা জাপানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা ৫৪০টি প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা বিশ্লেষণ করেছেন। নমুনাগুলোর বয়স ছিল অগ্ন্যুৎপাতের কয়েক হাজার বছর আগে থেকে শুরু করে কয়েক শ বছর পর পর্যন্ত। কাঠকয়লা ও হাড়ের মতো নিদর্শনের রেডিওকার্বন বয়স নির্ণয় করে তারা বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের বসতি ও কর্মকাণ্ডের পরিবর্তন বোঝার চেষ্টা করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, অগ্ন্যুৎপাতের সবচেয়ে কাছের কিছু এলাকা দীর্ঘ সময়ের জন্য মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সব জায়গায় পরিস্থিতি এক রকম ছিল না। কোথাও মানুষ নতুন এলাকায় চলে গেছে, কোথাও নতুন দক্ষতা শিখেছে, আবার কোথাও জীবনযাপনের ধরন বদলে ফেলেছে।
গবেষকদের ধারণা, দক্ষিণ কিউশুর কিছু এলাকায় অগ্ন্যুৎপাতের আগেই জোমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমছিল। অন্যদিকে দ্বীপটির উত্তরে জনবসতি বাড়ছিল, এবং বিপর্যয়ের পরও সেই প্রবণতা বজায় ছিল। এর একটি ব্যাখ্যা হতে পারে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ নিরাপদ অঞ্চলে চলে গিয়েছিল।
সমুদ্রের প্রাণীজগৎ তুলনামূলক দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ফলে স্থলভাগের কিছু মানুষ উপকূলে গিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ পেয়েছিল বলে মনে করেন গবেষকেরা।

তবে জাপানের দূরবর্তী কিছু এলাকাতেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি থেমে যায়। এর কারণ হতে পারে অগ্ন্যুৎপাতের পর সাময়িক জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যের সংকট কিংবা ছাইয়ে ঢাকা চারণভূমিতে হরিণ ও বুনো শূকরের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন।
গবেষণাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বড় বিপর্যয়ের পর মানুষের ইতিহাস শুধু ধ্বংসের গল্প নয়। মানুষ স্থান বদলায়, নতুন সম্পর্ক গড়ে, কাজের ধরন পাল্টায় এবং বেঁচে থাকার নতুন পথ খুঁজে নেয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকা আজকের পৃথিবীতেও এই প্রাচীন অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









