অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ সিডনির একটি বড় মসজিদে তীব্র বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন। লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষুব্ধ মুসল্লিরা তাকে ‘গণহত্যার সমর্থক’সহ বিভিন্ন অপমানজনক মন্তব্য করে মসজিদ থেকে বের করে দেন।
ঘটনাটি ঘটে সিডনির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত লাকেম্বা মসজিদ-এ, যেখানে রমজানের শেষ উপলক্ষে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুষ্ঠান চলাকালেই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং ধর্মীয় পরিবেশ মুহূর্তেই রাজনৈতিক প্রতিবাদে রূপ নেয়। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন মুসল্লি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে ‘গণহত্যার সমর্থক’ বলে চিৎকার করছেন এবং তাকে মসজিদ থেকে বের করে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। যদিও উপস্থিত কিছু মানুষ আবার তাদের স্বাগতও জানান।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মসজিদের সেক্রেটারি গামেল খেইর সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং পবিত্র স্থানের মর্যাদা রক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তবে তার আহ্বান চিৎকার ও উত্তেজনার মধ্যে হারিয়ে যায়।
এক পর্যায়ে মসজিদের ভেতরে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। এমনকি একজনের চিৎকার থামাতে অন্য একজনকে তার মুখ চেপে ধরতেও দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত আলবানিজকে মসজিদের প্রশাসনিক কক্ষে নিয়ে যান এবং পরে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দেন।
প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর এলাকা ত্যাগ করার সময় কিছু মুসল্লিকে ‘লজ্জা! লজ্জা!’ স্লোগান দিতে শোনা যায়। এছাড়া ‘আলবা-তিজি’ নামের একটি অপমানজনক স্লোগানও ব্যবহার করা হয়, যা তার নামের সঙ্গে আরবি ভাষার একটি অবমাননাকর শব্দের সংমিশ্রণ।
উল্লেখ্য, সাধারণত এই ধরনের অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতারা বক্তব্য দেন। তবে এ বছর মসজিদ কর্তৃপক্ষ আলবানিজকে শুধু উপস্থিত থেকে বক্তব্য শোনার অনুরোধ জানিয়েছিল বলে জানিয়েছে সিডনি মর্নিং হেরাল্ড।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় মধ্যপ্রাচ্য-সম্পর্কিত রাজনীতিকে ঘিরে বাড়তে থাকা অসন্তোষ। সিডনির লাকেম্বা এলাকা দীর্ঘদিন ধরে লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি হলেও গাজা ও লেবানন যুদ্ধ নিয়ে সরকারের অবস্থানের কারণে সেখানে অসন্তোষ বাড়ছে।
এই উত্তেজনা আরও বাড়ে ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন সিডনির টাউন হলে একটি বিক্ষোভ চলাকালে নামাজরত মুসলমানদের সরিয়ে দেয় পুলিশ। ওই বিক্ষোভটি ছিল ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ-এর সফরের বিরোধিতায়।
এছাড়া গত ডিসেম্বর বন্ডি বিচ এলাকায় একটি সন্ত্রাসী হামলার পর দেশে ইসলামবিদ্বেষী ঘটনার সংখ্যাও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক মুসলমান মনে করেন, সরকার তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পাস হওয়া ‘কম্ব্যাটিং এন্টি-সেমিটিজম, হেট অ্যান্ড এক্সট্রিমিজম’ আইনও এই ক্ষোভের একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি এই আইনের আওতায় হিজবুত তাহরির-কে ‘নিষিদ্ধ ঘৃণামূলক সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে সংগঠনটির সদস্য হওয়া এখন ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ।
সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপ মুসলিম সম্প্রদায়ের ভিন্নমতকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়েছে, যদিও ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ঘটনার পর অ্যান্থনি আলবানিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ছবি শেয়ার করেন, যেখানে তাকে উপস্থিত মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে করমর্দন করতে দেখা যায়। তিনি ঘটনাটিকে বড় করে দেখেননি।
তার ভাষায়, সামগ্রিকভাবে অভ্যর্থনা ইতিবাচক ছিল এবং কেউ তাকে বাধা দেয়নি। তিনি বলেন, “আমাদের সেখানে বসে থাকার সুযোগ হয়েছিল এবং সম্প্রদায়ের মানুষরাই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। অধিকাংশ মানুষ এমন ঘটনা চাননি।”
এই ঘটনা অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনকে সামনে এনে দিয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে সরকারের অবস্থান যে দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশে গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তথ্যসূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









