কায়রোর কেন্দ্রস্থলে রাস্তার পাশের ক্যাফেতে ডমিনো খেলায় মগ্ন ছিলেন আবু আলি। কিন্তু হঠাৎ নিভে যায় আলো। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ইরান যুদ্ধের কারণে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় কমাতে সরকার আগেভাগে দোকান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। কায়রো থেকে এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
৬৩ বছর বয়সী আবু আলী এএফপিকে বলেন, ‘আগে রাত দুইটা পর্যন্ত এখানে বসে থাকতাম।’ অন্ধকার হয়ে যাওয়া রাস্তার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন বড়জোর ১১টায় বাড়ি ফিরি। বসে বসে শুধু খবর দেখি। এটা আমাদের চেনা কায়রো না।’
গত সপ্তাহে জারি করা এক মাসের এই নির্দেশে সপ্তাহের কার্যদিবসগুলোতে রাত ৯টা এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে রাত ১০টার মধ্যে সব দোকান বন্ধ করতে বলা হয়েছে। তবে কপটিক ইস্টারের ছুটিতে এই সময়সীমা রাত ১১টা পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে বলে জানা গেছে। রাত-জাগা কায়রোবাসীর জন্য এটা এক বড় ধরনের ধাক্কা।
এই শহরে বৃহস্পতিবারের রাতগুলো সাধারণত থাকে উৎসবমুখর। পরিবার নিয়ে মানুষ বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়, কিশোর-কিশোরীরা আইসক্রিমের দোকানে আড্ডায় মেতে ওঠে, ক্যাফেগুলো থেকে ভেসে আসে গানের সুর; ভোর না হওয়া পর্যন্ত যেনো শেষ হয় না সেই আনন্দ। কিন্তু এখন সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় তাড়াহুড়া। ফ্লুরোসেন্ট বাতি নেভার আগেই দ্রুত কেনাকাটা সেরে ফেলার শেষ চেষ্টা। ফ্লুরোসেন্ট বাতি নিভে গেলে দ্রুত নেমে আসে শাটার।
সরকার পুলিশ টহল দিয়ে নিশ্চিত করছে নির্দেশ মানা হচ্ছে কি না। রাত বাড়লে শুধু ডেলিভারির স্কুটারগুলো ছুটে বেড়ায় অন্ধকার রাস্তায়। পোশাকের দোকানের কর্মী আলী হাগাগ হঠাৎ নিরিবিলি হয়ে যাওয়া নিজের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘এই সময়টাতেই তো আসলে কাজ শুরু হত।’
‘ঘুমহীন শহর’ বলে বিখ্যাত, কায়রোকে এখন ‘ফের কোভিডের সময়ের মত মনে হচ্ছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আলী হাগাগ জানান, ২০২০ সালের লকডাউনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে তার, তখনও রাস্তাঘাট এভাবেই ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল।
আয় কমছে
সচ্ছল কায়রোবাসী নীলনদের তীরের রেস্তোরাঁ ও আন্তর্জাতিক মানের হোটেলগুলোতে ভীড় করছেন। কারণ, পর্যটন প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেগুলো সরকারি নির্দেশের আওতার বাইরে। কিন্তু ছোট ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যেই হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছেন চাপটা। হাগাগের হিসাব, মাত্র কয়েক দিনেই তার দোকানের আয় অর্ধেকের বেশি কমে গেছে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, আমদানি করা জ্বালানির ওপর দেশের ব্যাপক নির্ভরশীলতার কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ছে।
প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা মাদবুলি জানান, জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে মিসরের মাসিক জ্বালানি আমদানি ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দেশটির বার্ষিক ২০ বিলিয়ন ডলারের তেল বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সরকার বেশ কিছু 'বিশেষ' পদক্ষেপ নিয়েছে। সেগুলো হল-জ্বালানির দাম বাড়ানো, সরকারি প্রকল্পের গতি কমানো, রোববার দূর থেকে কাজ করার ব্যবস্থা চালু এবং সড়কে আলো কমিয়ে দেওয়া। সমালোচকরা বলছেন, আগেভাগে দোকান বন্ধের এই নিয়মে সবচেয়ে বেশি মার খাচ্ছে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীনৈতিক খাত, যেখানে দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের কর্মসংস্থান।
অর্থনীতিবিদ ওয়ায়েল এল-নাহাস এএফপিকে বলেন, লাখো ছোট ব্যবসা সন্ধ্যার পরে আসা ক্রেতাদের ওপর নির্ভর করে চলে। সেই সময় কমিয়ে দিলে আয়ের পথও কমে যায়।’
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মিসরীয় পাউন্ড ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। ডলারের বিপরীতে পাউন্ডের দাম রেকর্ড ৫৪.৩-এ পৌঁছেছে। মার্চে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে।
শহরের আরেকটি ক্যাফের মালিক জানান, এখন কর্মীদের পালা করে ডিউটি দিতে হচ্ছে। ‘অর্ধেক কর্মী একদিন কাজ করে, পরের দিন বাড়িতে বসে থাকে’ বলেও জানান তিনি।
তবে কেউ কেউ আশাবাদী। ৬৭ বছর বয়সী এসাম ফরিদ বলেন, ‘মানুষ মানিয়ে নেবেই।’
কোনো কোনো কফি শপ কোভিড সময়ের পুরনো কৌশলে ফিরে গেছে। আলো কমিয়ে, শাটার অর্ধেক নামিয়ে ভেতরে গ্রাহক রাখা হচ্ছে। বাইরে একজন নজর রাখছে পুলিশ এলে সতর্ক করতে।
শহরের আবহ হারিয়ে যাচ্ছে- এই পরিবর্তনে বড় ধাক্কা খেয়েছে দুটি খাত—চলচ্চিত্র ও পর্যটন। চলচ্চিত্র প্রযোজক গ্যাবি খৌরি বলেন, সিনেমা হলগুলোর আয় ৬০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘বক্স অফিসের বেশিরভাগ আয় আসে রাত ৯টা থেকে মধ্যরাতের শো থেকে। এটা বিপর্যয়কর পরিস্থিতি।’
বেশ কিছু চলচ্চিত্রের মুক্তির তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর কিছু প্রযোজনা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিদেশি মুদ্রার অন্যতম উৎস পর্যটন খাতও বড় ধাক্কার আশঙ্কা করছে।
লাক্সর ও আসওয়ানের মত রিসোর্ট শহরগুলো এই নির্দেশের আওতামুক্ত হলেও কায়রোর ঐতিহাসিক পর্যটন স্থান—যেমন শতাব্দীপ্রাচীন খান এল-খলিলি বাজার রয়েছে নির্দেশনার মধ্যেই।
রাত ৯টার আগেই দোকানিরা পণ্য গুছিয়ে আলো নিভিয়ে শাটার নামিয়ে দেন। অথচ তখনও পর্যটকেরা অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
দোকানি আহমেদ আলী এএফপিকে বলেন, ‘এখন প্রায় রাত ৮টা, পর্যটকরা এখনও আসছেন। রাত ৯টায় বন্ধ করব কীভাবে? এক ঘণ্টায় কি পর্যটকরা সব দেখে যেতে পারবেন? এটা অযৌক্তিক।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পর্যটন কর্মকর্তা বলেন, ‘আরব পর্যটকরা বিশেষ করে কায়রোর প্রাণচাঞ্চল্যের জন্যই আসেন। মিসরীয়রা আগেভাগে ঘরে ফিরে গেলে আবহটাই হারিয়ে যাবে। তখন পর্যটকরা বিকল্প স্থান খুঁজতে শুরু করবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









