লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১০ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়েছে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরপরই বাস্তুচ্যুতরা দক্ষিণ লেবাননে তাদের বসতবাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করেছেন। এই যুদ্ধবিরতিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাত অবসানে ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ তেহরান শুরু থেকেই শর্ত দিয়েছে, যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে আগে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে।
ইসরায়েল ও লেবাননের এই অস্ত্রবিরতির খবরে এখন স্থায়ীভাবে ইরান যুদ্ধ বন্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির আশা করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাঁর বক্তব্যে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পরিস্থিতি তৈরি হলে তিনি নিজেই পাকিস্তান সফর করবেন। উভয়পক্ষ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর ‘খুব কাছাকাছি’ পর্যায়ে আছে।
আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের প্রেসিডেন্ট একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর গভীর অবিশ্বাস ও অতীতের চুক্তি লঙ্ঘনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ইরান এবার সমঝোতার পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে তিনি বেশ স্পষ্ট করেই বলেছেন, বর্তমানে তাদের কাছে ‘জাতীয় স্বার্থই’ সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এমন মন্তব্যকে অনেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও লেবাননে যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তারা এটিকে তেহরান-ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া আগের সমঝোতার একটি অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থ্যাৎ, তেহরানের দৃষ্টিতে লেবাননের যুদ্ধবিরতি পৃথক কিছু নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিরই অংশ।
তেহরান থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক তৌহিদ আসাদি লিখেছেন, পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে কিছু ইতিবাচক সংকেত থাকলেও বাস্তবে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বেশকিছু অমীমাংসিত ও জটিল বিষয় রয়ে গেছে। সেগুলো নিরসনে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন।
অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে আছে- ইউরেনিয়ামের মজুত ও পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, হরমুজ প্রণালি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর বিধিনিষেধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক।
তৌহিদ আসাদি লিখেছেন, দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্যের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ। এটি স্পষ্ট যে কেবল একটি যুদ্ধবিরতি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও দেশটির সেনাবাহিনী বাসিন্দাদের সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েলিরা সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলে কিছু শর্ত লঙ্ঘন করছে। তাই বাস্তুচ্যুতদের তাৎক্ষণিক নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়া উচিত হবে না।
লেবাননের সংবাদমাধ্যম ‘লেবানন ২৪’-এর বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের কুনিন এলাকায় ‘ইসলামিক হেলথ অথরিটি’র একটি অ্যাম্বুলেন্স টিম লক্ষ্য করে মেশিনগান থেকে গুলি এবং কামানের গোলা বর্ষণ করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এই হামলায় বেশ কয়েকজন হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে আলজাজিরা ‘লেবানন ২৪’-এর প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর স্থল অভিযান শুরুর পর অনেক বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পরপরই সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের তাৎক্ষণিক বাড়ি না ফেরার পরামর্শ দেয়। কিন্তু এই সতর্কতা স্বত্ত্বেও শুক্রবার ভোরের দিকে শত শত মানুষকে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মালপত্র নিয়ে দক্ষিণের দিকে যেতে দেখা গেছে। এমনকি ইসরায়েলি বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
আলা দামাশ নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় না ফিরতে কিছু সময় অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ভিটেমাটির প্রতি মানুষের ভালোবাসা আর টান এতটাই বেশি যে, আগুনের হুমকি সত্ত্বেও তারা বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন।’
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে গত ২ মার্চ ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে সশস্ত্রগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। এর মধ্য দিয়ে লেবাননও মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়ায়। এরপর থেকে বৈরুতে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটির অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে তেলআবিব। সীমান্তবর্তী দক্ষিণ লেবাননে শুরু হয় ‘সীমিত’ স্থল অভিযান।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









