আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ৩৫ বছর বয়সের পর কেউ যেন আইনজীবী না হতে পারেন, সে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্ট অডিটরিয়ামে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত আইন শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ কর্মসূচির অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, “৩৫ বছর বয়সের পর আইনজীবী হওয়া পথ বন্ধ করার জন্য একটি উদ্যোগ নিতে বলেছি। অলরেডি এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।”
ইন্টার্নদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, “এ ইন্টার্নশিপের অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রতিদিনের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া। শিক্ষার একটি ছোট সংজ্ঞাও রয়েছে, যদিও সেটি কোনো কোডিফায়েড সংজ্ঞা নয়। তা হলো, দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত অর্জিত সব অভিজ্ঞতাই শিক্ষা। সেটি যদি হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে এসে যে পরিশ্রম করছেন, সেই পরিশ্রমই তাদের জীবনের সবচেয়ে অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা।”
আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়ে এর আগে সুপারিশ করে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের লিগ্যাল এডুকেশন কমিটি। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ২৫৩/২০১৪ নম্বর সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিলের প্রেক্ষাপটে কমিটি এ বিষয়ে যৌক্তিক সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
কমিটির মতামতে বলা হয়, আইন পেশার মর্যাদা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা এবং পেশাকে আরো গতিশীল রাখার লক্ষ্যে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা সমীচীন।
পরে লিগ্যাল এডুকেশন কমিটির প্রস্তাব ও সুপারিশ গত ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বার কাউন্সিলের সভায় উপস্থাপন করা হয়।
সভায় উপস্থিত সদস্যরা আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের বিষয়ে একমত হন। সিদ্ধান্তটি ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আইনজীবীদের পেশাজীবনের সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের তুলনা করেন। তিনি বলেন, “প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের শুরুটা তুলনামূলক উজ্জ্বল হলেও আইনজীবীদের পেশাজীবন নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগোয়। প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবসরে যাওয়ার পর আইনজীবী হিসেবে কাজ করার কথা ভাবতে পারেন। কিন্তু তখন নতুন করে এ পেশায় এসে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা আইনজীবীদের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে।”
আইনজীবী পেশার সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, “চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিসিএস কর্মকর্তা, ব্যাংকার ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের তুলনায় বিয়ের ক্ষেত্রে আইনজীবীদের চাহিদা কম। পেশাটির মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আইনজীবীদের নিজেদেরই ভূমিকা রাখতে হবে।”
তিনি বলেন, “একজন আইনজীবীর জ্ঞান শুধু আইনশাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অর্থনীতি, রসায়ন, সামাজিক চুক্তিতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও শারীরস্থান সম্পর্কেও ধারণা থাকা প্রয়োজন। হত্যাকাণ্ডের মামলায় শারীরস্থান সম্পর্কে জ্ঞান যেমন কাজে লাগে, তেমনি আর্থিক বিরোধের মামলায় অর্থনীতির জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ।”
আইনজীবীদের ‘সামাজিক প্রকৌশলী' হিসেবে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, “সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া ফাটল মেরামতেও তাদের ভূমিকা রাখতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে অবদান রাখতে হলে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি আইনজীবীদের ভালো মানুষও হতে হবে।”
বিচারকদের অসদাচরণের জন্য জবাবদিহির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “আইনজীবীদেরও জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে। আইনজীবীদের জন্য আচরণবিধি থাকলেও এর প্রয়োগ সীমিত।”
পেশাগত নৈতিকতা জোরদার করতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
আইন পেশার ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, “এআই এ পেশার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। সুপ্রিম কোর্টে প্রতিদিন নানা আইনি সমস্যা সমাধানের মধ্য দিয়ে আইনজীবীরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তা কাজে লাগিয়ে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।”
‘এজিও–ইউএনডিপি ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম'-এর দ্বিতীয় ব্যাচের সমাপনী এবং তৃতীয় ব্যাচের ইন্টার্নদের বরণ উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিক্স ও বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস প্রমুখ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









