বিগত ১৮ বছরে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩ মামলার পরিসংখ্যান সম্প্রতি জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এসব মামলাকে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক আখ্যা দিয়ে তিনি জানান, ইতোমধ্যে ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন। তবে ঢালাওভাবে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্তে জনমনে ও আইন অঙ্গনে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলাগুলো চিহ্নিত ও প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এজন্য জেলা পর্যায়ে চার সদস্যের এবং কেন্দ্রীয়ভাবে ছয় সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইনমন্ত্রীর দাবি, জনস্বার্থ রক্ষা ও রাষ্ট্রের ক্ষতি এড়াতে এই পদক্ষেপ। তবে এ বিষয়ে আইন সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন যে, রাজনৈতিক তকমা ব্যবহার করে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধীদের মুক্তি দেওয়া হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উসকে দিয়ে ন্যায়বিচারের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করতে পারে। তারা বলেন, কারন বিগত সরকারগুলোর আমলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় হত্যা ও দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহারের নজির রয়েছে। তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলাগুলোই সতর্কতার সাথে বাছাই করা জরুরি।
এ বিষয়ে দৈনিক এদিনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ। তিনি বলেন, বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের মামলা যেন কেবল রাজনৈতিক কর্মী পরিচয়ে প্রত্যাহার করা না হয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক মামলার সংজ্ঞাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যদি প্রকৃত অপরাধীরা ছাড়া পায়, তবে তাদের মধ্যে অপরাধ করার নতুন মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি তৈরি হবে। তার মতে, ঢালাওভাবে মামলা প্রত্যাহার করলে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা যেমন কমবে, তেমনি অপরাধীরা ভবিষ্যতে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে। এতে করে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান ঘটাতে গিয়ে যদি আইনের শাসন বলি দেওয়া হয়, তবে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে মামলা হওয়া স্বাভাবিক হলেও তার আড়ালে খুন ধর্ষন ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করার মতো অপরাধগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি মামলা প্রত্যাহারের আগে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই করা জরুরি। অন্যথায়, অপরাধী ও রাজনৈতিক কর্মীর মধ্যকার সীমারেখা মুছে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিচার বিভাগকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
রাজনৈতিক বিবেচনায় ঢালাও মামলা প্রত্যাহার বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরশেদ। তিনি জানান, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কেবল রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং তথ্যের সত্যতা ও অপরাধের গুরুত্ব বিচার করে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। সম্প্রতি সংসদে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে রাজনৈতিক মামলার পৃথক পরিসংখ্যান না থাকার বিষয়টি উঠে আসায় প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। জননিরাপত্তা রক্ষায় স্থানীয় বিশেষ কমিটিগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অপরাধীদের দায়মুক্তি দিলে সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এই প্রক্রিয়াকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগযুক্ত মামলা প্রত্যাহার করা হলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি হয়। এটি সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে এবং পেশাদার অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ দেয়। ফলে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তবে এই প্রক্রিয়াটি যেন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না করে, সে বিষয়ে তিনি সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
দৈনিক এদিন-এর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলে বিএনপি নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে হওয়া মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা সরকারের একটি প্রশংসনীয় সদিচ্ছা। তবে তিনি মনে করেন, এই প্রক্রিয়াটি কেবল নির্বাহী বিভাগের একক সিদ্ধান্তে সম্পন্ন হওয়া উচিত নয়। তার মতে, বিচারিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও স্বকীয়তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ব্যারিস্টার খোকন আরও উল্লেখ করেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান যেন বিচারিক মর্যাদা সমুন্নত রেখে আইনি পন্থায় নাগরিকদের হয়রানি থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। এতে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্তম্ভ হিসেবে বিচার বিভাগের মর্যাদা ও জনমনে আস্থা আরও দৃঢ় হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









