মানুষ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী মনে করতে ভালোবাসে। জটিল কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমরা তথ্য বিশ্লেষণ করি, যুক্তি খুঁজি, আলোচনা করি। তারপরও ভুল সিদ্ধান্তের সংখ্যা কম নয়। কখনো বেশি চিন্তা করতে গিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি, কখনো আবার আবেগ বা পুরোনো ধারণার কারণে ভুল পথে যাই।
অবাক করার মতো বিষয় হলো, এত ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের পোকামাকড়ের মধ্যেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার চমৎকার কিছু কৌশল রয়েছে। তারা কীভাবে খাবার খুঁজবে, কোথায় বাসা বানাবে বা কখন দিক পরিবর্তন করবে—এসব সিদ্ধান্ত অনেক সময় পুরো দল মিলে নেয়। এসব আচরণ দেখে বিজ্ঞানীরা মানুষের পরিবহন, যোগাযোগ ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও নতুন অ্যালগরিদম তৈরি করেছেন।
তাহলে পোকামাকড়ের কাছ থেকে আমরা কী শিখতে পারি? রয়েছে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
পিঁপড়ার মতো বিকল্প খুঁজুন
একসঙ্গে অনেক বিকল্প সামনে এলে মানুষ যেমন বিভ্রান্ত হয়, পিঁপড়ারাও খাবারের জায়গা খোঁজার সময় একই সমস্যায় পড়ে। তবে তাদের রয়েছে কার্যকর একটি পদ্ধতি।
কিছু পিঁপড়া বাসা থেকে বের হয়ে বিভিন্ন দিকে খাবার খুঁজতে যায়। যাওয়ার পথে তারা মাটিতে সামান্য গন্ধযুক্ত রাসায়নিক পদার্থ বা ফেরোমোন রেখে যায়। অন্য পিঁপড়ারা পরে সেই পথ অনুসরণ করে।
যে পিঁপড়া দ্রুত খাবারের সন্ধান পায়, সে দ্রুত বাসায় ফিরে আসে। ফলে তার ফেলে যাওয়া পথের ওপর অন্য পিঁপড়ারাও বারবার চলাচল করে। এতে ওই পথে ফেরোমোনের পরিমাণ বাড়ে এবং পথটি আরও শক্তিশালী হয়। ধীরে ধীরে সবচেয়ে কার্যকর, সাধারণত সবচেয়ে ছোট পথটিই বেশি ব্যবহৃত হতে থাকে।
এখানে বড় শিক্ষা হলো—সব সিদ্ধান্ত একবারে নিতে হবে এমন নয়। প্রথমে কয়েকটি বিকল্প পরীক্ষা করুন। যে পথ বারবার ভালো ফল দেয়, সেটিকে ধীরে ধীরে অগ্রাধিকার দিন।
এই ‘অ্যান্ট কলোনি অপ্টিমাইজেশন’ পদ্ধতি এখন রেলপথ পরিকল্পনা, পরিবহন, পণ্য সরবরাহ ও যোগাযোগব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

মৌমাছির মতো মতামত নিন
নতুন বাসা কোথায় হবে, মৌমাছিরা সেটিও দলগতভাবে ঠিক করে। কয়েকটি অনুসন্ধানী মৌমাছি বিভিন্ন জায়গা দেখে আসে। এরপর তারা বাসায় ফিরে বিশেষ ধরনের ‘ওয়াগল ড্যান্স’ বা নাচের মাধ্যমে অন্যদের জানায় কোন জায়গাটি কেমন।
ভালো জায়গা পেলে নাচ হয় বেশি জোরালো ও দীর্ঘ। নাচের মাধ্যমে জায়গাটির দূরত্ব ও দিক সম্পর্কেও তথ্য দেওয়া হয়। পরে অন্য মৌমাছিরা গিয়ে জায়গাটি পরীক্ষা করে আসে।
শেষ পর্যন্ত কোনো একটি জায়গার পক্ষে পর্যাপ্তসংখ্যক মৌমাছি মত দিলে সেটিই নির্বাচিত হয়। অর্থাৎ, মৌমাছিরা কোনো একক নেতার নির্দেশে নয়, তথ্য ও সম্মিলিত মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়।
মানুষের জন্য শিক্ষা—ভালো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে অন্যের মতামত শুনুন। তবে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, তথ্য যাচাই করাও জরুরি।
পঙ্গপালের মতো কখনো নিরপেক্ষ থাকুন
কোনো দল যখন দুটি মতের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন প্রত্যেকে নিজের অবস্থানে আরও শক্ত হয়ে বসে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সমাধান বের করা কঠিন।
পঙ্গপালের ওপর গবেষণা এ ক্ষেত্রে মজার শিক্ষা দেয়। চলন্ত পঙ্গপালের দল কখনো হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায় বা কোনো দিক না নেওয়ার অবস্থায় থাকে। এই সাময়িক নিরপেক্ষতা দলটিকে পুরোনো সিদ্ধান্ত থেকে বের হয়ে নতুন দিকে যেতে সাহায্য করে।
মানুষের ওপর একই ধরনের পরীক্ষাতেও দেখা গেছে, ‘কোনোটিই নয়’—এমন একটি বিকল্প থাকলে দল দ্রুত ও পরিষ্কারভাবে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।
অর্থাৎ, সব সময় পক্ষ নেওয়া জরুরি নয়। কখনো একটু থামা, সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা এবং নতুন করে ভাবাই ভালো সিদ্ধান্তের পথ খুলে দিতে পারে।

তেলাপোকার বৈচিত্র্যকে ভয় পাবেন না
কোনো দলে সবাই যদি একই ধরনের মানুষ হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে—এমন ধারণা সব সময় ঠিক নয়। তেলাপোকার আচরণ নিয়ে গবেষণা বরং ভিন্ন কথা বলছে।
কিছু তেলাপোকা সাহসী ও অনুসন্ধানী, আবার কিছু স্বভাবতই ভীতু। গবেষকেরা কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে দেখেছেন, দলের সদস্যদের আচরণে বৈচিত্র্য থাকলে তারা দ্রুত কোনো আশ্রয়স্থল বেছে নিতে পারে।
সবাই যদি খুব সাহসী হয়, তাহলে কেউ স্থির হতে চায় না। আবার সবাই যদি অতিরিক্ত ভীতু হয়, তাহলে দ্রুত কোনো জায়গায় থিতু হলেও সেটি ভালো জায়গা নাও হতে পারে।
তাই শিক্ষা হলো—একটি কার্যকর দলে ভিন্ন ধরনের মানুষ থাকা দরকার। কেউ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে, কেউ প্রশ্ন তুলবে, কেউ ঝুঁকি দেখাবে। এই বৈচিত্র্যই অনেক সময় দলকে বুদ্ধিমান করে তোলে।
মাছির মতো নিজের অবস্থাও বুঝুন
ফলমাছি বা ফ্রুট ফ্লাইকে খুব সাধারণ প্রাণী মনে হলেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা বেশ সচেতন।
দুটি গন্ধের মধ্যে পার্থক্য কম হলে তারা সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় নেয়। যেন সুবিধা-অসুবিধার হিসাব করছে। আবার সুস্বাদু কিন্তু পুষ্টিহীন খাবার এবং তিতা কিন্তু পুষ্টিকর খাবারের মধ্যে বেছে নেওয়ার সময় তারা খাবারের সামগ্রিক মূল্যও বিবেচনা করতে পারে।
তাদের সিদ্ধান্ত অবশ্য পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করে। ক্ষুধার্ত বা চাপের মধ্যে থাকা মাছি ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা দেখাতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রেও ক্ষুধা, ক্লান্তি, ভয় বা মানসিক চাপ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
তাই ভালো সিদ্ধান্তের জন্য শুধু বাইরের তথ্য নয়, নিজের মানসিক অবস্থাও বোঝা জরুরি।
ছোট প্রাণীর বড় শিক্ষা
পিঁপড়া শেখায়—বিকল্প পরীক্ষা করে সবচেয়ে কার্যকর পথ বেছে নিতে। মৌমাছি শেখায়—তথ্য ভাগ করে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিতে। পঙ্গপাল মনে করিয়ে দেয়—কখনো নিরপেক্ষ থাকা ও থেমে ভাবা দরকার। তেলাপোকা শেখায়—দলের বৈচিত্র্য শক্তি হতে পারে। আর ফলমাছি দেখায়—সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নিজের ভেতরের অবস্থাও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
অর্থাৎ, ভালো সিদ্ধান্ত সব সময় বেশি চিন্তা করার ফল নয়। কখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কখনো অন্যের মত, কখনো বিরতি, আবার কখনো নিজের অনুভূতি—সব মিলিয়েই তৈরি হয় বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত। আর সেই শিক্ষা পেতে কখনো কখনো মানুষের চেয়ে ছোট প্রাণীদের দিকেই তাকানো যায়।
বিবিসি আর্থ


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









